ঢাকা, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ |

 
 
 
 

মাদক একটি মৃত্যুকূপ

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৪৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৭, ২০২০

লেখক- ইকবাল হোসেন জীবন। ছবিঃ সংগৃহীত

শুরুটা পাড়ার আড্ডায় বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সিগারেটের একটি-দু'টি টান; তারপর কিছুটা ভিন্নতার খোঁজে ডেন্ডি অথবা গাঁজা, যাদের সামর্থ্য একটু ভালো তারা বাংলা মদ, তার চেয়ে ভালো হলে বিদেশি মদ, ফেন্সিডিল কিংবা ইয়াবা। সব মিলিয়ে নেশার ঘোরে ডুবে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজ। মাদক একটি মরণব্যাধি। আত্মহননের অসৎ এবং কুৎসিত একটি পথ। সাময়িকভাবে মাদক সেবনে উন্মাদনা এবং উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্রথম প্রথম মাদকসেবীরা মনে করে, মাদক সেবনের মাধ্যমে জীবন হয় আনন্দের এবং নিজেকে মনে করে রাজকীয় আসনের ব্যক্তি। শুরুটা সিগারেট কিংবা ডেন্ডি থেকে হলেও এর পরের পর্ব কিন্তু আরও ভয়ঙ্কর। ভুল করে নেশার জগতে ঢুকে পড়া এসব কিশোর ও যুবকরা একসময় হারিয়ে যায় গাঁজা, হেরোইন, প্যাথেড্রিন অথবা ইয়াবার মতো ক্ষতিকর থাবায়। শেষ পরিণতির খবর না বুঝেই যারা একটু একটু করে নেশার জগতে পা রাখে তাদের সবারই গন্তব্য সাধারণ জগৎ থেকে অনেক দূরে। নেশার মাঝে সুখ খুঁজতে গিয়ে যারা নিজেদের এবং আশপাশের বিপদ ডেকে আনেন তাদের নিয়েই রাষ্ট্রের মাথাব্যথা।

দেশের মূল সম্পদ হচ্ছে জনশক্তি। এই জনশক্তির দুই তৃতীয়াংশই হচ্ছে তরুণ ও যুবসমাজ। তরুণ ও যুবকের জন্য এসময়টা খেলাধুলা আর লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার হলেও দুঃখের বিষয় আমাদের তরুণ ও যুবসমাজের বড় একটি অংশ আজ মাদক নামক মরণনেশায় আক্রান্ত। বিভিন্ন সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের শতকরা ৮০ শতাংশ তরুণ ও যুবক। নেশার রাজ্যে বিচরণকারী আরেক দলের নাম নারী মাদকাসক্ত। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছেলেদের পাশাপাশি এক শ্রেণির মেয়েও রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে। নেশার জগতে তাদের বিচরণ বাড়ছে। ছেলেদের চেয়ে কিছুটা গোপনীয়তা রক্ষা করলেও নেশায় ক্ষতির ঝুঁকি ছেলেদের থেকে মেয়েদেরই বেশি। কেউ পারিবারিক কলহ আবার কেউ ছেলে বন্ধুর প্রতারণার শিকার এমন মেয়েই মূলত বেছে নেয় নেশার পথ। বখাটে ছেলেবন্ধুরা নিজেদের দল ভারি করতে বান্ধবীকে এই পথে টেনে নিয়ে আসে। এরপর সাময়িক স্বস্তির জন্য শুরু হলেও এই পথই হয়ে যায় তাদের জন্য না ফেরার দেশ। 

কুৎসিত এবং মারাত্মক এই পথ থেকে ফেরা খুবই কঠিন, কারণ আমাদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন প্রকার শারীরিক-মানসিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফলে, এক পর্যায়ে মাদক সেবনে বাধ্য হয় তারা। পরবর্তীকালে এটা দৈনিক সেবনে একটি নেশা হিসেবে গড়ে উঠে। মাদক সেবনে আসক্ত ব্যক্তিদেরকে মাদকদ্রব্য কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে ধীরে ধীরে পঙ্গুত্বের দিকে নিয়ে যায়। মাদকসেবীর জীবনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। ফলে আমাদের দেশ আজ ভয়াবহ বিপর্যয়ের অতি নিকটে। মাদক সেবনের ফলে আমাদের তরুণ ও যুবসমাজ জীবনশক্তি, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা ও মেধা হারিয়ে তাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত এবং এদের অধিকাংশই জড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।

