ঢাকা, শুক্রবার, ২৯ মে ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

 
 
 
 

দেশের একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আশালতা বৈদ্য

গ্লোবালটিভিবিডি ১:১৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৯

ছবি : সংগৃহীত

দেশের একমাত্র নারী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আশালতা বৈদ্য। মাত্র ১৫ বছর বয়সে যুদ্ধে যান। মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতৃত্ব দেন ৪৫ জনের সশস্ত্র নারী গেরিলা দলকে। ৩৫০ নারীকে নিয়ে গঠিত একটি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের নেতৃত্বেও ছিলেন এই সাহসী নারী মুক্তিযোদ্ধা।

আশালতা বৈদ্য ১৯৫৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। স্কুল জীবনে দেশের জন্য কিছু করার তাগিদেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ঘরে বসে থাকতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধের ৮ ও ৯ নং সেক্টরে কোটালীপাড়া সীমানা সাব সেক্টর কমান্ডার হেদায়াত বাহিনীতে যোগ দেন তিনি। হেমায়েত বাহিনীতে মহিলা বাহিনী নামে আলাদা একটা বাহিনী গঠন করা হয়। এ মহিলা বাহিনীতে মোট ৩৫০ জন নারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এই বিশাল নারী মুক্তিযোদ্ধার বাহিনীর একমাত্র কমান্ডার ছিলেন আশালতা বৈদ্য।

দেশ স্বাধীন হলে তিনি আবার পড়াশুনায় মনোনিবেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করেন। ৮০-এর দশকে নারী উন্নয়নের লক্ষে গড়ে তোলেন সূর্যমুখী সংস্থা। বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেও তিনি মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আশালতা বৈদ্য তার বৈচিত্র্যময় জীবনের সেবামূলক কাজের জন্য ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বাছাই কমিটিতে মনোয়ন পেয়েছিলেন। এছাড়া তিনি শ্রেষ্ঠ মহিলা সমবায়ের প্রেসিডেন্ট স্বর্নপদক, রোকেয়া পদক, প্রশিকা মুক্তিযোদ্ধা পদকসহ অনেক পুরষ্কার লাভ করেছেন। তবে এতোকিছুর বাইরেও একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি আজও কোনো রাষ্ট্রীয় উপাধি পাননি। বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে মতিঝিলস্থ তার নিজ কার্যালয়ে কথা হয় গ্লোবাল টিভির সিনিয়র নিউজরুম এডিটর মাহতাব শফি’র সঙ্গে। যা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রেরণা পেলেন কোথায়?
আশালতা বৈদ্য : প্রেরণা বলতে গেলে তো বঙ্গবন্ধু। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমেই আমার রাজনীতিতে হাতেখড়ি। জন্মগতভাবেই আমি একটু দুঃসাহসিক। তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব (তখনও বঙ্গবন্ধু হননি) জেল থেকে বের হয়ে প্রথম জনসভা করার জন্য কোটালীপাড়ায় আসেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ হবে সেই জনসভায়। তাই আমার বাবা- জ্যাঠা আমাকে নেবে না। মেয়েদের নিলে নিরাপদে নিয়ে আসতে পারবে না। আমাদের ছিল বড় বাছারি নৌকা। ওই নৌকার পাটাতনের নিচে শুয়েছিলাম। আমাদের গ্রাম থেকে নৌকা যখন চৌদ্দ-পনের মাইল দূর চলে এসেছে তখন আমি পাটাতনের ভিতর থেকে বের হই। আমাকে দেখে শিক্ষক মানুষ বাবা তো রেগে গেলেন। বললেন, যাওয়া হবে না। নৌকা ঘুরাও। তখন আমার জ্যাঠা বললো, কেন কি হয়েছে? ও যাবে। এই হলো আমার যাওয়া। তারপর গেলাম। একটা হাফ প্যান্ট আর ফ্রক পরা ছিলাম। সেই অবস্থায় গেলাম। সেখানে মঞ্চে নেতারা বক্তৃতা করছে। মঞ্চ থেকে বলল- মেয়েদের মধ্য থেকে কেউ কি বক্তব্য দেবা? আমি চতুর্দিকে তাকিয়ে দেখি কোনো মেয়ে দাঁড়ায় না। আমি লাফ দিয়ে উঠে বললাম- আমি দেব। তখন মঞ্চ থেকে বলল- আসো।

