ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

 
 
 
 

করোনা ভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সফল হংকং

হংকং প্রবাসী বাংলাদেশির মুখে জানুন করোনা নিয়ন্ত্রণে হংকংয়ের উদ্যোগ ও বর্তমান অবস্থা

গ্লোবালটিভিবিডি ৯:৩৯ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৪, ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

চীনের পর প্রথম যে কয়েকটি দেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত করা হয়েছিল তার মধ্যে হংকং অন্যতম। চীনের সাথে লাগোয়া এই স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলটিতে প্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয় জানুয়ারির ২৩ তারিখ।  এখন পর্যন্ত হংকংয়ে মাত্র ১২২ জন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন এবং এর প্রকোপে মারা গেছেন মাত্র ৩ জন।

হংকং কীভাবে নাগরিকদের মধ্যে করোনা ভাইরাস বিস্তার রোধ করলো সে বিষয়ে জানান হংকংপ্রবাসী বাংলাদেশি প্রকৌশলী মোহাম্মদ মুনিরুজ্জামান যিনি সাত বছর ধরে হংকংয়ে রয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে হংকংয়ের উদ্যোগ ও বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হলো।

হংকং প্রবাসী বাংলাদেশি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান

তিনি বলেন, ২৩ জানুয়ারি হংকংয়ে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। আমার মতে, ভাইরাস প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে হংকংকে সবচেয়ে বেশি যেটা সাহায্য করেছে তা হলো তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতা।

২০০৩ সালের সার্স এর সময় চীনের পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল হংকং। হংকংয়ের সাধারণ মানুষ ব্যক্তিগত সচেতনতা মেনে চলার দিক থেকে যথেষ্ট সচেতন। আপনি দেখবেন এখানে প্রায় শতভাগ মানুষের মুখে মাস্ক পরা। সবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা চলছে কিন্তু তাঁরা চেষ্টা করছে ভিড়, জনসমাগম এড়িয়ে চলতে।

ব্যক্তিগত সচেতনতা পালন করছেন তাঁরা, সাধারণ জ্বর সর্দি থাকলেও কর্মক্ষেত্রে আসছেন না। সরকারিভাবেও যথেষ্ট সতর্কতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিটি ভবনের প্রবেশ পথে, সেটা রেস্টুরেন্ট, আবাসিক ভবন বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যাই হোক না কেন সেসব জায়গায় দেখা যায় নিরাপত্তা রক্ষীরা সবার শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করছেন, মাস্ক না পরে কাউকে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। আবার, আমার অফিসের বিল্ডিংয়ের প্রত্যেকটি গেইটের সামনে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখা রয়েছে। যাঁরাই ভবনে প্রবেশ করবেন, তাঁদের সবারই হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে ঢুকতে হবে। আর প্রত্যেক ভবনের প্রবেশ পথেই করোনা ভাইরাস ছড়ানো ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া রয়েছে।

হংকংয়ের কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষ কবে থেকে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেয়া শুরু করেন?

হংকংয়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে যেসব সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার আগেই নেয়া হয়েছিল।

চীনের উহানে যখন করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাব দেখা দিল তখন থেকেই এখানকার সাধারণ মানুষ ও সরকার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে। কারণ, সার্স প্রাদুর্ভাবের সময় হংকংয়ে প্রায় তিনশ’ মানুষ মারা গিয়েছিল। অনেকটা বলা যেতে পারে, জনগণের সচেতনতাই বাধ্য করেছে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে। যেমন একটি উদাহরণ দেই, জানুয়ারির শুরুতে হংকংয়ের মেডিকেল সংশ্লিষ্ট পেশায় থাকা সবাই একসাথে ধর্মঘটে যায়। তাঁদের দাবি ছিল, চীনের সাথে তাঁদের সীমান্ত বন্ধ না করা হলে তাঁরা কাজ করা বন্ধ করে দেবেন। ঐ ধর্মঘটের ফলশ্রুতিতেই সরকার কিছু কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।

কঠোর পদক্ষেপ তার যথাযথ বাস্তবায়ন

চীন থেকে হংকংয়ে প্রবেশ করা প্রত্যেককে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা সরকারিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে হংকংয়ে যা এখন আইনে পরিনত করা হয়েছে। কোয়ারেন্টিন যথাযথভাবে হচ্ছে কিনা তা মনিটর করছে হংকংয়ের পুলিশ প্রশাসন।

এখানে সরকারিভাবে কোয়ারেন্টিনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ঘরে কোয়ারেন্টিনেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাঁরা ঘরে কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন তাঁদের নিয়মিত ফোন করে খোঁজ-খবর রাখছে প্রশাসন। শুরুর দিকে দু'জন কোয়ারেন্টিন ব্রেক করেছিলেন, তাঁদের খুঁজে বের করে আবারো কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে।

জানুয়ারির শুরু থেকে সব পাবলিক লাইব্রেরি, পাবলিক জিমনেসিয়াম বন্ধ রয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। সরকারি অফিসগুলোতে কাজের পরিধি কমিয়ে দেয়া হয়েছে। আর যেসব অফিসে সম্ভব সেসব অফিসে কর্মীদের ঘরে থেকে কাজ করতে বলা হয়েছে।

এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে হংকংয়ের জীবনযাত্রা কতটা পরিবর্তিত হয়েছে?

হংকংয়ে সারা পৃথিবী থেকে পর্যটনের উদ্দেশ্যে মানুষ আসে। এখানে বিভিন্ন ধরনের মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাপন ব্যাহত হয়েছে এসব পদক্ষেপের ফলে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। রেস্টুরেন্ট ও হোটেল ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। তবে সেই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হংকং সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেয়া হবে ১৮ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিদের। প্রত্যেককে ১০ হাজার হংকং ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লাখ টাকা, করে দেয়া হবে।

হংকংয়ে বাংলাদেশিদের কী অবস্থা?

সরকারি হিসেবে হংকংয়ের প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন প্রায় দুই হাজারের মত। আমরা প্রতি বছর বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করি। যেমন প্রতিবছরের মত এবারও ২১শে ফেব্রুয়ারিতে আমাদের অনুষ্ঠান করার কথা ছিল যেটি বাতিল করা হয়েছে। গত দুই-তিন মাসে আমাদের সাধারণ আড্ডার হারও অনেক কমে গেছে। হংকংয়ে থাকা বাংলাদেশি নারী গৃহকর্মীদের যাঁরা অপেক্ষোকৃত কম আয় করে থাকেন তাঁদের মাস্ক ও জরুরি ওষুধপত্র সরবরাহ করা হচ্ছে হংকংয়ের বাংলাদেশ দূতাবাস ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে।

 

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি

জেইউ


oranjee