ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ | ১২ জ্বিলকদ ১৪৪৫

ভার্চুয়াল লাইফের কাছেই আটকাচ্ছে প্রজন্মের মেধার বিস্তার

ভার্চুয়াল লাইফের কাছেই আটকাচ্ছে প্রজন্মের মেধার বিস্তার

মোহাম্মদ তারেক

মোহাম্মদ তারেক 

ভোর বেলা কাক ডাকা সকালে পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙেছে ৯০ দশকের প্রজন্মের। সকাল সকাল হাতে কোন একটা খাবার নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম ফোরকানিয়া/নুরানি মাদ্রাসায়। পড়াশোনা শেষে সবাই মিলে পরিষ্কার করতাম মসজিদ মাদ্রাসার প্রাঙ্গণটা। তারপর লাইন ধরে পথচারীদেরকে একি সুরে সালাম দিয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরা।

পান্তাভাত কিংবা হাল্কা নাস্তা খেয়ে বেরিয়ে পড়তাম স্কুলের জন্য অনেকের সাথে থাকতো টিফিন বক্সও। ব্যাগের ভিতর ৬ টা বই সাথে প্রায় এক দেড় কেজি ওজনের একটা গাইড। জাতীয় সংগীত পাঠের আগে স্কুলে প্রাঙ্গণে বন্ধুরা সবাই মিলে মৌসুমী ফলের গাছের নিচে একটা চক্কর দিয়ে আশা!

টিফিন ছুটি শেষে আবার তাড়াহুড়ো করে ক্লাসে ফিরা। বিকালের ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরতে ব্যাগ,বই-খাতা রাস্তার ধারে কোথাও রেখে নেমে যাইতাম খেলার মাঠে। সেই পরিপূর্ণ তৃপ্তি বা সুখের মাত্রাটা পরিমাপ করার জন্য কোন যন্ত্র এখনো আবিষ্কার হয়নি যেটা শুধু মন দিয়েই উপভোগ করা যেত। বর্ষার বাদলে বৃষ্টি ভেজা সন্ধায় কাদামাখা কাপড় নিয়ে মায়ের ভয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে বাসায় ঢুকা, সন্ধায় হারিকেনের গ্লাসটা পরিষ্কার করে পড়তে বসা এমন সময়টা এই প্রজন্মের কাছে যেন পুরানো কোন বইয়ের পৃষ্ঠার বর্ণনা কিংবা এলাকার কোন বৃদ্ধা লোকের কাছে শুনা শত বছর আগের ইতিহাস!

তারা দেখেনি রাতের বেলা পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে স্থানীয়দের কাবাড়ি খেলা, শিশুদের কানামাছি সহ নানান রকমের বাঙ্গালী জাতীর ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির মেলা, তারা দেখেনি শেষ রমজানে ইফতারের বাটিটা নিয়ে ঈদের চাঁদ দেখতে ঘর থেকে বেরিয়ে উল্লাসে মেতে উঠা, তারা দেখেনি হারিকেনের আলোতে বিভিন্ন পোকামাকড়ের সাথে দুষ্টমির চলে পড়াশুনা আর শুক্রবার বন্ধের দিনটা খেলাধুলায় কাটানোর জন্য বৃহস্পতিবার রাতের আনন্দটা। 

আধুনিকতা এবং বৈদেশিক সংস্কৃতির জোয়ারে আমরা হারিয়ে ফেলেছি আমাদের সেই গৌরভ আর ঐতিহ্যের কালচারাল চর্চা। যুব সমাজ যেভাবে দুষিত সংস্কৃতিকে আলিঙ্গন করে নিয়েছেন এতে প্রথম আঘাতটা এসেছে আমাদের শিক্ষার উপর, সংস্কৃতির উপর এবং প্যারেন্টিং এর উপর।