এই আমি গেলাম এবং মনে মনে একটা চিন্তাও ছিল- বঙ্গবন্ধুকে একটিবার কাছে থেকে একটু দেখার। তাও হোক। তারপর উপরে উঠলাম, তখন একটা স্লোগান প্রায়ই শুনতাম, ‘জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো’ সেই শেখ মুজিবকে দেখতে হবে না। তারপর বক্তব্য শুরু করেছি। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু চলে আসছেন ঘাঘর বাজারে। তখন ম্যাসেজ এসেছে শেখ মুজিব এসে পড়েছে। আমার হাত থেকে মাইকটা কেড়ে নিল তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আবদুল আজিজ। তারপর বললেন, ‘এই যে মামুনি তুমি নামো’। উনার কথা শুনে তখন যে কী কষ্ট লাগলো! ইচ্ছা ছিলো মঞ্চ থেকে একটু বঙ্গবন্ধুকে দেখবো। তখন আমি নামছি তো নামছি না- এরকম করছি। এরই মধ্যে বঙ্গবন্ধু এসে হাজির। তিনি স্বভাবসুলভভাবে মঞ্চের এদিক ওদিক ঘুরছে। তারপর বললেন- কিরে আজিজ আমি ঘাঘর থেকে একটি কোকিল কণ্ঠের বক্তব্য শুনছিলাম সেই কোকিলটা কোথায়? এরপর আমার কদর বেড়ে গেল। শেখ আবদুল আজিজ আমাকে বললেন, এই তুমি আসো- এই হলো আমার আশালতা। বঙ্গবন্ধু আমার হাত ধরে বলল- ‘এই বুড়ি আরও বক্তৃতা করবা? আমি বললাম- হ্যাঁ করবো। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমাকে পাখির মতো জড়িয়ে ধরে উনার সমান মাইকে উঠিয়ে দিলো। আমি টানা ৪৫ মিনিট বক্তৃতা করলাম। এরপরই কোটালীপাড়ার আশালতা বিখ্যাত হয়ে গেল। তখন ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠবো। এরই মধ্যে কিন্তু নাম চারদিকে ছড়িয়ে গেল আমার।


মাত্র ১৫ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, এই সাহস কীভাবে পেলেন?
আশালতা বৈদ্য : ১৯৭০ সালের নির্বাচন। মোল্লা জালাল, ফণী ভূষণ শশাংকর, রোহিত মিঞার নির্বাচনী প্রচারণায় আমি বক্তা। সবাই তখন বলে ‘বঙ্গবন্ধুর বুড়ি’ বলে কথা। তখন আমার গুরুত্বই সেরকম। নির্বাচনী প্রচারণায় নামলাম। তারপর বুঝে না বুঝে আওয়ামী লীগে যোগ দিলাম। পরবর্তীতে দেখা গেল নির্বাচনের আগেই কোটালীপাড়া আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক হলাম। একই ধারাবাহিকতায় গোপালগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমাদের পাশ দিয়ে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতে চলে যাচ্ছে। আমরাও চলে যাবো। রেডি হচ্ছি। সেদিন ছিলো শুক্রবার। তবে আমার মধ্যে একটা বিষয় কাজ করছে তা হলো কিভাবে যুদ্ধে যাওয়া যায়? এর মধ্যে আমাদের বাড়ির পাশের খন্দকার শওকতরা মুসলিম লীগ করতো। উনারা শান্তি কমিটি গঠন করলো। ৭ই মার্চে স্কুলে যাচ্ছিলাম সেবার আমরা পরীক্ষার্থী। পথে জমির মধ্যেই কৃষকরা রেডিওতে বঙ্গববন্ধুর ভাষণ শুনছে। আমরাও শুনলাম। শুনে আমার বড় বোনকে বললাম, শেখ মুজিব বলতেছে স্কুল কলেজ বন্ধ। আর স্কুলের দিক যাওয়া লাগবে না। ফিরে আসলাম বাড়িতে। এখন চিন্তা যুদ্ধে যাবো কি করে? এরই মধ্যে কেষ্টদা আমাকে নিয়ে যাবে, বলে না হলে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। ঘরে ছিল দা। দৌড়ে দা নিয়ে এসে বললাম, কি বললা? এটা দিয়ে কোপ দেব। আমার বাপে টাকা দেবে কেন। সে আমার প্রতীকৃতি দেখে, দৌড়ে পালালো। যুদ্ধের সময় তারা আইয়ুব খানের ছবি টাঙাতো। বাঘের ছবি টাঙাতো।

