ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ ২০২১ |

 
 
 
 

ইউপি ভবনে অফিস খুলে কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছে প্রতারক

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:১১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৩, ২০২১

ছবি: সংগৃহীত

কাজী সাইফুল, কুষ্টিয়া: তিনি আসতেন-যেতেন হেলিকপ্টারে। ইউপি চেয়ারম্যানকে সাথে নিয়ে অংশ নিতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, দামি গাড়িতে ঘুরতেন এলাকায়। দিনে দুইজন ও রাতে দুইজন গ্রাম পুলিশের পাহারায় থাকতেন ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের বিট পুলিশিং কার্যালয়ে। অফিসও খুলেছিলেন ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষে, পরিষদ ভবনের ছাদে রাতে জমাতেন গান-বাজনার আসর।

মহামারি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে নামি-দামি বহিরাগত শিল্পী এনে জমকালো অনুষ্ঠান করে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছেন নামসর্বস্ব কানাডিয়ান সংস্থা সিসিআইসি'র কর্মকর্তারা।

জানা গেছে, বিদেশিদের অর্থায়নে বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামের দুঃস্থদের আধাপাকা টিনশেড ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। কিন্তু মাঝ পথে এসে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যের অধিক লাভজনক প্রকল্প পাইয়ে দেয়ার কথা বলে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে সিসিআইসি নামের ওই সংস্থার সিইও পরিচয়দানকারী রুবেল আহাম্মেদ (হেলিকপ্টার রুবেল) নামের এক প্রতারক। এর ফলে দুঃস্থদের পাকাঘর নির্মাণ প্রকল্প বন্ধ করে দিয়েছেন নির্মাণ কাজের দায়িত্ব পাওয়া সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউপি সদস্যরা। পাকা ঘর নির্মাণের আশায় নিজের পুরাতন ঘর ভেঙে বা অল্প টাকায় বিক্রি করে দিয়ে অনেকেই হয়েছেন বাসস্থানহারা। এই শীতের মধ্যে বাসস্থানহারা পরিবারের কেউ রয়েছেন প্রতিবেশীর ঘরের বারান্দায় আবার কেউ আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশীর রান্নাঘরে।

এমন প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলার বেতবাড়িয়া ইউনিয়নে। আর ওই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হলেন বাবুল আক্তার। তিনি খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি।

আর এই প্রতারক চক্রের মূল হোতা রুবেল আহাম্মেদ ওরফে হেলিকপ্টার রুবেল নামসর্বস্ব সিসিআইসি সংস্থার সিইও বলে দাবি করতেন। তার বাড়ি শরিয়তপুর জেলায়। প্রতারক রুবেলকে গত ১৭ জানুয়ারি রাতে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) ইকোনমিক অ্যান্ড হিউম্যান ট্রাফিকিং টিমের সদস্যরা ঢাকার উত্তরা এলাকা থেকে গ্রেফতার করে।

সরেজমিনে গিয়ে ভুক্তভোগী একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে জানা যায়, তিন মাস আগে রুবেল আহাম্মেদ কানাডিয়ান কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশল কো-অপারেশন (সিসিআইসি) নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর পরিচয় দিয়ে এক দালালের মাধ্যমে এলাকায় আসেন। 

বেতবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় রুবেল আহাম্মেদ বনগ্রাম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে হেলিকপ্টারে চড়ে প্রথমবার আসলে চাঁদট ইয়াকুব আহমেদ মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে আলোচনা সভা ও জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে পুলিশ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমাণ্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকাবাসী জানতে পারে যে, গ্রামকে শহর করার লক্ষ্যে দুঃস্থদের জন্য পাকা ঘর নির্মাণ, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, আধুনিক পার্ক, নদী ভাঙন রক্ষায় বাঁধ নির্মাণ, গভীর নলকূপ স্থাপন, জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের উন্নয়নে নানা রকম প্রকল্প নিয়ে এসেছে সিসিআইসি নামের কানাডিয়ান ওই সংস্থা।

এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রুবেল আহাম্মেদ বেতবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান বাবুল আখতারসহ পরিষদের ইউপি সদস্যদের সাথে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেন। এরপর হাতে নেয়া হয় বনগ্রামে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, রিসোর্ট, আবাসন ও জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের উন্নয়নে নানা রকম প্রকল্প। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্তদের উন্নয়নে ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে চাঁদট গ্রামে গড়াই নদীর ভাঙন রোধে ভাঙন কবলিত এলাকায় ইতিমধ্যে বালি ভর্তি কিছু জিও ব্যাগ ফেলাও হয়। বেতবাড়িয়া ইউনিয়নের ৭, ৮, ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১০০ অসহায়-দুস্থ পরিবারের জন্য গৃহনির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়।
এসব পরিবারের জন্য ১৫ ফুট লম্বা ও ১০ ফুট চওড়া দুই কক্ষের থাকার ঘর, এর সঙ্গে রান্না ঘর ও পাকা পায়খানা নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। এই পাকা ঘরের আশায় ৮০ থেকে ৯০টি অসহায় পরিবারের বসতঘর ভেঙে ফেলা হয়।

এদিকে, বেতবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, পরিষদের দ্বিতীয় তলায় বিট পুলিশিংয়ের সাইনবোর্ড লাগানো বাইরে থেকে তালা দেয়া কক্ষের প্রতিটি জানালায় উন্নতমানের পর্দা টাঙানো রয়েছে। কক্ষের ভেতরে তোষক-জাজিম, খাট সেট করা রয়েছে এবং কয়েকটি চেয়ারও রয়েছে ওই কক্ষে। পরিষদের ১ম তলায় একটি কক্ষে একই রকমভাবে প্রতিটি জানালায় উন্নতমানের পর্দা টাঙানো এবং উন্নতমানের টেবিল ও চেয়ার বসিয়ে অফিস কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়াও পরিষদের দ্বিতীয় তলার আরেকটি কক্ষও রাতে থাকার জন্য দখল করে রেখেছিলে ওই প্রতারকরা।

এ বিষয়ে বেতবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এম এস ব্রিকসের মালিক আব্দুল মজিদ বলেন, চেয়ারম্যান সাহেব একদিন আমাদের পরিষদে ডাকলেন। সেখানে সিসিআইসি'র সিইও রুবেল ছিলেন। আমাকে বললো, বিদেশী সংস্থার উদ্যোগে এলাকায় দুস্থদের জন্য চারশো ঘর নির্মাণ করা হবে ৩২ লাখ ইট ও সিমেন্ট লাগবে।

তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে দুই লাখ ইট ও ছয়শো বস্তা সিমেন্ট বাকীতে নিয়ে ঘরের কাজ শুরু করেছিলেন কিন্তু রুবেল চিটারী করে পালিয়েছেন। এখনও আমি ইট, সিমেন্টের টাকা পায়নি।

বেতবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব বলেন, প্রায় দুইমাস পরিষদের তিনটি কক্ষে তারা ছিলেন। দিনে দুইজন ও রাতে দুইজন গ্রাম পুলিশ সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকতেন। চেয়ারম্যান সাহেব একজন বুদ্ধিমান ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তি। তাই কিছু যাচাই-বাছাই করিনি, উপজেলা প্রশাসনকেও জানানো হয়নি। এ ব্যাপারটা আমার ভুল হয়েছে।

থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, আমরা কিছু জানি না, আমার কোনো পুলিশ এ কাজে জড়িত নয়। তাছাড়া যেখানে বাবুল আক্তার রয়েছে, সেখানে যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন বোধ করিনি। সে একজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আমরা সে কারণেই এ বিষয় নিয়ে তেমন ভাবিনি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেজবাহ উদ্দিন বলেন, বিদেশী কোনো প্রকল্পের কাজ হলে প্রথমে সরকারের সাথে চুক্তি হয়। পরে সরকার আমাদের কোনো নির্দেশনা দিলে আমরা নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করি কিন্তু এখানকার সিসিআইসি'র বিষয়ে কেউ আমাকে জানায়নি। আমি কিছু জানিও না। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ভালো বলতে পারবেন।

এ বিষয়ে খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বেতবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল আকতার বলেন, উন্নয়নের স্বার্থে প্রজেক্টটি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলাম কিন্তু প্রতারণার বিষয় বুঝতে পারিনি। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিলো।

এএইচ/জেইউ 


oranjee

আরও খবর :