ঢাকা, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২০ | ২৪ আষাঢ় ১৪২৭

 
 
 
 

স্কুলশিক্ষক এখন দিনমজুর

গ্লোবালটিভিবিডি ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৪, ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

স্কুলশিক্ষক বিরাম চন্দ্র বিশ্বাস এখন দিনমজুরের কাজ করেন। সর্বগ্রাসী করোনা তাঁকে শ্রমিক বানিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কখনো কারো পুকুরে জাল টেনে দিচ্ছেন, কখনো কারো ক্ষেত-খামারে ৩০০ টাকা মজুরিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

দুই মেয়ে, এক ছেলে, মা ও স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর পরিবার। সবাইকে নিয়ে বেঁচে থাকার উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছেন এ পথ।

তবে এখানেও রয়েছে বিপত্তি। শিক্ষক হিসেবে মর্যাদার কারণে অনেকে ‘চক্ষুলজ্জায়’ তাঁকে কাজে নিতে দ্বিধাবোধ করেন। এ কারণে অনেক সময় তাঁর কাজও জোটে না।

যশোর সদর উপজেলার বলাডাঙ্গা গ্রামের বিএমএস নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক তিনি। বললেন, ‘ কী করবো? ছেলে মেয়েদের নিয়ে বেঁচে তো থাকতে হবে। আমরা করোনার আগে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেয়া বেতনের থেকে সামান্য কিছু টাকা পেতাম। পাশাপাশি কয়েকটি টিউশনি করে কোন রকমে পরিবার নিয়ে টিকে ছিলাম। করোনার পর থেকে স্কুল বন্ধ। টিউশনিও বন্ধ। এ কারণে আমাদের জীবন-যাপন অচল হয়ে পড়েছে। নন এমপিও স্কুলের শিক্ষক হওয়ায় সরকারি কোনো সহযোগিতাও পাই না। এমন অবস্থায় আমাদের বেঁচে থাকা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে অন্যের ক্ষেতে মজুরি খাটি। অন্যের পুকুরে মাছ চাষের কাজসহ মানুষ যখন যে কাজে ডাকে সেই কাজ করি। কিন্তু এখানেও সমস্যা আছে। শিক্ষকতা করি বিধায় আমাদেরকে অনেক লোকে কাজে নিতে চাননা। সব মিলিয়ে খুব খারাপ অবস্থায় আমাদের দিন কাটছে।’

শিক্ষক বিরাম চন্দ্র বিশ্বাসের বাড়ি যশোর সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের তোলা গোলদার পাড়া গ্রামে।

বিরাম চন্দ্রের মতই করুণ অবস্থা একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক গনেশ চন্দ্র সরকারের। তিনি জানালেন, সব শিক্ষকের প্রায় একই অবস্থা। গ্রামের স্কুল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে বেতন পান তা দিয়ে স্কুলের খরচ মিটিয়ে শিক্ষকদের হাতে তেমন কিছুই তিনি দিতে পারেন না। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের জীবন-যাপন খুব কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এমনকি তাঁর নিজেরও চলা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বললেন, ‘শহরে কয়েকটা বাড়ি যেয়ে টিউশনি করতাম। সেই টাকা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলতো। করোনার কারণে গত কয়েক মাস তাও বন্ধ। ধার-দেনা করে সংসার চালাচ্ছি। আম্ফান ঝড়ে আমার এক ঘর পড়ে গেছে সেটাও ঠিক করতে পারছিনা। এমনকি আমার একটি মাত্র মেয়ের ছোট খাট আবদারও পূরণ করতে পারছি না।’

শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, বর্তমান সময়ে টিকে থাকার চেষ্টায় বিরাম চন্দ্রের মতো এমন অবস্থা নন এমপিও স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসার অসংখ্য শিক্ষক-কর্মচারীর।

মর্যাদার কারণে তারা না পারছেন হাত পাততে, না পারছেন কাউকে কিছু বলতে। অনেকে অন্য এলাকায় গিয়ে বা পরিচয় গোপন করে নানা উপায়ে বিকল্প আয়ের চেষ্টা করছেন।

এ ব্যাপারে নন এমপিও স্কুল কলেজ ও মাদ্রাসা শিক্ষকদের সংগঠন নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মচারী ফেডারেশনের যশোর জেলা সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান জানান, যশোরের ৮ উপজেলায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা মিলিয়ে ২৪৭টি নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ১৮শ' ৩০ জনের মতো শিক্ষক এবং ৩শ' ৬১ জন মতো কর্মচারী রয়েছেন। নন এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় তাঁরা সরকার থেকে কোনো বেতন পান না। শিক্ষার্থীদের দেওয়া বেতন থেকে শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার চেষ্টা চলে যা খুবই সামান্য। পাশাপাশি তাঁরা টিউশনি করেই মূলত সংসার খরচ চালান।

এএইচ/জেইউ


oranjee