মুক্তিযুদ্ধে আপনি তো হেমায়েত বাহিনীতে ছিলেন?
আশালতা বৈদ্য : হ্যাঁ সে কথায় আসছি। তখন ভাবছি যুদ্ধে যাবো যাবো, কিন্তু কিভাবে যাবো, কোথায় যাবো। তার কিচ্ছুই জানি না। হেমায়েত উদ্দিন যিনি মুক্তিযুদ্ধকালে নিজেই গড়ে তুলেছিলেন একটি দুর্ধর্ষ বাহিনী। সেই হেমায়েত ভাই একদিন এসে আমার বাবাকে বললেন, আপনার একটি সন্তান দেন আমাকে, দেশকে শত্রু মুক্ত করতে হবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে বাবাকে বললাম, আমি যুদ্ধে যেতে চাই। তখন হেমায়েত ভাই বললেন, কালকে ৫০ জন মেয়ে জোগাড় করে নিয়ে আসবি। পরের দিন আমি ঠিকই আশপাশের গ্রাম থেকে ৫০ জন মেয়ে জোগাড় করে হেমায়েত ভাইয়ের কাছে হাজির হলাম। এই দেখে উনি আমাকে বললেন, দেশকে স্বাধীন করতে তুই-ই পারবি, আসো। তারপর শুরু হয়ে গেল আমাদের ট্রেনিং। ট্রেনিংয়ে কার কি তথ্য জানা আছে? খ্রিস্টান মেয়েরা বলল, নারিকেল বাড়ির ওখানে ডাক্তার ফিলিপস আর জলি নার্স ঢাকা মেডিকেল থেকে আসছে। ওদের দায়িত্ব দেওয়া হলো ওদের নিয়ে আসার জন্য। আমি বললাম, মাদারিপুর থেকে শ্যামাচরণ বৈদ্য আসছেন এমবিবিএস ডাক্তার। হেমায়েত ভাই বললেন, তুই নিয়ে আসবি তারে। পরে আমি নিজে নৌকা চালিয়ে গিয়ে তাকে নিয়ে আসি।

আপনারা ট্রেনিং ক্যাম্পে কতজন ছিলেন?
আশালতা বৈদ্য : ৫০ জন মেয়ে নিয়ে শুরু হলো আমাদের ট্রেনিং। প্রথম হলো ইনজেকশন দেওয়া, কাটা ছেঁড়া, ব্যান্ডিজ করা ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক ভয় পায় ইনজেকশন দিতে, কাটা ছেঁড়া করতে। কিন্তু আমি ভয় পাই না। হঠাৎ হেমায়েত ভাই এসে ব্লেড দিয়ে নিজের হাত কেটে বলল- তুই সেলাই করবি আবার ব্যান্ডিজও করবি। আমি সেলাইও দিলাম ব্যান্ডিজও দিলাম। এভাবে আমাদের চলছিল ট্রেনিং। এক সপ্তাহ পর আমি হেমায়েত ভাইকে বললাম, এসব দিয়ে তো মুক্তিযুদ্ধে কিছু হবে না। অস্ত্র ট্রেনিং লাগবে। রাইফেল ট্রেনিং, মেশিনগাণ ট্রেনিং। এগুলো না দিলে কি মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যাবে?
পরের দিন হেমায়েত ভাই বলল, তোরা কয়জন, অস্ত্র ট্রেনিং দেব। তখন আমরা ৪৫ জন ছিলাম। আমাদের ৪৫ টাই অস্ত্র দিল। প্রথমদিন দিল ১০টা। প্রথম রাইফেল কিভাবে খুলতে হবে, কিভাবে গুলি লোড করতে হবে, কিভাবে আনলোড করতে হবে? অস্ত্র ট্রেনিং হয়ে গেল।

