খামেনির দাফনে সপ্তাহব্যাপী আনুষ্ঠানিকতা, কোন দিন কোথায় কী আয়োজন?
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনকে কেন্দ্র করে সপ্তাহব্যাপী আনুষ্ঠানিকতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষ্যে ইরান ও ইরাকের অন্তত পাঁচটি শহরে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। শুক্রবার (০৩ জুলাই) থেকে এ আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। খামেনির দাফনের জন্য প্রথমে চলতি বছরের মার্চ মাসে সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় পরে তা স্থগিত করা হয়। যুদ্ধের প্রথম দিন অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি বাসভবনে বোমা হামলায় পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে খামেনি নিহত হন।
জন্মের পরই মিলবে ১টি আইডি: ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি! | Global TV News
- আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি কে ছিলেন?
খামেনির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হয়েছেন তার ছেলে মোজতবা খামেনি। তার শাসনামলের শুরুতেই এত বড় রাষ্ট্রীয় আয়োজন হতে যাচ্ছে। যদিও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এখনও প্রকাশ্যে আসেননি। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র শিয়া শহর মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের প্রাক্কালে রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। ইরাকের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে তিনি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। খামেনি ইরানের সামরিক ও আধাসামরিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেন। পাশাপাশি বহির্বিশ্বের হুমকি মোকাবিলায় একটি উন্নত প্রতিরক্ষা কৌশল প্রতিষ্ঠা করেন। তার শাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ আসে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। সে সময় অর্থনৈতিক দুর্দশাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দেশব্যাপী অস্থিরতায় রূপ নেয়। পরে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন।
সাত দিনব্যাপী দাফনের আনুষ্ঠানিকতা: খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা ৩ জুলাই তেহরানে শুরু হয়েছে। এটি ইরান ও ইরাকজুড়ে সাত দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পালিত হবে। এসব অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও পণ্ডিতরা শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।
৪ ও ৫ জুলাই
৪ ও ৫ জুলাই তেহরানে সর্বজনীন শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করা হবে। সর্বসাধারণকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যের মরদেহসহ খামেনির কফিন গ্র্যান্ড মোসাল্লায় রাখা হবে। বিশাল জনসমাগমের জন্য নির্মিত গ্র্যান্ড মোসাল্লা ইরানের অন্যতম বৃহত্তম প্রার্থনাস্থল। এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় আয়োজনের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
৬ ও ৭ জুলাই
৬ ও ৭ জুলাই তেহরানের বিভিন্ন এলাকা অতিক্রম করে রাজধানী থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কোম শহরের উদ্দেশে বিশাল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। কোম ইরানের শিয়া ইসলামি শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র এবং দেশটির অন্যতম পবিত্র শহর। এখানে দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অবস্থিত। খামেনিসহ হাজার হাজার আলেম এ শহরে অধ্যয়ন ও শিক্ষাদান করেছেন।
৮ জুলাই
ইরান ও ইরাকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৮ জুলাই নজফ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে। এরপর ইরাকের নজফ ও কারবালা শহরে বড় শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। নজফের ইমাম আলীর মাজার শিয়াদের অন্যতম পবিত্র স্থান। প্রতি বছর সেখানে লাখো তীর্থযাত্রী আসেন। এখানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর চাচাতো ভাই ও জামাতা হজরত আলী ইবনে আবি তালিবের সমাধি রয়েছে। কারবালায় অবস্থিত ইমাম হুসাইন ও তার সৎভাই আব্বাসের মাজার শিয়া ইসলামের অন্যতম পবিত্র স্থান। ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার যুদ্ধে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন এবং আব্বাস শহীদ হন। এ ঘটনাটি শিয়া ধর্মীয় ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি।
৯ জুলাই
এরপর মরদেহটি চূড়ান্ত দাফনের জন্য ইরানে ফিরিয়ে আনা হবে। আগামী ৯ জুলাই মাশহাদে ইমাম রেজার মাজারে তাকে দাফন করা হবে। মাশহাদ ইরানের পবিত্রতম শহর। ইমাম রেজা শিয়া মতাবলম্বীদের কাছে অষ্টম ইমাম হিসেবে পরিচিত। শহরটি আলি খামেনির জন্য ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ১৯৩৯ সালে মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং জীবনের একটি বড় অংশ সেখানে কাটান। কোমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগে তিনি মাশহাদের ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলোতে অধ্যয়ন করেছিলেন।
- খামেনির শেষ বিদায়ে আছেন যেসব বিশ্ব নেতা
বাংলাদেশ: বাংলাদেশ থেকে খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে যাবেন স্পিকার হাফিজুদ্দিন আহমেদ। এরসঙ্গে বিরোধী দলের প্রতিনিধিরাও ইরান গেছেন।
পাকিস্তান: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এই অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি করতে শেহবাজ বড় ভূমিকা রেখেছেন।
তাজিকিস্তান: তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমোন আজ শুক্রবার তেহরানে এসেছেন।
আর্মেনিয়া: আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাসিনইয়ান তার দেশকে খামেনির শেষ বিদায়ে নেতৃত্বে দিচ্ছেন।
জর্জিয়া: জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলি খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে যাবেন বলে নিশ্চিত করেছে তার সরকার।
তুরস্ক: তুরস্কের ভাইস-প্রেসিডেন্ট কেডভেট ইলমাজ খামেনির জানাজায় অংশ নেবেন বলে নিশ্চিত করেছে আঙ্কারা।
ভারত: ভারত তার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী পবিত্র মার্গেরিতা এবং বিহারের গভর্নর সৈয়দ আতা হাসনাইনকেজ পাঠাচ্ছে। সৈয়দ আতা হাসনাইন শিয়া মুসলিম। তিনি ভারতে বর্তমানে শিয়াদের মধ্যে সর্বোচ্চ পদধারী ব্যক্তি হিসেবে বিহারে গভর্নরের দায়িত্বে আছেন। এর আগে ভারতীয় সেনাবাহিনীর লেফটেনেন্ট জেনারেল ছিলেন তিনি। এরসঙ্গে ভারতের বিরোধী দলীয় নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ এবং মেহবুবা মুফতিও ভারতীয় প্রতিনিধি দলে আছেন।
চীন : ইরানে চীন তাদের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠাচ্ছে সিনিয়র পার্লামেন্টেরিয়ান হি ওই। তিনি দেশটির ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের ভাইস চেয়ারম্যানও।
রাশিয়া : রাশিয়া থেকে খামেনির শেষ বিদায়ে যুক্ত হবেন দেশটির সিকিউরিটি কাউন্সিলের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ। তিনি রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন।
আফগানিস্তান: আফগানিস্তান থেকে যাচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। এছাড়া বাণিজ্য বিষয়ক প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রী আব্দুল গণি বারাদারও যাচ্ছেন বলে আফগান সংবাদমাধ্যমগুলোতে জানানো হয়েছে।
ছবির গ্যালারি