ঢাকা, বুধবার, ৫ আগস্ট ২০২০ | ২১ শ্রাবণ ১৪২৭

 
 
 
 

মাধ্যমিক শিক্ষা ও রির্সোস টিচার প্রসঙ্গে

গ্লোবালটিভিবিডি ৩:৩৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৬, ২০২০

ছবিঃ সংগৃহীত

মুহাম্মদ আলম হোসেন: বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে একটি রাষ্ট্র। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে দক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলেছে দেশ। আজকের বাংলাদেশ উন্নয়ননশীল অন্যান্য দেশের তুলনায় অধিকতর অগ্রগামী, যদিও উন্নত দেশের সমপর্যায়ের নয়। তাই অগ্রগামী বাংলাদেশ আজ বহির্বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এসবের ধারাবাহিকতায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে পরিচিতি দান করার লক্ষ্যে ভিশন-২০৪১ নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী আলোচিত SDG বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে গ্রহণ করেছে ২০১৫ সালে। এস ডি জির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৭টি যার মধ্যে ৪র্থ লক্ষ্যমাত্রা হলো-“মানসম্পন্ন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিতকরণ”। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যথা- ক. প্রাথমিক স্তর, খ- মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর, গ- উচ্চশিক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় স্তর।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়কাল মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাকাল। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী আবশ্যিক শিক্ষার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১২ বছর যেখানে প্রাথমিকে ৫ বছর শিক্ষা গ্রহনের পর মাধ্যমিকে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় ২য় স্তরের অধ্যয়ন। ৬ষ্ঠ-দ্বাদশ শ্রেণির পড়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভিন্ন জরিপের তথ্য মতে দেখা যায় ৮ম শ্রেণির সমাপনী বৈতরণী পার হতে পারে না ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থী। হাওর, চর, চা বাগান ও পাহাড়ী এলাকায় স্কুলের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম যখন বার বার মাধ্যমিক স্তরের উপর গুরুত্ব দিচ্ছে এবং শিখন ফল নিশ্চিত করতে জোরদার করছে তখন দেখা যায়, শহরের শিক্ষার্থীদের তুলনায় গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখন সংকট বেশি। শিখন ফল নিশ্চিত হচ্ছে না শতভাগ। যার ফলে পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের শিক্ষার্থীরা। তারপর আবার আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে পাবলিক পরীক্ষা ভিত্তিক, এখানে শেখার চেয়ে পাবলিক পরীক্ষায় পাসই মুখ্য। তাই পারলিক পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্ন মাথায় রেখেই স্কুলে পড়াশোনা হয়ে থাকে বলে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের অভিযোগ শোনা যায়। আর এই ধরনের ‘টেইলর মেইড’ পড়াশোনার জন্য হাত বাড়ালেই নোট বই ও পা বাড়ালেই কোচিং সেন্টার তো আছেই। মাধ্যমিক স্তরের এই অবস্থা থেকে উত্তরণ ও এস ডি জি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। গ্রাম, হাওর-বাওড়, চর, চা বাগান, পাহাড় এবং শহরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমতা আনয়নের জন্য বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি সংস্থার সাথে কাজ করছে সরকার। এমনই একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে এডিবি এর সাথে যৌথ অর্থায়নে সেকেন্ডারী এডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ) নামে বিশদ কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে সরকার। সেসিপ প্রোগ্রামের আওতায় ২ নভেম্বর ২০১৭ সালে দেশের মেধাবী, তরুণ শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষক হিসেবে পেতে সেসিপ কর্তৃপক্ষ ‘রিসোর্স টিচার’ নামে ১০০০ জন অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। যাদের কাজ নির্ধারণ করা হয়েছিল-
(১) গ্রাম, হাওর-বাওড়, চর, পাহাড়ী অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজী বিষয়ে পাঠদান করা।
(২) প্রাইভেট, কোচিং বন্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা।
(৩) ঝরে পড়া শিক্ষাথীর সংখ্যা কমানো।
(৪) শিখন ফল নিশ্চিত করা।