আপনি হেমায়েত বাহিনীর মহিলা দলের কমান্ডার ছিলেন, কীভাবে আপনাকে নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল?
আশালতা বৈদ্য: ট্রেনিংয়ের এক পর্যয়ে একদিন বললাম- হেমায়েত ভাই, বোমা বানানোর যন্ত্রপাতি দিলে আমরা বোমা বানাতাম। তখন হেমায়েত ভাই বলল, ডিনামাইট বানাতে পারবি? আমি বললাম, হ পারবো। আপনি শুধু মালমশলা দেন। আর এমন একটা ক্যাম্পে ছিলাম যেখানে কোনো মিলিটারি কোনো দিন পাবে না আমাদেরকে। এরপর পুরো মে মাস আমাদের প্রশিক্ষণ চললো। মে মাসের শেষ দিকে বা পহেলা জুন আমাদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের পরীক্ষা। এই পরীক্ষা হলো কৃতি হাই স্কুলের সামনে। আমরা বাংকার ঘিরে রাখলাম। কিভাবে গেরিলা যুদ্ধ করতে হবে, কিভাবে বাংকারে ঢুকতে হবে, কিভাবে গুলি করতে হবে? প্রথম নেওয়া হলো রাইফেল পরীক্ষা। হেমায়েত ভাই, কমলেশদা, ফরিদপুরের বাবুল মিয়া। উনারা হলো পাক আর্মি আর আমরা হলাম মুক্তিযোদ্ধা। গেরিলাম যোদ্ধা। আমরা পাঁচজনে পাঁচটা বাংকার থেকে উঠে ফল্ডিং দিয়ে দিয়ে রোডে উঠি। রাইফেল নিয়ে। উঠার পরে আমাদের রাইফেল টানদিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে। আমার সব মেয়েদের রাইফেল নিয়ে গেছে। কিন্তু আমার রাইফেল আমার হাতেই রয়েছে। রাইফেল নিতে পারেনি। রাইফেলসহ আমি উঠি। এরজন্য বাবুল ভাই ও কমলেশদা আমাকে মাথায় নিয়ে শুধু ঘুরায়। আর বলে ও হলো টিম লিডার। মহিলা দলের কমান্ডার। এই তো আমি কমান্ডার হয়ে গেলাম।

আপনারা কি সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন?
আশালতা বৈদ্য: এবার যুদ্ধে যাবার পালা। আমাদের দুইটা নৌকা দিল। দুই নৌকায় দুজন মাঝি দিয়ে দিছে। ইনফরমার ছিল ছোটরা। যেমন আমার ছোট ভাইটা। ছোট ছোট দশ বারো বছরের বাচ্চারা ইনফরমার। এই ক্যাম্প থেকে ওই ক্যাম্পে দৌড়ে গিয়ে খবর দেওয়া ছিল তাদের কাজ। সেটা হতে হবে নিজস্ব লোক। এরকম আমাদের ক্যাম্পে ছিল চারজন। হেমায়েত ভাইদের ক্যাম্পে তো অসংখ্য। জানলাম, কালকে কলাবাড়ি যুদ্ধ। তোমরা রেডি হও। আমরা গেলাম। যুদ্ধ শুরু হলো না। হেমায়েত ভাইদের সঙ্গে মিলিটারির সরাসরি যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে মিলিটারির লঞ্চ ডুবে গেল। গুলাগুলি পুরুষরাই করছে। আমাদের গোলাগুলি করতে হয়নি। তবে প্রথম যুদ্ধে গিয়ে আমাদের যোদ্ধারা আহত হয়নি। আহত যোদ্ধাদের আমাদের কাছে নিয়ে আসতো।
এরপর ঘাঘর যুদ্ধ। রাজবাড়িয়া যুদ্ধ। হরিনাহাট যুদ্ধ। সবগুলো যুদ্ধেই আমরা অংশগ্রহণ করেছি। এভাবে। মেডিকেল টিম হিসেবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। রামশীল পয়সার হাট যুদ্ধ। ওখানে আমরা অস্ত্র হাতে সরাসরি গোলাগুলি করেছি। হেমায়েত ভাই, কমলেশদাসহ ছিল। এই যুদ্ধটা হলো আমাদের যতগুলো যুদ্ধ হয়েছে। তার মধ্যে সর্ববৃহৎ যুদ্ধ। ওরা কয়েকটি লঞ্চ ভর্তি করে এসেছিল। আর লুট করতো। একশ দুইশো পাঁচশ নৌকা ভর্তি করে এবং মিলিটারিরা কিন্তু কোনো বাড়িতে আগুন দেয়নি। রাজাকাররা দিয়েছে। অতি উৎসাহিত হয়ে বাঙালি রাজাকাররা আগে লুট করে পরে আগুন দিয়েছে। রামশীল পয়সার হাট যুদ্ধ স্মরণীয় হচ্ছে এজন্য যে, আমাদের বাহিনীর প্রধান গুলিবিদ্ধ হন। এক চোয়াল দিয়ে গুলি লেগে অন্য চোয়াল দিয়ে বের হয়। এর পর আর যুদ্ধ হয়নি। তারপর তো দেশ স্বাধীন হয়ে গেল।

