ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০ |৯ মাঘ ১৪২৬

 
 
 
 

তৃতীয় পর্ব

রেলে চাকুরি দিয়ে অভিনব কায়দায় প্রতারণা

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৪১ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৯

আনিসুর রহমান : বাংলাদেশ রেলওয়েতে সরকারি চাকুরির আশায় লাখ লাখ টাকা দিয়ে নিজের সর্বস্ব হারিয়েছেন অনেকেই। এমন অভিযোগ আসে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে। তাদের কথায় এটা স্পষ্ট যে, দালাল যে টাকা নিয়ে তাদের রেলে চাকুরি দেয়নি সেটি কিন্তু নয়। তারা সবাই নিয়মিত রেলে চাকুরি করছেন। তাদের পোস্টিংও হয়েছে দেশের বিভিন্ন রেল ষ্টেশনে, পাবনা আউটসোর্সিং কোম্পানী প্রাইভেট লি. নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে। মাস শেষে দুয়েকজন আংশিক বেতন পেলেও, বেশিরভাগই এখনো বেতন পাননি। তাই অনেকটাই দুশ্চিন্তাই ও সংশয়ে পড়েছেন তারা। গ্লোবাল টিভি অনলাইনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ তৃতীয় পর্ব -

বাংলাদেশ রেলওয়েতে সরকারি চাকুরি দেওয়ার প্রতারকচক্রের মূল হোতার কাছে পৌঁছতে গ্লোবাল টিভির অনুসন্ধানী দলের এবার যাত্রা পাবনার ঈশ্বরদীতে। অনুসন্ধানী দলের কাছে খবর আসে, চক্রটির মূল ঘাঁটি পাবনা এলাকায় এবং তাদের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীও নাকি রয়েছে। অনুসন্ধানী দলের সঙ্গে এবার পুলিশ না থাকায় বেশ সতর্কতার সাথে কাজ করার পরিকল্পনা নেয় গ্লোবাল টিভির অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা। সেই সাথে মোবাইল ফোনে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখে রেলওয়ের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল-মামুনের সাথে। ঈশ্বরদী এলাকায় খাবার সময় পাবে না ভেবে, যাত্রা পথেই হালকা নাস্তা করে নেয় অনুসন্ধানী সদস্যরা।

বিকেল গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা, চারদিক গাড়ো অন্ধকারে আচ্ছন্ন, সেই সাথে বাইরে বইয়ে যাওয়া শীতের হিম শীতল বাতাস, এরই মধ্যেই ঘড়ির কাটায় সময় গড়িয়ে রাত তখন সোয়া দশটা। ঈশ্বরদী বাইপাসে ট্রেন পৌঁছতেই নেমে পড়ে গ্লোবাল টিভির অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা।

বাইপাস ষ্টেশন মাষ্টারের কক্ষে গিয়ে পরবর্তী ঢাকাগামী ট্রেন ছাড়ার খোঁজ নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পরে অনুসন্ধানী সদস্যরা। তথ্য রয়েছে, এই ট্রেন ধরেই কিনা প্রতারকচক্রের মূল হোতা ঢাকা হয়ে বেনাপোল দিয়ে বর্ডার ক্রস করবে।

তাই আর কোনদিকে না তাকিয়ে একটি অটো রিক্সা ধরে, গভীর অন্ধকারের মধ্য দিয়ে, জনশূন্য রাস্তা ধরে, গ্রামের শুনশান নিরবতা ভেঙ্গে ঈশ্বরদী রেল স্টেশনে পৌঁছায় অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা।

ঈশ্বরদী রেল ষ্টেশনে পৌঁছে প্রথমেই নজর আটকায় ফুলের টবের দিকে। ষ্টেশনের ফুটওভার ব্রীজসহ সর্বত্রই ফুল ও বিভিন্ন গাছ-গাছালির টবে সাজানো। আর প্রতিটি টবের গায়ে এমনভাবে বিআর মানে বাংলাদেশ রেল লিখার সাথে নাম্বার লিখা, যেটি দেখে মনে হবে যে, টবগুলোও সরকারি। সেখানে কোন দাতা সংস্থা বা কোম্পানির নাম লেখা নেই। তার মানে প্রতারকচক্রের কথা সত্যিই যে তারা রেল ষ্টেশনে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করেন। তাহলে এসব ফুলের টব পাহারাদার ও পরিচর্যাকারী কোথায়। সেই সাথে ট্রেন গোনা ও স্লিপার পরীক্ষা করার লাইনম্যানই বা কোথায়। চারদিকে একটু ভালো করে নজর দিতেই পাওয়া গেলো তাদের।

