ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ | ২৪ আষাঢ় ১৪২৭

 
 
 
 

ভ্রমণে সাতাশ বছর

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৪৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৮, ২০২০

ছবি: গ্লোবাল টিভি

সুমন্ত গুপ্ত : সময়টা ১৯৯৩। বয়সে তরুণ। দেশের জন্য কিছু করতে সব সময়ই মন চাইতো। কিন্তু কি করা? আবার কোন কিছু করতে গেলেই সবাই বলেন, এটা হবে ওটা হবে না। তবে তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সাথে ছিলেন ছোট বেলার চার বন্ধু। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলেন, আমাদের দেশের আনাচে কানাচে থাকা স্রষ্টার নিদর্শনকে খুঁজে বের করে মানুষের সামনে তুলে ধরবেন।

আমি বলছি মো. জাভেদ হাকিমের কথা। তাঁর স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান 'দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ' আজ হাটি-হাটি পা-পা করে ছাব্বিশটি বছর পাড়ি দিয়ে সাতাশে পা দিয়েছে। দীর্ঘ দিনের পথ চলায় আজ দে ছুট ভ্রমণ সংঘ বাংলাদেশের অন্যতম একটি ভ্রমণ সংগঠন।

ভ্রমণ বা ট্রাভেল শব্দটার উৎপত্তি হয়েছে আদি ফরাসি শব্দ travail থেকে। মেরিয়াম ওয়েবস্টার ডিকশনারি অনুসারে যতদূর জানা যায়, ভ্রমণ শব্দটার ব্যবহার শুরু হয় চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে। সেখানে এটাও বলা আছে যে, ভ্রমণ শব্দটা প্রথমে আদি ফরাসি শব্দ travailler (যার মানে পরিশ্রমের সাথে কাজ করা) হয়ে পরবর্তীতে ইংরেজি শব্দ travailen, travelen (যার মানে, শ্রম, সংগ্রাম, ভ্রমণ)-এর মধ্য দিয়ে উৎপত্তি লাভ করেছে। ইংরেজিতে এখনও মাঝেমাঝে travail এবং travails শব্দ দু'টো ব্যবহার করা হয় যার মানে সংগ্রাম। Simon Winchester তাঁর বই The Best Travelers' Tales (2004)-এ উল্লেখ করেছেন, travail এবং travel দু'টো শব্দই আমাদের সামনে আরও প্রাচীন একটা ব্যাপার তুলে ধরে যেটা হলো tripalium (ল্যাটিন ভাষায় যার মানে ৩ টি পুরস্কার) নামক প্রাচীন রোমানদের ব্যবহৃত টর্চার করার যন্ত্র।

আসলে প্রাচীনকালে ভ্রমণে অনেক কষ্ট এবং প্রতিকূলতা ছিলো। সাথে travailler শব্দটার কষ্টকর জ্ঞাতার্থও প্রকাশ করে। দে ছুট ভ্রমণ সংঘ একটি সু-শৃঙ্খল স্বেচ্ছাসেবক ভ্রমণ সংগঠন যার অর্থায়ন নিজেদের মধ্য থেকেই সংগৃহীত। দে ছুট ভ্রমণ সংঘের বন্ধুরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণের পাশাপাশি দুঃস্থদের ত্রাণ দেয়াসহ নানা রকম সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে থাকে। লক্ষণীয় যে, এখনকার তরুণ প্রজন্মের প্রায় সবাই চায় সেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নিতে। দেশের জন্য কিছু করতে।