স্বাধীনতার পর আপনার বাহিনীর কোনো ভূমিকা ছিল?
আশালতা বৈদ্য: স্বাধীনতার পর আমার টিমটা সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। পুনর্বাসনের কাজ। শরণার্থীদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আমাদের। আমার মেয়েরা হেমায়েত বাহিনী ছিল সুশৃঙ্খল বাহিনী। ভিয়েতনমের যুদ্ধকে স্মরণ রেখে হেমায়েত বাহিনী সুসংগঠিত একটি মুক্তিবাহিনী দল ছিল।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতি..
আশালতা বৈদ্য : বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে স্বাধীনতার পর ৭২-এ ফিরে আসেন। ওই সময় আমি আসলাম। আমার জীবনে প্রথম ঢাকা। কোটালীপাড়া আওয়ামী লীগের পুরো কমিটি আসলো। আমার টিমকেও নিয়ে আসলো। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যখন কোটালীপাড়া আওয়ামী লীগ দেখা করবে বলে নামের তালিকা দিচ্ছে, তখন এক নাম্বারে উনারা লিখেছে ‘আশালতা বৈদ্য আপনার বুড়ি’। তারপর সভাপতি ও সেক্রেটারি নাম। এর পর বঙ্গভবনের ভিতরে যখন ঢুকলাম। তা কি ভোলা যায়। বঙ্গবন্ধু তার চেয়ার থেকে ওঠে বেরিয়ে এলো। আমরা উঠলাম, বঙ্গবন্ধু আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, আমি উনার চেয়ে অনেক খাট। এতটুকু। আমি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। তখন উনি আমার কপালে চুমু দিয়ে বলে ‘আরে বুড়ি তোর বঙ্গবন্ধুকে কি কেউ মারতে পারে, কাঁদিস কেনো? এখন কাঁদিস কেন।

এরপর তো পড়াশোনা শুরু করলেন আবার, সেখানে বঙ্গবন্ধু ভূমিকা ছিল?
আশালতা বৈদ্য : তারপর মেট্রিক পরীক্ষা দিলাম। পাস করলাম। বঙ্গবন্ধুর পছন্দ মতো বরিশাল মহিলা কলেজে ভর্তি হলাম। ওখানে ছাত্রলীগ তৈরি করলাম। আমি সাধারণ সম্পাদক। একজনকে ধরে সভাপতি বানালাম। ওখানে সংগঠন শেষ করে আসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৪ সালে ভর্তি হলাম বাংলা বিভাগে। তারপর রোকেয়া হলের ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে আমি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাহমিদাকে নিয়ে কমিটি গঠন করে রাজনীতি শুরু করলাম। পরে কেন্দ্রীয় কমিটিতে মহিলা সম্পাদক হলাম।

