বাবার শোকানুষ্ঠানে কেন নেই মোজতবা খামেনি?
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা নেতৃত্বের অবসান ঘটলেও, সাধারণ মানুষের অশ্রু আর স্মৃতিতে এখনো অম্লান ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তেহরানে আয়োজিত তাঁর রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে ইরানের সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতারা অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি অর্ধশতাধিক দেশের প্রতিনিধি ও বিশ্বনেতারা এখন তেহরানে অবস্থান করছেন। তবে এই বিশাল ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন না ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ছেলে এবং দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। কিন্তু কেন তিনি অনুপস্থিত?
কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার তাঁর বাবার জানাজায় উপস্থিত না থাকার বিষয়টি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়।
তাঁর ভাষায়, ইরান গভীরভাবে আশঙ্কা করছে যে, জানাজার সময় ইসরায়েল দ্বিতীয় দফায় দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা (ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক) চালাতে পারে। কারণ, অতীতেও রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্য করে তাদের শেষকৃত্যের শোভাযাত্রায় হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে ইসরায়েল।
তবে পল মাসগ্রেভ এও মনে করেন, শেষ পর্যন্ত দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে জনসমক্ষে দেখা যাওয়াটা অত্যন্ত প্রয়োজন। কারণ, গত কয়েক মাস ধরেই মোজতবা খামেনিকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত ইরানকে এমন একটি উপায় বা কৌশল বের করতেই হবে, যাতে বিশ্ববাসীকে বোঝানো যায় যে, তিনি কোনো আড়ালে থাকা সর্বোচ্চ নেতা নন; বরং বাস্তবেই দেশ পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকা একজন নেতা। তেহরানের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত এই চরম উদ্বেগ যথার্থ ও যৌক্তিক হলেও, একসময় তাদের সেটি নিশ্চিত করতেই হবে।
এদিকে আজ শনিবার (৪ জুলাই) ভোর থেকে রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লার সামনে মানুষের ঢল নামে। ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শোক ও শেষশ্রদ্ধা জানাতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হচ্ছেন লাখ লাখ ইরানি। পুরো তেহরান এখন ‘আমেরিকার মৃত্যু’ (যুক্তরাষ্ট্র ধ্বংস হোক) ও ‘প্রতিশোধ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছে।
তেহরানে সাধারণ মানুষের জন্য দুই দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ সময় সর্বস্তরের মানুষ আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবারের প্রয়াত কয়েকজন সদস্যের প্রতি শেষশ্রদ্ধা জানাবেন। ইরান কর্তৃপক্ষ আশা করছে, সাড়ে তিন দশক ধরে ইরানের শাসনক্ষমতায় থাকা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে শুধু তেহরানেই দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে।
আগামী সোমবার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শোকযাত্রা ইরানের দক্ষিণে পবিত্র কোম নগরীর উদ্দেশে যাত্রা করবে। এরপর সেটি প্রতিবেশী ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালা হয়ে খামেনির শেষ গন্তব্য উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে পৌঁছাবে। শিয়া ইসলামের অষ্টম ইমামের মাজার এবং খামেনির নিজস্ব জন্মস্থান হওয়ায় মাশহাদে প্রায় ৪০ লাখ মানুষের অংশগ্রহণের আশা করছে ইরান সরকার।
ইরান কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পূর্বসূরি ও ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মহান নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজার পর ইরানে এটাই সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক জনসমাগম হতে চলেছে। উল্লেখ্য, সে সময় খোমেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির এই সুবিশাল শেষ বিদায় অনুষ্ঠান মূলত বিশ্বমঞ্চে ইরানের রাষ্ট্রীয় ধারাবাহিকতা ও শক্তির বার্তা দিচ্ছে।
এর আগে গতকাল শুক্রবার তেহরানের বিশাল প্রার্থনা হলে (গ্র্যান্ড মোসাল্লা) শায়িত ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতাকে শ্রদ্ধা জানান দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিসহ শীর্ষ সামরিক ও বেসামরিক নেতারা। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা এবং ইরানের মিত্রদের পরিবারও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবার কোনো ইউরোপীয় দেশকে এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানায়নি তেহরান।
পরিশেষে, আয়াতুল্লাহ খামেনিকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে কোটি কোটি মানুষ অংশ নিলেও সম্পূর্ণ নিরাপত্তার স্বার্থে বাবার শোক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন না তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি। কারণ, সম্প্রতি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাঁকে সরাসরি হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং সেই হুমকির পরিপ্রেক্ষিতেই এই কঠোর গোপনীয়তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।