১ জুলাই শুরু হয়েছিল আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতন
আজ ১ জুলাই। ২০২৪ সালের আজকের এই দিনটিকে স্মরণ করা হয় আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের শুরু হিসেবে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের ব্যানারে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের লক্ষ্যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দিনটি শুরু হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত তা ফ্যাসিবাদবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। অবশ্য এর আগে থেকেই বিএনপির নেতৃত্বে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন গড়ে উঠায় বৃহত্তর আন্দোলনের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুতই ছিল। এ আন্দোলনের প্রথমে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং পরবর্তীতে নেতৃত্ব দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর তীব্র ছাত্রআন্দোলনের মুখে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার। সরকারের জারি করা এই পরিপত্র ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করে। এর বিরুদ্ধে পুনরায় কোটা পদ্ধতি সংস্কার আন্দোলন নতুনভাবে আলোচনায় আসে। রায় প্রত্যাখ্যান করে ওইদিন সন্ধ্যায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থীরা। পরদিন ৬ জুন বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়।ঘোষণা অনুযায়ী, ৬ জুন বিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বড় বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে অনুষ্ঠিত মিছিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। এই মিছিলোত্তর সমাবেশ থেকে আদালতের রায় মেনে না-নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। একই দিন কোটা বহালের রায়ের প্রতিবাদে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা। একইভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরাও মাঠে নামেন। এমন পরিস্থিতিতে ৯ জুন হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এর কিছুদিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হওয়ায় ২৯ জুন পর্যন্ত আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। ৩০ জুন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ঘোষণা না আসায় ১ জুলাই ঢাবি, জগন্নাথ, জাবি, রাবি, চবি (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), বরিশাল ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমে পড়েন। জাবির শিক্ষার্থীরা কিছু সময়ের জন্য ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এরপর, ওই বছরেরই ১ জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে নতুন একটি প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আন্দোলন দ্রুতগতিতে সারাদেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সড়কে নেমে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও। শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলন দমাতে ব্যাপক দমনপীড়ন চালায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এতে আন্দোলন আরও তীব্রতর হয়। শাহবাগে অবস্থান নিয়ে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। সরকারের দমনপীড়ন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আন্দোলনে বাড়ে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ। আওয়ামী দুঃশাসনে বিক্ষুব্ধ মানুষ সমর্থন যোগায় আন্দোলনে। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। ওইদিন চট্টগ্রামে শহীদ হন ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। সারাদেশে আন্দোলন দাবানলের মতে জ্বলে ওঠে। জাতিসংঘের হিসেবে এরপরের প্রায় তিন সপ্তাহ গুলি করে শিশুসহ হত্যা করা হয় প্রায় ১৪০০ মানুষকে। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। সড়কে নামে শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনমুখী লাখো মানুষের ঢল। অবস্থা বেগতিক দেখে ওইদিন দুপুরে ভারতে পালিয়ে চলে যান শেখ হাসিনা। পতন হয় কর্তৃত্ববাদী এক শাসনের। গণভবন ও সংসদভবন দখলে নেয় ছাত্র-জনতা। পরে জুলাই হত্যাযজ্ঞের মামলার তদন্তে উঠে আসে, নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে মারণাস্ত্র ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এমনকি হেলিকপ্টার থেকে গুলি করারও নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি। যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে নগ্নভাবে ব্যবহারের প্রমাণও পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।কীভাবে জুলাই আন্দোলন শুরু হয় এবং এর বিস্তৃতি ঘটে- এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র (বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক) নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, আন্দোলনের তিন দিনের মধ্যে ঈদের বন্ধ চলে আসে। বন্ধের আগে আমরা অ্যাটর্নি জেনারেল বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়ে এসেছিলাম। প্রাথমিক দাবি ছিল যেন রায় স্থগিত করে পরিপত্র বহাল করা হয়। ঈদের বন্ধ থাকায় আমরা একটা আল্টিমেটাম দিই ৩০ জুন পর্যন্ত যাতে এ সময়ের মধ্যে সরকার একটা ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু আমাদের ধারণা ছিল, সরকার কোনো ব্যবস্থা নেবে না। এ কারণে আমরা এই সময়টাতে আন্দোলনের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও নিজেদের সংগঠিত করি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ রায়ের বিরুদ্ধে এবং কোটা সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমরা অনলাইনে মিটিং করি, ফেসবুকে ক্যাম্পেইন করি। আমরা সবার সঙ্গে একটা নেটওয়ার্ক স্থাপন করি। যখন আমরা দেখলাম সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত কোনো কিছু করা হলো না, তখন ১ জুলাই আমরা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে প্রথমবারের মতো কর্মসূচি পালন করি। এভাবেই শুরু হয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার দুর্দম আন্দোলন। অনেক প্রাণ আর ত্যাগের বিনিময়ে যা পরিপূর্ণতা পায় ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই অর্থাৎ ৫ আগস্ট।-এজেড
বাড়তে পারে তাপমাত্রা, ৩ মাসের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানালো অধিদপ্তর