এদের কথায় বেশ বিস্মিত হলো অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা। তার মানে তাদের কথায়, এটা স্পষ্ট যে, তাদের চাকুরির জন্য কোন টাকা-পয়সায় দিতে হয়নি। আর তারা ফুলের টব পাহারাদার হিসেবে একেক জন তের হাজার টাকা করে বেতন পাবেন যদিওবা এখনো তারা কেউই বেতনের মুখই দেখেননি। এর মানে প্রতারক চক্র ঢাকায় অভিযানের খবর পেয়ে, বেশ ভালোভাবেই মগজ ধোলাই দিয়েছে তাদের। চাকুরি হারানোর ভয়ে, যেকারণে মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছেন তারা।

এবার কৌশলে এ দুজনকে সাথে নিয়ে গ্লোবাল টিভির অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা যেতে চায়, মূল প্রতারকের কাছে। ষ্টেশন থেকে অনেক দূর পায়ে হেঁটে যাওয়ার পর একটি তালাবদ্ধ কক্ষে তালা খুলে প্রবেশ করে অনুসন্ধানী সদস্যরা। সেখানে পাওয়া যায় তিনজনকে। তাদের মধ্যে একজন আবার নিজেকে গণমাধ্যমকর্মী ও পাওনাদার হিসেবে পরিচয় দেন। অনুসন্ধানী দল জানতে পারে মূলত তিনি প্রতারক চক্রের প্রধানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

বাকি দুজনের কাছ থেকে জানা গেলো, তারাও ভুক্তভোগী । তবে প্রতারক চক্রের মূল হোতার দেখা নেই এখানেও। এরইমধ্যে মূল হোতার মোবাইল নাম্বার আসে গ্লোবাল টিভির অনুসন্ধানী দলের হাতে। সেই নাম্বার রেলের ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুনের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়, মূল প্রতারকের লোকেশন সনাক্ত করতে। আর কৌশলে প্রতারকচক্রের আরেক সদস্যকে ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে প্রথমে থানা চিনতে অনুসন্ধানী দলের একটু বেগ পোহাতে হয় যে, এটি কোন নার্সারি না কোন থানা। কেননা থানাটি ফুল ও গাছ-গাছালির টব দিয়ে এমনভাবে ঘিরে রাখা হয়েছে যে, সাইবোর্ডে তাকানো ছাড়া দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এটি ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানা। পরে ঈশ্বরদী রেলওয়ে থানা পুলিশের সহযোগিতায় গ্লোবাল টিভি অনুসন্ধানী দলের জিম্মায় প্রতারকচক্রের সক্রিয় সদস্য শরীফ ও কয়েকজন ভুক্তভোগীকে নিয়ে ঢাকাগামী ট্রেনে ওঠে অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা। পথিমধ্যে প্রতারকচক্রের জাল থেকে পাবনার চাটমোহর স্টেশনে ডিউটি করা বেশকিছু ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে গ্লোবাল টিভি অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা।

এরই মধ্যে খবর আসে নাটোর থেকে রেল পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছে প্রতারকচক্রের মূল হোতা। ট্রেনে সব সিট বুক থাকায় প্রায় ৬ ঘন্টা নির্ঘুম দাঁড়িয়ে আসতে হয় সবাইকে। অবশেষে সকাল সোয়া সাতটায় প্রতারক চক্রের এক সদস্যসহ ২৫জন ভুক্তভোগী নিয়ে গ্লোবাল টিভি অনুসন্ধানী দলের সদস্যরা ঢাকার কমলাপুরে রেলওয়ে থানায় পৌঁছায়।

এরমধ্যেই নাটোর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া প্রতারকচক্রের মূল হোতাকে আনা হয় ঢাকা রেলওয়ে থানায়। জানা যায়, প্রতারকচক্রের মূল হোতাই নাকি জাকির কিবরিয়া।

মূলহোতাসহ প্রতারকচক্রের সকল সদস্য গ্রেফতারে সহযোগিতা করায় রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন গ্লোবাল টিভির কর্তৃপক্ষসহ অনুসন্ধানী দল ও বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশকে ধন্যবাদ জানান।

রেলে চাকুরী দেয়ার নামে এ প্রতারকচক্রের সাথে বাংলাদেশ রেলের কারো সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা সেবিষয়ে বিভাগীয় তদন্তেরও নির্দেশ দিয়েছেন রেলমন্ত্রী।

এআর/এমএস


oranjee