ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

 
 
 
 

মেধাবী ডলির শিক্ষা জীবন রক্ষায় মানবিকতার হাত বাড়ালেন সাঁথিয়ার ইউএনও

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৩২ অপরাহ্ণ, জুন ০৫, ২০২০

ছবি-গ্লোবাল টিভি

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা :পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এসএম জামাল আহমেদ এইচএসসি পরীক্ষার্থী মেধাবী ডলি খাতুনের শিক্ষা জীবন অব্যাহত রাখতে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। ইউএনও বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে অসহায় ডলির হাতে খাদ্য সামগ্রী ও নগদ অর্থ প্রদান করেছেন। আগামীতে তাঁর পরীক্ষাকালীন সময়ে ও পরীক্ষা পরবর্তী ভর্তিতেও তিনি তাকে সহায়তা করবেন বলে জানিয়েছেন।

ডলির খাতুনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার করমজাতে এক দরিদ্র ঘরে জন্ম হয় তাঁদের দু’বোনের। বাবা সংসারের প্রতি উদাসীন ছিলেন। তাই সংসারে অভাব আর অশান্তি ছিল নিত্যসঙ্গী। সে যখন মায়ের কোল ছাড়েনি সেই বয়সে বাবা- মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। মায়ের সাথে ডলির এবং তাঁর বড় বোনের আশ্রয় হয় নানীবাড়ি, সাঁথিয়া উপজেলার পদ্মবিলা গ্রামে। এরপর ডলির নানা- নানী তাঁর মাকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেন। সেখানেও শিশু ডলির আশ্রয় জোটেনি। ডলি হয়ে যায় আরো অসহায়। প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর শিক্ষা জীবন। সে বনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।

ডলি যখন ৫ম শ্রেণিতে তখন তাঁর বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায় বনগ্রাম এলাকাতেই। ৫ম শ্রেণি পড়ুয়া ছোট বোনের পড়ার আগ্রহ দেখে তাঁকে কাছে নিয়ে যায় বড় বোন। এরপর থেকে ডলির আশ্রয় জোটে বোনের বাড়িতে। সেখানে থেকে ২০১২ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় সে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পায়। ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে ডলি। নানা সমস্যার মধ্যেও সে ৯ম শ্রেণিতে সায়েন্সে ভর্তি হয়। প্রাইভেট খুব একটা পড়া হয়নি। যেটুকু পড়েছেন সেটা স্যারদের বদান্যতায়, বিনা অর্থে। এজন্য শিক্ষকদের প্রতি ডলির অশেষ কৃতজ্ঞতা। এসএসসি পরীক্ষাতেও গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে সে তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখে।

এরপর আর্থিক সমস্যার মধ্যেও সে মিয়াপুর হাজী জসীম উদ্দিন হাইস্কুল এন্ড কলেজে এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। আর্থিকসহ নানা সীমাবদ্ধতার জন্য সহপাঠীদের তাল মিলিয়ে চলা তাঁর জন্য ছিল কঠিন। সব দু:খ চাপা দিয়ে পড়াশোনায় অবিচল থাকে ডলি। কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষা হওয়ার আগেই তাঁর জীবনে আরেকটি পরীক্ষা এসে হাজির হয়। তাঁর দু:সময়ে আশ্রয়দাতা দুলাভাই অকালে মারা যান। ডলি জানায়, গত বছর (২০১৯) জুন মাসে তার দুলাভাই মারা যান। এতে যে বোনটি ছিল তার আশ্রয়দাতা সে বোনই হয়ে পড়েন আশ্রয়হীন।
ডলির জীবন ও শিক্ষাজীবন আবার অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়। এরপর তাঁর এক খালুর বাড়িতে আশ্রয় জোটে। এখন পর্যন্ত ডলি ওই বাড়িতেই রয়েছে।

সম্প্রতি অদম্য মেধাবী ডলির কথা সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম জামাল আহমেদ জানতে পারেন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ওই অসহায় ছাত্রীর জন্য সহায়তার কথা বলেন। ওই ছাত্রীর প্রতিষ্ঠান মিয়াপুর কলেজের সহকারী অধ্যাপিকা ড. শাহনাজ পারভীন এর মাধ্যমে ডলির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেন ইউএনও। ইউএনও এসএম জামাল আহমেদ ডলি ও তাঁর আত্নীয়দের জানান, তাঁর শিক্ষা জীবন যেন বন্ধ বা তাঁর উচ্চ শিক্ষা ব্যাহত না হয় সেজন্য তিনি ডলিকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করবেন।

বৃহস্পতিবার ইউএনও ডলির হাতে খাদ্যদ্রব্যসহ নগদ টাকা তুলে দেন। এছাড়া দেশে স্বাভাবিক পরিস্থিতি আসার পর যখনই এইচএসসি পরীক্ষা হবে তখন তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তার কথা জানান।

ডলি জানায়, ‘ইউএনও স্যারের এমন মহানুভবতায় আমি অত্যন্ত খুশি। তিনি আমার অসহায় অবস্থার কথা জানতে পেরে আমাকেই খুঁজে নিয়েছেন। সহায়তা করেছেন। এমনকি আমার এইচএসসি পরবর্তী ভর্তিকালীন সময়েও তিনি সহায়তার কথা আগাম জানিয়ে রেখেছেন। ডলি বলেন, ইউএনও স্যারের উৎসাহ আমার অনেক কষ্ট লাঘব করেছে। কারণ এইচ পরীক্ষা এবং পরীক্ষার পর আমার ভর্তি ইত্যাদি নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলাম। আমি এখন অনেকটা চিন্তামুক্ত হয়ে উৎসাহিত। সবার দোয়া থাকলে আমি এইচএসসিতেও ভাল ফল করব বলে আশাবাদী।’

মিয়াপুর কলেজের সহকারী অধ্যাপিকা (জীব বিজ্ঞান) ড. শাহনাজ পারভীন জানান, ‘ডলি খাতুন আমার সরাসরি ছাত্রী। আমার জীববিজ্ঞানে সে সবার চেয়ে বেশি নম্বর পায়। অন্যান্য বিষয়েও ভাল ফল করছে। তার এইচএসসি পরীক্ষা ভাল হবে বলে শিক্ষকরা আশাবাদী।’ তিনি জানান, ‘এ মেয়েটি অনেক বিনয়ী, নম্র ও পরিশ্রমী।’ তিনি জানান, ‘ইউএনও স্যারের শিক্ষার প্রতি এমন আগ্রহ ও মানবিকতায় আমি একজন শিক্ষক হিসেবে মুগ্ধ।’


আরকে


oranjee