এরমধ্যে কি বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল আপনার?
আশালতা বৈদ্য : হ্যাঁ, এরই মধ্যে আমি বেশ কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করি। তারপর ১৯৭৫ সালের কালো রাত ১৫ আগস্ট। সেদিনই বঙ্গবন্ধুর আসার কথা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রস্তুতি হিসেবে ওবায়দুল কাদের সাহেব দায়িত্ব দিলেন- রোকেয়া হল, শামসুর নাহার হল, ইডেন কলেজের মেয়েদের নিয়ে ভলান্টিয়ার হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে রিসিভ করতে হবে। সেই রিসিভশনের টিম লিডার আমি। ৬৩ নং রুমে সবুজ কাপড় মাথায় লাল ফিতা পরে রেডি হই। বঙ্গবন্ধু ভোরবেলা আসবেন। রোকেয়া হলের মেয়েরা ধরলো তুই তো শুধু বঙ্গবন্ধুরে আগেই দেখছো। আমরা উনাকে ফুল দিব শুধু, পারলে আমাদের ধানমন্ডির ৩২নং রোডে নিয়ে যা। কেউ ঘুমায় না। রাত ১টার দিকে তখন ওই মেয়েদের নিয়ে রোডমার্চ করে ৩২ নম্বরে যাচ্ছিলাম। আমরা যখন নীলক্ষেত আসলাম তখন ইডেন থেকে মেয়েরা আসলো। শেখ কামাল খুব সম্ভব সূর্যসেন বা মহসিন হলে ছিল। তিনিও ওখান থেকে আমাদের সঙ্গে মিলিত হলো। ইসমত কাদির গামাও। গেলাম আমরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করে। চানাচুর মুড়ি খেলাম সেদিন। সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ কামালকে আর ইসমত কাদের গামাকে বলল, ‘আমি যদি মরেও যাই আমার বুড়িকে বিদেশে থেকে লেখাপড়া করিয়ে এনে সমাজসেবা মন্ত্রী বানাবি। তোদের ওপর আমার নির্দেশ।’ আমরা ফিরে আসলাম, এসে মেয়েরা সবাই সাজুগুজুতে ব্যস্ত। আমি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছি। তখন রাত ২টা। আমার মেয়েরা রেডিওতে শুনলো ভোর ৫টার দিকে। তখন ওরা আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলল, ‘খবর আছে, খবর আছে, বঙ্গবন্ধু নেই’। তখন আবার রেডিও শুনলাম তারপর আমি জ্ঞান হারাই। এরপর ওরা আমাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করে। জ্ঞান ফেরে বিকাল বেলা। তখন আমাকে রোকেয়া হলে নিয়ে আসে। দেখি রোকেয়া হলের সবদিকে আর্মি। বিকেলে একটা মিছিল নামলো। ‘স্বৈরাচারী শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে’ এরকম স্লোগানে পক্ষে লুঙ্গি টুপি পরা মানুষরা। এরপর আমি পাগলের মতো হয়ে যাই। অনেক কষ্ট। আমার ক্লাসমেট নুরজাহান আমাকে সান্ত্বনা দেয়। সেই সময় সে আমাকে অনেক সেভ করে।

আপনাকে তো অনেক নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল?
আশালতা বৈদ্য : পনের আগস্ট গেল শোকে তাপে। রোকেয়া হলের ভিতরে আমাকে পালিয়ে থাকতে হয়। মেইন বিল্ডিংয়ের পাঁচতলার ছাদে পানির টাংকির নিচে ছিলাম আমি ১৭দিন। সেনাবাহিনী আমাকে খোঁজে। আমাকে বার বার নিলিমা ইব্রাহিম প্রভোস্ট হিসেবে নোটিশ দেয়। হল ত্যাগ করার জন্য। আসলো জেল হত্যা দিবস। এখন হঠাৎ ভিতরে এমন প্রতিক্রিয়া হয়েছে যে, না, মারা তো যাবোই। রাজপথেই মরি। রাজপথে মরতে গিয়ে রোকেয়া হলের সব ফুল ছিঁড়ে একটা ফুলের তোড়া বানাইলাম। আমাকে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছে ছাত্রইউনিয়নের মেয়েরা। ওরা বলছে, আমরা তোর সঙ্গে আছি। সবাই আতঙ্কিত। তবুও সাহস নিয়ে ফুল নিয়ে মিছিল নিয়ে গেলাম ৩২ নম্বর বাড়ির দিকে। কিন্তু নীলক্ষেতে আমাদের সেনাবাহিনী আটকিয়ে দিল। আমাদের বুকের ওপর রাইফেল তাক করলো। তখন দেখি হঠাৎ আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল ভাই সামনে এসে দাঁড়ালা। তারা বলল, রাইফেল দিয়ে গুলি করবা আমাদের, মা বোনদের নয়। তারা আমাদের সঙ্গে শরিক, আমরা মিছিল নিয়ে নীরবে ৩২ নম্বরে যাই এবং বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে তাকিয়ে আমি আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। এরপর আমাকে গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুক্ত হলে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে লুকিয়ে লুকিয়ে বোরকা পরে টিউটোরিয়াল পরীক্ষা দিলাম। পাস করলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা পৃথিবীর কোথাও পালিয়ে থাকতে পারবে না। তাদের বিচার কার্যকর হবেই।

 

এমএস


oranjee