ঢাকা, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২০ | ২০ আষাঢ় ১৪২৭

 
 
 
 

আনোয়ার রশীদ সাগর-এর ছোট গল্প ‘প্রতিনিধি’

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৪৭ অপরাহ্ণ, জুন ২৫, ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

প্রতিনিধি
আনোয়ার রশীদ সাগর

জীবন ও জীবিকার জন্য দৌড়াতে হয় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। মানুষের দ্বারে দ্বারে, ঘরে ঘরে ঘুরে ঘুরে টাকা আদায় করতে হয়। এও এক মজার জীবন, কষ্টেরও জীবন।

বেশ কয়েক বছর আগে মাস্টার্স পাস করে চাকুরি খুঁজতে শুরু করি। বাবা ভ্যান চালায়। মা এক অসহায় কিন্তু গর্বিত গৃহিণী।
মায়ের আদর স্নেহে আমার ছোট আরো তিনটি বোন মানুষ হচ্ছে। শত কষ্টের মধ্যেও বাবা-মা আমাদের লেখাপড়া শেখাচ্ছে। আমি ওদের বড় ভাই। চলার পথের এবং বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। হাজারো স্বপ্ন আর হাজারো প্রত্যাশা নিয়ে অপলক চেয়ে থাকে আমার দিকে।

এক সময় একটি বেসরকারী ব্যাংকে চাকুরি পেলাম। ঠিক ওই সময়ই দুটো বোন একসাথে এসএসসি পাস করে। বড় হওয়ার আশায় ও বড় করে তোলার স্বপ্নে ওদের জেলা শহরের একটি ভালো কলেজে ভর্তি করে দেই। মেসে একই রুমে ওদের থাকার ব্যবস্থা করেও দিই।

ছোট বোন রুবি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। তিনটি বোনের 'ভাইয়া! ভাইয়া!' ডাকে মুগ্ধ হয়ে থাকি।

ব্যাংকের চাকুরিতে বেতন বেশ ভালো। মনের আনন্দে চলছিল বেশ।
হঠাৎ, একদিন বাড়ি থেকে খবর এলো, বাবা খুবই অসুস্থ। মা আমাকে মোবাইলে বার বার বাড়ি যাওয়ার জন্য বলছে, বাপ তুই ইকটু তাড়াতাড়ি আয়।

তারপর কাঁদতে থাকে, মোবাইলে স্পষ্ট বুঝতে পারছি। এবার রুবি ফোন ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ভাইয়া বাবার অবস্থা ভালা না, তুমি চইলি আইসু।

আমি অস্থির হয়ে পড়ি। ফোন করি কলেজে জলি ও মলির কাছে, হারে তুরা কোথায়?
মোবাইলে হড়হড় শব্দ হচ্ছে। এই শব্দের মধ্যেই ওরা বলছে, ভাইয়া আমরা বাড়িতে যাইছি, তুমি তাড়াতাড়ি চইলি আইসু।

আমি আর কিভাবে স্থির থাকি?
ম্যানেজার স্যারের দরজায় গিয়ে সালাম দিলাম। উনি পেপার পড়ছিলেন। চোখ তুলে না তাকিয়েই সালামের উত্তর না দিয়েই বললেন, কী হয়েছে আলম সাহেব?

আমি উনার কক্ষে প্রবেশ করে দাঁড়িয়ে থেকেই বললাম, স্যার আমার বাবা খুবই অসুস্থ, এখনি বাড়ি যেতে হবে।
উনি বললেন, তোমার নতুন চাকুরি, বাড়ি যাবে কেন? বাবা তো মরে যায়নি।

আমি উনার কথা হজম করেই বললাম, স্যার! মা বার বার ফোন করছে, ছোট বোনরাও অস্থির হয়ে পড়েছে।

উনি ঘাড়টা উঁচু না করেই বললেন, আলম সাহেব এখন জুন ফাইনাল চলছে, বাবা তো বেঁচে আছে, যান চাকুরি করেন, মরার সংবাদ এলে বাড়ি যাবেন।

