বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে বিহারের সাবেক গভর্নর আরিফ মোহাম্মদ খানের নাম শোনা গেলেও দেশটির সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও ব্যারাকপুরের এমপি, বর্তমানে বিজেপি নেতা দিনেশ ত্রিবেদীকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। শেষ মুহূর্তে কোনও পরিবর্তন না-ঘটলে, পশ্চিমবঙ্গের ভোটপর্ব মিটলেই দীনেশকে রাষ্ট্রদূত করে ঢাকায় পাঠানোর সরকারি প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক ভাবে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণার অপেক্ষা।
রোববার (১৯ এপ্রিল) ভারতীয় গণমাধ্যম হিন্দুস্থান টাইমস আনন্দবাজার জানিয়েছে, দীর্ঘদিন পর প্রতিবেশী কোনো দেশে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে এই পদে পাঠানো হচ্ছে। তিনি বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার জায়গা নেবেন। প্রণয় ভার্মা ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ব্রাসেলসে যাচ্ছেন। এই নিয়োগের আগে বাংলাদেশ সরকারের সম্মতি চাওয়া হবে। ৭৫ বছর বয়সী দিনেশ ত্রিবেদীকে পাঠানো ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিকদের জন্যও একটি বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নিয়োগ এমন সময়ে এসেছে, যখন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা চলছে। দিনেশ ত্রিবেদীকে পাঠানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এতে বোঝা যায়, মোদি সরকার গুরুত্বপূর্ণ দেশে রাজনৈতিক নেতাদের দূত হিসেবে পাঠাতে আগ্রহী। এর আগে দেশটির সাবেক সেনাপ্রধান দলবীর সিং সুহাগ ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সেশেলসে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। ঢাকায় দিনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে নতুন কূটনৈতিক ধারা হিসেবে দেখছে দেশটির গণমাধ্যম। বলা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশগুলোতে এখন অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পরিচালিত অন্তর্বর্তী সরকারের গোড়ার পর্ব থেকেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা হলেও ‘অবনতি’ হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক মসৃণ করার উদ্যোগ চলছে দু’তরফেই। এই মসৃণ করার কাজেই দীনেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবেন বলে মনে করছে ভারত সরকার।
গুজরাটি দম্পতি হীরালাল ত্রিবেদী এবং উর্মিলাবেন ত্রিবেদীর কনিষ্ঠপুত্র দীনেশ। হিমাচল প্রদেশের বোর্ডিং স্কুল থেকে পড়াশোনার পর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক হন। তার পর টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ। আশির দশকে কংগ্রেসে যোগ দেন দীনেশ। কিন্তু ১৯৯০ সালে জনতা দলে চলে যান। ১৯৯০-’৯৬ পর্যন্ত তিনি রাজ্যসভায় জনতা দলের সাংসদ ছিলেন। ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূল গঠন করেন, সেই দলে যোগ দেন দীনেশ এবং দলের প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন। ২০০২-’০৮ পর্যন্ত রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তৃণমূলের হয়ে লোকসভা ভোটে প্রার্থী হন। ওই আসনে জিতে কেন্দ্রের মনমোহন সিংহ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী হন। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর মমতা রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লে, সেই দায়িত্ব সামলান দীনেশ। কিন্তু রেলের ভাড়া বাড়ানোয় তার উপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন মমতা। তাকে রেলমন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
২০১৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে তিনি আবার তৃণমূলের প্রার্থী হন। কিন্তু সেবার বিজেপির অর্জুন সিংহের কাছে হেরে যান। তার পর তৃণমূল তাঁকে আবার রাজ্যসভায় পাঠায়। কিছু দিন পর থেকে তৃণমূলের সঙ্গে ‘দূরত্ব’ তৈরি হয় দীনেশের। তাঁকে নিয়ে জল্পনা জোরালো হতে থাকে। তা হলে কি এ বার বিজেপি-তে যাচ্ছেন দীনেশ? সেই জল্পনাকে সত্যি করে ২০২১ সালে ৬ মার্চ পদ্মশিবিরে যোগ দেন তিনি। রাজ্যসভার সাংসদপদ থেকে ইস্তফা দেন। এখন বিজেপিতেই রয়েছেন দীনেশ। সবকিছু ঠিকঠাক চললে, কিছু দিনের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক দায়িত্ব নিয়ে তিনি এক বাংলা থেকে আর এক বাংলায় রওনা হবেন।
—এজেড