কুপথে যাওয়া এমন সন্তানদের বাবা-মায়ের কাছে এমন দৃশ্য যেমনি অসহ্য তেমনি অপমানজনক কিন্তু এসবের পেছনেও যুক্তি আছে নষ্ট হয়ে যাওয়া এসব সন্তানদের। যুবসমাজের এই বিপথগামিতার অন্যতম প্রধান কারণ বেকারত্ব। দেশে কর্মক্ষেত্রের অভাব হেতু লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী লেখাপড়া শেষ করে বেকার জীবনযাপন করছে। এরা বাবা-মায়ের ওপরও নির্ভর করতে পারে না। চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে তারা যখন হতাশার গর্তে পড়ে হাবুডুবু খায়, ঠিক তখনি তারা কিছুটা মিথ্যে সুখ খুঁজতে নিজের অজান্তেই ঢুকে পড়ে ভয়াবহ এই নেশার জগতে। পৃথিবীর অনেক কিছুই দেখার আগে সবকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার এই গল্পের পরের অংশ আরও নির্মম এবং হৃদয়বিদারক। কিন্তু যাদের গল্প এখনো সুস্থ-স্বাভাবিক তাদের রক্ষায় আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র কতটা সাবধান?

আমরা জানি, নেশার মরণথাবা মানুষের অমূল্য জীবনকে মূল্যহীন করে দিচ্ছে। একজন নেশাখোর মানুষ যেভাবে নিজের জীবন ধ্বংস করছে ঠিক একইভাবে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে তার আশপাশের মানুষগুলোকেও। কিন্তু সেই নেশার আসর বন্ধ করতে আমরা কতটা সতর্ক? নেশার ছোবল থেকে মানুষকে দূরে রাখার দু'টো পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে প্রচলিত রয়েছে। এর একটি মানুষকে সচেতন করে মাদকদ্রব্য উন্মুক্ত করে দেয়া এবং অন্যটি মাদকদ্রব্য প্রদর্শন ও বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ।

তাছাড়া মাদকের এই মারাত্মক ব্যাধি থেকে সমাজকে বাঁচাতে হলে সর্বপ্রথম মাদকের চাহিদা শূন্যের কোটায় নিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে বিভিন্ন ধরনের সৃষ্টিশীল প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা এবং মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে শিশু-কিশোর ও তরুণ সমাজকে গড়ে তুলতে হবে। মাদকাসক্তির ভয়াবহতা এবং কুফল সম্পর্কে পরিবার, সমাজ, স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর কুফল এবং ভয়াবহতা তুলে ধরে সামাজিকভাবে মাদকবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণ সমাজ ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে যাতে আর নতুন করে কারও সন্তান, কারও ভাই, কারও প্রিয়জন মাদক নামক মরণনেশায় আক্রান্ত হয়ে নিজের সুন্দর জীবনকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেয়। ইতোমধ্যে যারা মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন তাদের চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে, কারণ একজন আসক্ত ব্যক্তি খারাপ নন, অসুস্থ।

জীবনের এই কালো অধ্যায় থেকে মাদকাসক্তরা কবে ফিরে আসবে, জানে না তাদের কেউই। আমরাও জানি না প্রজন্ম কবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে। তবে স্বপ্ন দেখতে দোষ কী? শুধু তাদের ওপর দোষ চাপিয়ে না দিয়ে আমাদের উচিত হাত বাড়িয়ে দেয়া। সমাজকে মাদকমুক্ত করতে রাষ্ট্র এবং পরিবারের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারের সচেতনতা, ভালোবাসা, দৃঢ় অঙ্গীকার ও সক্রিয় ভূমিকা মাদকাসক্তি নামক বিভীষিকাকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং প্রত্যেক পরিবার, সমাজ এবং সরকারকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের গণসচেতনতামূলক আন্দোলনের মাধ্যমে একটি সুন্দর জাতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করার মাধ্যমেই একটি সুস্থ জাতি গঠন সম্ভব। চলুন ‘মাদককে না বলুন’ স্লোগান দিই।

ইকবাল হোসেন জীবন: শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ফেনী সরকারি কলেজ।
jibonmirsarai@gmail.com


oranjee