জাভেদ হাকিম  দীর্ঘ দিন ধরে জড়িত আছেন ভ্রমণ সাহিত্যের সাথে। ভ্রমণ থেকেই হয় ভ্রমণ কাহিনী। কিন্তু ভ্রমণকারীদের সকলের হাত দিয়ে নয়। অন্নদাশঙ্করের এই কথা টেনে বলা যায়, ভ্রমণ সাহিত্য সবাই হাজির করতে পারে না। সাহিত্য যেমন নানা অর্থ প্রকাশক, ভ্রমণ রচনাও নানা ধাঁচের। যেমন ভ্রমণ রচনা আকর্ষণীয় পাঠযোগ্যতায়, জীবন পর্যবেক্ষণে, প্রকৃতি অবলোকনে এবং বারংবার পড়ার কৌতূহল জাগিয়ে তোলে, সেটিকেই বলা চলে ভ্রমণ-সাহিত্য।

বেড়ানোর প্রসঙ্গ কথা হলেই চলবে না, সাহিত্যের স্বাদ চাই, তবেই আসে বেড়ানোর মতো, সাহিত্য পাঠে হাওয়া বদলের স্বাদ। জাভেদ হাকিম সেই সপ্তম শ্রেণীতে প্রথম ১০ টাকা করে চাঁদা তুলে বন্ধুদের সঙ্গে জোট বেঁধে ঘোরাঘুরি শুরু করলেও  মূলত ১৯৯৪ সালেই প্রথম ঢাকা শহরের গন্ডি পেরিয়ে শৈশবের বন্ধুদের সঙ্গে  রাঙ্গামাটি ভ্রমণের মাধ্যমে দে-ছুট-এর আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়। দে ছুট ভ্রমণ সংঘের মূল উদ্দেশ্য অচেনাকে চেনা, অজানাকে জানা। আল্লাহ পাকের সৃষ্টির নিদর্শন দেখা, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করা। বর্তমানে তাদের দলে তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ সবাই আছে।

ভ্রমণ মানুষের মন-মানসিকতাকে করে মহান। উপযুক্ত শিক্ষা লাভের বিশাল মাধ্যম হলো ভ্রমণ। এর বিকল্প নেই। তবে সেই ভ্রমণ হতে হবে প্রকৃতি হতে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে। দল বেঁধে গেলাম আর হৈ হুল্লোড় করে ফিরে এলাম, এটা কোন ভ্রমণের পর্যায়ে পড়ে না। তরুণদের জন্য পাহাড় ভ্রমণ হতে পারে নৈতিক শিক্ষা লাভের মাধ্যম। আমাদের দেশে পর্যটন শিল্প বিকাশের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হল এ দেশে ভালো মানের হোটেল রুম ভাড়া নিউইয়র্ক সিটির চাইতেও বেশী। খাবারের মান তেমন ভালো না। পরিবার নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবেন সেখানে উটকো হকার আর দোকানীদের অযাচিত অসদাচরণ। সাইট সিনের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। ফলে পকেটের টাকা বেশ খরচ হয়, তাই অনেক সময় মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজন ভ্রমণে বের হতে চান না।

তাই পর্যটন শিল্প বিকাশে প্রথমেই চাই তরুণ শ্রেণীর সম্পৃক্ততা। দ্বিতীয়ত, চাই যারা দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ায় নতুন কিছু দেখার বাসনায়, তাদের জন্য কম খরচে ঘোরার ব্যবস্থা করে দেয়া। তৃতীয়ত, চাই মুনাফার পাশাপাশি সেবার মানসিকতা রয়েছে এরকম হোটেল-মোটেল জোন করা।

দে ছুট ভ্রমণ সংঘের এতটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ার পিছনে যে বিষয়গুলো মূল মন্ত্র হিসেবে কাজে আসছে, তা হল সদস্যদের দৃঢ় মনোভাব। জাভেদ হাকিম বলেন, আগামীতেও তারা যেন দে-ছুটকে এগিয়ে নিয়ে যান তথা দেশের পর্যটনশিল্প উন্নয়নের জন্য নিবেদিত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিজেদেরকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে পারেন। সেই সঙ্গে তিনি দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ সংগঠনকে সহযোগিতা করার জন্য দেশের সকল প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়ার সম্পাদক এবং সহ-সম্পাদকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান।


এএইচ/জেইউ


oranjee