২০১৮ সালের মার্চ মাসে নিয়োগ সম্পন্ন করে শিক্ষকদের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়ে পাঠদানের জন্য প্রেরণ করা হয়। এই থেকে ১০০০ জন রিসোর্স টিচার নামধারী শিক্ষক ঝাঁপিয়ে পড়েন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়রের জন্য সেসিপের তত্ত্বাবধানে নিরলস পরিশ্রম করে চলছে রিসোর্স টিচার। দায়িত্ব পালনের কিছুদিনের মধ্যেই দেশের সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘নায়েম’ -এ বিষয় ভিত্তিক (গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজী) প্রশিক্ষণের জন্য ডেকে আনা হয় রিসোর্স টিচারদের। প্রশিক্ষণে সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়ন ও শিক্ষকতার বিভিন্ন বিষয় প্রশিক্ষণ নিয়ে আবারো নতুন উদ্দীপনায় কাজ শুরু করেন। যার ফলে তথাকথিত ভীতিকর বিষয়গুলোতে (গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজী) শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য দেখতে পান। শিখন ফলের কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। মাধ্যমিক স্তর অনেকের জন্য প্রান্তিক শিক্ষা হয়ে থাকে। ফলে শিখন ফল নিশ্চিত করা সম্ভব হলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনে প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেকে সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, অর্থনীতিতে অবদান উপযোগী হয়ে গড়ে ওঠে। রিসোর্স টিচাররা শিক্ষর্থীদের সাথে একজন ফেসিলেটর হিসেবে পাঠদানে অভ্যস্থ হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীরা বিনা সংকোচনে নিজের মনের কাঙ্খিত প্রশ্ন শেয়ার করতে পারে রিসোর্স টিচারদের সাথে। ফলশ্রুতিতে “বন্ধুর (শিক্ষক) সাথে বন্ধুর পথ (শিক্ষাভীতি)” পাড়ি দেওয়ার আনন্দ পায়। অভিভাবকরা সন্তানের পড়ালেখার মনোযোগ দেখে আনন্দিত হচ্ছে। বিগত ২০১৮ সালের জেএসসি/জেডিসি থেকে ২০২০ সালের এসএসসি পর্যন্ত পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে রিসোর্স টিচার কর্মরত প্রতিষ্ঠানগুলো অভাবনীয় ফলাফল অর্জন করেছে। শিক্ষর্থীরা স্বত:স্ফূর্তভাবে শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। নোট বই ও কোচিং নির্ভরতার হার কমেছে। যদিও শতভাগ এখনো বন্টন হয়নি।


রিসোর্স টিচাররা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দেশের তথা বিশ্বের করোনা ক্রান্তিকালে অনলাইনে পাঠদান করে। ফেইসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত পাঠদানকৃত ক্লাস আপলোড করছে এবং সম্ভবপর স্ব স্ব শিক্ষার্থীদের সাথে জুম অ্যাপ বা সামাজিক মাধ্যমের গ্রুপ ভিডিও কলিং-এর মাধ্যমে পাঠদানের ফিডব্যাক ও শিখন ফল যাচাই কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এই রিসোর্স টিচাররা একটি সরকারী প্রোগ্রামের অধীনে “অস্থায়ী" ভিত্তিতে নিজেদের এমন এক স্বর্ণালী সময়ে এসে যোগদান করে দেশ সেবায় নিয়োজিত হয়েছেন যখন অনেকের বয়স ২৭-২৮ বছর গড়পড়তা ছিল। আজ অনেকের বয়স সরকারী চাকরির আবেদন করার সর্বোচ্চ সময়সীমা ৩০ বছর অতিক্রম করেছে।


সুতরাং, সময়ে সময়ে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত LSB (হাতে-কলমে বিজ্ঞান), ICT (বিষয় ভিত্তিক) দক্ষ শিক্ষকদের প্রোগ্রাম মেয়াদ শেষে চাকরিচ্যুত না করে রাজস্ব বা স্থায়ীকরণের মাধ্যমে একঝাঁক তরুণ মেধাবী শিক্ষকদের শিক্ষকতার মহান পেশায় নিয়োজিত থাকার যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং “মানবতার মা” খ্যাতি প্রাপ্ত বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছি।


“জন্ম যাহার সৃষ্টির জন্য তিনিই শিক্ষক” এই মহান বাক্য যেহেতু জীবনে স্বর্ণালী সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। সুতরাং, শিক্ষক হয়েই মরতে চাই। হাজারো শিক্ষার্থীর ভালবাসা, শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে সবুজ শ্যামল মাঠে শায়িত হওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা রাখছি মহাকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবর্ষতে।

লেখক: রিসোর্স টিচার (বিজ্ঞান), সেসিপ, চংড়াছড়ি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি।

এএইচ/জেইউ


oranjee