ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৭ মাঘ ১৪২৯ | ৯ রজব ১৪৪৪

‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ দিবস আজ

‘দস্যুমুক্ত সুন্দরবন’ দিবস আজ

ফাইল ছবি

সোহেল রানা বাবু, বাগেরহাট: বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে জলদস্যু মুক্ত হবার চারবছর পূর্তি হচ্ছে আজ।
২০১৮ সালের এইদিনে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত এলাকা ঘোষণা করেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার পর বনে এখন শান্তির সু-বাতাস বইছে। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, অন্যথায় হত্যা এখন আর নেই।  মৌয়ালী, বাওয়ালী, বনজীবী, বন্যপ্রাণী এখন সবাই নিরাপদ। নির্বিঘ্নে আসছে দেশী বিদেশী,পর্যটক, দর্শনার্থী -পর্যবেক্ষক ও জাহাজ বণিকেরা। এভাবেই সরকারের দূরদর্শিতায় সুন্দরবন অর্থনৈতিক গতিশীলতা ব্যাপক সম্ভবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনে বেড়েছে বাঘ-হরিণসহ বন্য প্রাণীর সংখ্যা।

বনবিভাগের তথ্যসূত্র অনুযায়ী সুন্দরবনে গড়ে প্রায় ১ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক প্রতিবছর ঘুরতে আসেন।  সুন্দরবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এই সুন্দরবন ২৪ ঘণ্টায় ছয় বার রূপ পাল্টায়। সুন্দরবনে আছে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের খনি; আছে  জগৎবিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার।

মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে এ নদী-খাল ঘিরেই একসময় সুন্দরবনে গড়ে উঠেছিল বিশাল জেলে সম্প্রদায়। ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকেও সুন্দরবনের নদী-খাল থেকে মাছ পাওয়া যেত ২০ হাজার টনের কাছাকাছি।মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সুন্দরবন এলাকা থেকে মাছ আহরণ হয়েছিল ১৮ হাজার ৩৬৬ টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৮০ টনে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর মাছের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৬ হাজার ৮৭০ টনে।এদিকে মাছের এই বিশাল বাজারের কারণে এসব এলাকায় একদিকে যেমন নতুন নতুন জেলে এই পেশায় আসে অন্যদিকে এই অঞ্চলে জেলের উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য একশ্রেণির দস্যু নিজেদের আস্তানা গড়ে তোলে। এদের কাজ হল সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া বিভিন্ন ট্রলার জিম্মি করা এবং ট্রলারের জেলেদের জিম্মি করে টাকা আদায় করা। দস্যুরা জেলে ও বনজীবীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অংকের চাঁদা না পেলেই অপহরণ করত, কখনো টাকা না পেয়ে মারধর করতো। এক পর্যায়ে জেলেরা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ঋণ করে টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ছাড়িয়ে আনতো। দস্যুদের মধ্যে ছোট-বড় বিভিন্ন দল থাকলেও কখনো কখনো নিজেদের কোন্দলের কারণে দল ভেঙ্গে একাধিক দস্যু দল গড়ে ওঠে। 

২০১২ সালের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে র‌্যাব মহাপরিচালককে প্রধান সমন্বয়কারী করে সুন্দরবনের জলদস্যু দমনের টাস্ক-ফোর্স গঠনের মাধ্যমে জলদস্যু মুক্তকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। লিড এজেন্সি হিসেবে র‌্যাব ২০১২ সাল থেকে সুন্দরবনে জোরালো অভিযান পরিচালনা শুরু করে। অবশেষে ২০১৬ সালের ৩১ মে বিনা যুদ্ধে প্রথম দাপুটে জলদস্যু মাস্টার বাহিনী আত্মসমপর্ণ করে। ৫১টি আগ্নেয়াস্ত্র, প্রায় পাঁচ হাজার রাউন্ড গুলি ও তাদের ব্যবহারের সিক্স সিলিন্ডারের ট্রলার নিয়ে ১৩ সদস্যের এই দলটি র‍্যাবের কাছে সব জমা দেয়। বাকি দস্যুবাহিনীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, মাস্টার বাহিনীর সবাই র‍্যাবের হাতে মারা পড়বে। যখন মাস্টার বাহিনীর একটি লোকও মারা যায়নি বরং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে; এই বিষয়টা সবাই দেখে তখন বাকি দস্যুবাহিনীগুলো যোগাযোগ শুরু করে।

মোট ৩২টি দস্যু বাহিনীর মধ্যে সিংহভাগ দস্যুবাহিনীই র‍্যাবের কাছে আত্মসমপর্ণ করে। এখন সুন্দরবন আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত। সুন্দরবন এখন জলদস্যু মুক্তবর্তমানে আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুরা পুনর্বাসিত হয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সাবেক জলদস্যুদের প্রত্যেককে নগদ এক লক্ষ টাকা আর্থিক অনুদান দেয়া হয়। এছাড়া আত্মসমর্পণ করা জলদস্যুদের ঘর, দোকান, নৌকা, জাল ও গবাদী পশু হস্তান্তর করছে সরকার। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে আত্মসমর্পণকারী সব জলদস্যু ও বনদস্যুদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের (হত্যা ও ধর্ষণ) মামলা ব্যতীত অন্যান্য সব সাধারণ মামলা সহানুভূতি সহকারে বিবেচনার বিষয়টি চলমান রয়েছে। 

গত বছর সুন্দরবন দস্যুমুক্ত দিবসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্হিতিতে র‌্যাব জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ঘর, মুদি দোকান, গরু, মাছ ধরা জাল, ট্রলার, নৌকা বিতরণ করলেও এ বছর তেমন কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়নি।

এএইচ