মনে হচ্ছিল, সামনে থাকা চেয়ারটি তুলে ম্যানেজারের মাথায় মারি। পরক্ষণেই জীবনের অভাব-অনটন আর দরিদ্রতার কথা ভেবে নীরবে উনার কক্ষ থেকে বের হয়ে আসি।

কী আর করা!
আবারও জলি আর মলি ফোন দিচ্ছে, ভাইয়া তুমি কতদূর?
আমি মিথ্যা বলি, পথের মধ্যে আছি, অপেক্ষা কর, চলে আসছি।

ম্যানেজার স্যারের কক্ষে না গিয়ে সোজা বেরিয়ে পড়ি বাড়ির উদ্দেশ্যে।

বাড়ি এসে দেখি, বাবা উঠানে পড়ে আছে। তার পা দুটো ভেঙে গেছে। রক্তে ভিজে আছে মাটি।
রাস্তায় বাবা ভ্যান চালাচ্ছিলেন। তার ঠিক পেছনে তিন কিশোর মোটর সাইকেল চালাচ্ছিল। তারা এসে পিছন দিক থেকে ভ্যানকে ধাক্কা দিলে বাবা কাত হয়ে ডান পাশে পড়ে যায়। ওই সময় একটি ট্রাক এসে দু'পায়ের উপর দিয়ে দ্রুত বেগে চলে যায়।
স্থানীয় লোকজন ধরে পা'দুটো কাপড় দিয়ে জড়িয়ে বেঁধে বাড়িতে রেখে যায়।

আমি দেখে হতবাক। মা এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, একটা কিছু কর বাবা।

আমি দ্রুত একটি মাইক্রোতে করে বাবাকে নিয়ে এসে জেলার সদর হাসপাতালে ভর্তি করি। বাবা আমার দিকে ফ্যাল-ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। আমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই বাবার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগলো।

বাবার পাশে হাসপাতালে দু'দিন থাকলাম। তারপর মা এবং জলিকে হাসপাতালে রেখে চলে আসি অফিসে।

ম্যানেজার স্যারকে সালাম দিতেই উনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী চাই আলম সাহেব?
আমি কষ্ট সহ্য করে অনেক অনুরোধের সুরে বাবার দুর্ঘটনার কথা জানালাম।

উনি মৃদু হেসে বললেন, আলম সাহেব এটি বেসরকারি ব্যাংক। চাকুরিটা হারিয়ে ফেলেছেন।

অনেক অনুরোধ করার পরও তিনি কোনো কথা রাখলেন না। বরং চেয়ার থেকে উঠে চলে গেলেন অন্যদিকে।

বাড়ি এসে কাউকে কিছু না বলে এক বন্ধুর সহযোগিতায় কসমেটিক কোম্পানীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করলাম।
সেই থেকে ছয়টি বছর ধরে দৌড়াচ্ছি।

এর মধ্যে গ্রামের হাই স্কুল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। একজন অফিস সহকারী নেওয়া হবে।

গেলাম হেড স্যারের কাছে। উনি খুব সুন্দর করে বললেন, তোমার মত ছেলে পেলে তো স্কুল ও অফিস দুটোই ভালো চলতো। তবে আমার কিছু করার নেই বাবা। তুমি সভাপতির কাছে যাও, যুগ-জামানা তো পাল্টি গিছে। দেখো, উনি কি বলেন।

গেলাম সভাপতির কাছে। উনি বললেন, তুমি তো ভালো ছেলে। অনেকে সাত-আট লাখ টাকা দিতে চাচ্ছে। তুমি না হয় লাখ পাঁচেক টাকা জোগাড় করো।

মনে মনে ভাবলাম, আমি তো পাঁচশ’ টাকাও দিতে পারবো না।

আবার দৌড়ানো শুরু করলাম। বিভিন্ন দোকানদারকেও স্যার বলে সম্বোধন করে অনুরোধ করি, একটা আইটেমের মাল নেন।

কত গ্রামের সাধারণ মুদী দোকানদারও কত রকম আচরণ করে, সবই হজম করি সংসার চালানোর জন্য। দুটো টাকা আয় করার জন্য।

এএইচ/জেইউ


oranjee