ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

 
 
 
 

ঘুরে এলাম নেপাল থেকে

গ্লোবালটিভিবিডি ৭:১১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০২০

মো. রাগীব রহমান

দিনটি ছিলো ২১ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। প্রতি বছর বিভিন্ন ব্যস্ততা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই কাটে আমার এই দিনটি। তবে এই বছর দিনটি ছিলো একটু ব্যতিক্রম। কারণ এদিন দুপুরে আমাদের ফ্লাইট। বাংলাদেশ থেকে আমরা ২২ জন যাচ্ছি নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে। স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে আমার সাথে আরও ছিলো আমার সহকর্মী জেনিফার কামাল। আমাদের লক্ষ্য নেপালে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের আয়োজনে একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। নাম ‘থার্ড নেপাল বাংলাদেশ ইয়ুথ কনক্লেভ ২০২০’। দুই দেশের তরুণসমাজের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের জন্যই এই ধরনের আয়োজন করা হয়।

নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে কাঠমুন্ডুর মাটিতে আমাদের বিমান অবতরণ করলো। সেখানে আগে থেকেই আয়োজকরা অপেক্ষা করছিলেন আমাদের বরণ করার জন্য। আমাদেরকে বরণ করা হলো নেপালের ঐতিহ্যবাহী টুপি দিয়ে। পরে জানতে পারলাম এই টুপির সুতা ঢাকা থেকে সেখানে আমদানি হয় বলে নেপালে সেটা ‘ঢাকা টুপি’ নামে পরিচিত।

বিমানবন্দর থেকে আমরা সরাসরি চলে গেলাম নেপালের বাংলাদেশ হাইকমিশনে। সেখানে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠান চলছিলো। আমরাও সেখানে নির্মিত একটি ছোট শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম।

এরপর আলোচনা সভায় অংশগ্রহণ করে সন্ধ্যায় চলে এলাম হোটেলে। আমাদের হোটেল ছিলো থামেল থেকে বেশ কাছে। উল্লেখ্য, থামেল হচ্ছে কাঠমুন্ডুর কেনাকাটা করার প্রাণকেন্দ্র। কেনাকাটা করার সুবিধার কথা ভেবে তাই মনে মনে বেশ খুশিই হলাম।

পরদিন সকাল থেকে শুরু হয় আমাদের মূল সম্মেলন। সকালে নাস্তা করেই ছুটে গেলাম সম্মেলনস্থলে। সম্মেলনে নেপাল ও বাংলাদেশের অসংখ্য অংশগ্রহণকারী ছাড়াও বিশেষ অতিথির মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নেপালে বাংলাদেশ হাইকমিশনের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস, নেপালের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী গোকার্না বিস্তা, আয়োজনের মূল সমন্বয়ক অভিনব চৌধুরী প্রমুখ। নেপাল ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সম্মেলন। সম্মেলনের আলোচ্যসূচির মধ্যে ছিলো টেকশই উন্নয়নের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা ও বাংলাদেশের অবস্থান, নেপাল ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম ইত্যাদি।

 

গোকার্না বিস্তা বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। টেকশই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করেছে। দুই দেশের তরুণদের মধ্যে আন্তঃসাংস্কৃতিক এই যোগাযোগ সম্প্রসারণে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী।’

নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বলেন, ‘দুই দেশের তরুণদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের লক্ষ্যেই এই ধরনের আয়োজন করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও গত বছর নেপালের বেশ কিছু তরুণ গিয়েছিলো। আমরা ভবিষ্যতে এই ধরনের উদ্যোগ অব্যহত রাখতে চাই এবং সম্ভব হলে ও আরও সম্প্রসারণ করতে চাই।’

সম্মেলনে আলোচনার পাশাপাশি ছিলো সাংস্কৃতিক পর্ব। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ছিলো বাংলাদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণে বিশেষ বাউল সঙ্গীত পরিবেশনা। এছাড়াও বাংলাদেশ ও নেপালের অংশগ্রহণকারী তরুণরাও নাচ, গানসহ বিভিন্ন পরিবেশনা করে। আমি কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আবৃত্তি পরিবেশন করি। আমার সাথে নাচ পরিবেশন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংস্কৃতিক সংসদ’ এর নৃত্যশিল্পী নীলাদ্রি পাল।

সম্মেলনের পাশাপাশি কাঠমুন্ডুর কিছু দর্শনীয় ও ঐতিহাসিক স্থান পর্যবেক্ষণ করেছি আমরা। চেষ্টা করেছি স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেয়ার। আমরা ভ্রমণ করেছিলাম শ্রী পশুপতিনাথ মন্দির, কুমারি মন্দির, কাঠমুন্ডু দর্বার স্কয়ার, শম্ভুনাথ মন্দির ইত্যাদি। এছাড়া নাগরকোটে গিয়ে হিমালয়ের উপর থেকে সূর্যোদয় দেখার সৌভাগ্যও হয়েছিলো আমাদের। সেখানে তীব্র শীতে রীতিমতো আমাদের হাত-পা একেবারে ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। তবে নেপাল গিয়েও সময়স্বল্পতার কারণে পোখারা না যেতে পারার আক্ষেপটা থেকে যাবে দীর্ঘদিন।

সম্মেলনের শেষদিন ছিলো সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠান। অবশেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি পা রাখলাম প্রিয় স্বদেশের মাটিতে। বিশ্বজুড়ে তখন শুরু হয়ে গেছে করোনা আতঙ্ক। নেপালে এই রোগের সংক্রমণ তেমন না থাকলে আমরা পুরোপুরি এই আতঙ্কের বাইরে ছিলাম না। তাই যাওয়ার দিন এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে যথাসম্ভব আমরা মাস্ক ব্যবহারসহ অন্যান্য সতর্কতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। তবে দেশে ফেরার সময় এয়ারপোর্টে কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি আমাদেরকে বেশ হতাশ করেছে। ফিরতি পথে বিমানের মধ্যে কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি কাগজ আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করা হলো যে করোনাভাইরাসের কোন লক্ষণ (সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথাব্যথ্যা, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি) আমাদের মধ্যে আছে কিনা। সেই কাগজটা জমা নেওয়া হলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্ধারিত ডেস্কে। সেখানে আমাদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদি যুক্ত ছিলো। এছাড়া আর কোন ধরনের স্বাস্থ্যপরীক্ষা আমাদের করা হয় নি! বিদেশফেরত সকলের ক্ষেত্রে আরেকটু সাবধানতা অবলম্বন করা সময়ের দাবি, একথা বলার নিশ্চয়ই অপেক্ষা রাখে না।

যাই হোক, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা এবং লাল-সবুজের পতাকা মেলে ধরা আমার কাছে জীবনের সবচাইতে সুখকর অনুভূতি। এর আগে তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য ভারত, চীন এবং শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের সাথে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে চতুর্থ দেশ হিসেবে যুক্ত হলো নেপাল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে কাঠমুন্ডু সফরের এই কয়েকটি দিনের প্রতিটি মুহূর্ত।


লেখক: প্রভাষক
জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ,
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।


oranjee