পাবজি,ফ্রি ফায়ারের মত অশক্ত এন্ড্রয়েড/স্মার্ট ফোনের ক্ষতিকর অনলাইন গেইম, মরণ নেশা ইয়াবা, হেরোইন সহ নানান রকমের মাদক খুব সহজেই পেয়ে যাচ্ছে হাতের নাগালে! খেলাধুলা থেকে দূরে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল অসৎ ব্যবসা/বিনিয়োগ, গেইম ইত্যাদিতে মনযোগী এই প্রজন্ম। আগের মত এখন স্কুল কলেজের বন্ধের দিনে নানার বাড়ি যাওয়ার সেই আনন্দ তাদের মাঝে নেই! এখন তাদেরকে খেলার মাঠে নিয়ে যাওয়া যেন বাজার থেকে কেনা গরুকে ট্রাকে তোলার সামিল!
মুটোফোনটা টিপাটিপি করতে করতে মাঠে গেলেও খেলা শুরু হয়ে যায় কিন্তু তারা একেকজন মাঠের একেক কোনায় বসে জুয়ার টাকা হারানোর টেনশনে হাতের নক কামড়ানোতে ব্যস্ত। অনেককেই দেখা যায় খেলায় ফিল্ডিং করে অনলাইনে জুয়া খেলার ম্যাচের স্কোর দেখে দেখে। 

সবকিছুর প্রভাবে তাদের ঘুমানোর টাইম হয় যখন মানুষ ঘুম থেকে উঠে, আর ঘুম থেকে উঠার টাইম হয় যখন মানুষ কাজ থেকে বাসায় ফিরে! রাত জেগে গেইম, মুভি,নাটক ইত্যাদিতে মগ্ন অবস্থায় কাটিয়ে দেয় ঘুমানোর উপযুক্ত সময়টা। বিশেষজ্ঞরা বলতেছে, "এতে করে তাদের মেজাজ কিটকিটে হয়ে যাচ্ছে এবং মেধা হ্রাস পাচ্ছে" বিভিন্ন রকমের অপরাধমূলক কাজকে খুব সহজ ভাবে নিচ্ছে, পিতামাতার অবাধ্যতা এবং অসামাজিক হয়ে পড়তেছে তাদের আচার আচরণ। 

এতে করে শারীরিরক সক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে দিনদিন। অনিয়মিত ঘুম এবং খাবারের কারণে ঘ্রাস করছে নানান রকমের রোগ, কায়িক শ্রম থেকে দূরে থেকে এইভাবে জীবন ধারণ মোটেও স্বাস্থ্যকর মনে করছেননা চিকিৎসকরা। গার্ডিয়ানরা জানিয়েছেন, "এতে বাচ্চাদেরকে কোন প্রেশার করা যাচ্ছেনা এতে করে তারা রেগে যায়, বাসায় ভাত পানি খায়না, বাইরে থাকে, রাতেও খুব তারাতারি বাসায় ফিরেনা, বাসায় আসলেও একটা ইতিবাচক আচরণ দেখা যায়না, মা হয়ে এটাও সহ্য করতে পারিনা। পড়াশোনা করতে বলে লজিক দেয়, কোচিংয়ে যাচ্ছিতো, বাকি গুলা পরিক্ষার আগে পড়তে হবে, এত আগে পড়লে ভুলে যাব! এইভাবে ধ্বংসের পথে আমাদের এই প্রজন্ম।

অনেকেই আবার ধর্মীয় শিক্ষার অভাব এবং প্রাথমিক পর্যায়ে পারিবারিক শিক্ষার অভাবের কারণে এমনটা হয়েছে বলে দাবি করেন। সেই সাথে বিদেশি সংস্কৃতির আবির্ভাব এবং সেগুলোকে গ্রহণ করাটাও এই ক্ষতি এবং হুমকির মূল কারণের মধ্যে একটা দাবি করেন।

মোহাম্মদ তারেক: গণমাধ্যম কর্মী, চট্টগ্রাম।