ঢাকা, রবিবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৫ মাঘ ১৪২৯ | ৭ রজব ১৪৪৪

শহীদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য : বিপদ মুক্তির সাহায্য করাই যাঁর ধর্ম-কর্ম

শহীদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য : বিপদ মুক্তির সাহায্য করাই যাঁর ধর্ম-কর্ম

প্যারী মোহন আদিত্য

সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজ সেবক, শহীদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন এবং সহায়তা করতেন নানাভাবে। এ খবর গোপন থাকেনি। স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জেনে যায়। ১৯৭১ সালের ৮ আগস্ট টাঙ্গাইলের পাকুটিয়ার সৎসঙ্গ আশ্রমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন তিনি।  

উল্লেখ্য তিনি সব ধর্মের মিলনক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের প্রবর্তিত সৎসঙ্গের সহ প্রতি ঋত্ত্বিক, সৎসঙ্গ সংবাদ পত্রিকার সহ-সম্পাদক, সৎসঙ্গের কার্যকরী পরিষদের সদস্য, পরর্বতিতে সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। এলাকার সব সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তিনি মুখ্য ভূমিকায় থাকতেন। সমাজ সেবক প্যারী মোহন আদিত্য সত্তরের জলোচ্ছ্বাসের পর তিনি সহযোগীদের নিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে গিয়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন। শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্যে মানবতার ধর্ম বিশ্বাস করতেন। মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ ও বিপদগ্রস্থ হলে তাদের পাশে দাঁড়ানো, বিপদ মুক্তির জন্য সাহায্য করাই তাঁর ধর্ম ও কর্ম ছিল।


শহীদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য ১৯৫৮ সালে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুল চন্দ্রের ব্যবহৃত পাদুকা ভারতের দেওঘর থেকে বহন করে এনে আশ্রম প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। যা আজও পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে প্রদর্শিত আছে। তার আগে ১৯৫৭ সালে শ্রীশ্রীঠাকুরের বানী ও আদর্শ প্রচার করার জন্য তাঁর যগ্ম সম্পাদনায় সৎসঙ্গ সংবাদ পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

 
টাংগাইল জেলায় অন্যান্য শহিদের মধ্যে শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্যের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত রশীদ হায়দার সম্পাদিত স্মৃতি ১৯৭১ এর পুনর্বিন্যাসকৃত চতুর্থ খন্ডে, তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত  চিন্তা চেতনার মুক্তিযুদ্ধকালীন তাঁর ভূমিকা অপরিসীম বীরত্বের কথা আলোকপাত করেছেন, চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত সচিত্র বাংলাদেশ এ, ‘দেশাত্মবোধ ও আধ্যাত্মিক চেতনায় শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য’, সৎসঙ্গ সম্পাদক শ্রীরাস বিহারী আদিত্য সম্পাদিত শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুল চন্দ্র ও সৎসঙ্গ বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থে শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্যের কর্মময় জীবন ও মানবতার কথা তুলে ধরেছেন, কবি সমরেশ দেবনাথের গ্রন্থে, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক শফিউদ্দিন তালুকদারের একাত্তরের গণহত্যা-যমুনার পর্ব ও পশ্চিম তীর, জুলফিকার হায়দারের ঘাটাইলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং টাঙ্গাইলের রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধ গ্রন্থে এবং ভারত থেকে প্রকাশিত সাময়িকে তাঁর প্রেম-ভক্তির কথা বলেছেন।

 এবং জাতীয় ও টাঙ্গাইলের স্থানীয় পত্র-পত্রিকাতে শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য সম্পর্কে শহিদ হওয়ার বিবরণ ও কর্মময় জীবন সম্পর্কে প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও আলোচনা সভায় আলোকপাত করেছেন। প্যারী মোহন আদিত্যের স্মরণে পাকুটিয়া সৎসঙ্গ তপোবন বিদ্যালয়ের সামনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ করা হয়েছে। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ সড়কের পাকুটিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সৎসঙ্গ আশ্রম পর্যন্ত সড়কটি ‘শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্য সড়ক’ নামকরণ হয়েছে।

গত ৮ আগষ্ট রোববার ছিল শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্যের মৃত্যুবার্ষিকী। অর্ধশত বছর পূর্বে, পাকিস্তানি হানাদাররা সৎসঙ্গ আশ্রমে গোলাগুলি শুরু করে এবং পেট্রোল ঢেলে আশ্রম, মন্দির, অফিস, বসত বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। আশ্রমে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সহযোগিতার কারণে তাঁকে প্রথমে গুলি করে এবং লাথি মেরে, এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে অত্যার করে এবং আরও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান চায়। তবুও তিনি মুখ খোলেননি। পরে টেনে হেঁছড়ে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্বিবাদী-ঈশ্বরপ্রেমী মানুষটি নৃশংসভাবে হত্যা করে।


এদিন সমস্ত কিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্যর কোন স্মৃতি অথবা চিহ্ন পৃথিবীর বুকে আজ আর নেই, এমনকি তাঁর কোন প্রতিকৃতিও খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত স্মৃতি’৭১ গ্রন্থে তাঁর লেখা প্রকাশর পর এবং ১৯৯১ সালের ১৪ ডিসেম্বর থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর পৃথক ডাকটিকিটে শহিদ বুদ্ধিজীবীর প্রতিকৃতি নিয়ে প্রকাশিত হত স্মরক ডাকটিকিট। শহিদ বুদ্ধিজীবী প্যারী মোহন আদিত্যের কোন প্রতিকৃতি না থাকায় স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করাও নম্ভব হয়নি।