ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২০ | ৩০ আষাঢ় ১৪২৭

 
 
 
 

খুলনায় বাড়ছে করোনা রোগী, পিসিআর ল্যাবের রিপোর্ট দেরিতে আসায় বিভ্রান্তি

গ্লোবালটিভিবিডি ৭:১৭ অপরাহ্ণ, জুন ০৪, ২০২০

ফাইল ছবি

আনিছুর রহমান কবির, খুলনা : খুলনায় প্রতিদিন বাড়ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। এসকল রোগীর নমুনা পরীক্ষা করতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পিসিআর ল্যাব টেস্টে কর্মরত চিকিৎসকরা।

খুলনার আশপাশের জেলা সাতক্ষীরা, যশোর এবং কুষ্টিয়ায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ল্যাব চালু না হলে খুলনার ওপর চাপ কমবে না। এতে একদিকে যেমন পরীক্ষা করতে দেরি হচ্ছে। অন্যদিকে মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের পিসিআর মেশিনে একদিনে করোনা পরীক্ষার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ১৯২টি কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে খুলনাসহ আশপাশের জেলা থেকে নমুনা আসছে এর থেকে অনেক বেশি। ল্যাব সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক টেকনোলজিস্টদের দিন-রাত কঠোর পরিশ্রমের পরও সময়মত ফল না পাওয়ার কারণে বিনা চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় এই অঞ্চলে আরও একাধিক পিসিআর ল্যাব চালু না হলে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, খুলনা মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের পিসিআর মেশিনে একদিনে করোনা পরীক্ষার সর্বোচ্চ ক্ষমতা ১৯২টি। গত ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে গতকাল বুধবার পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ৭ হাজার ৩৩টি, দিনের হিসাবে প্রতিদিন ১২০টির বেশি। সম্প্রতি যশোর ও কুষ্টিয়ায় পরীক্ষা শুরু হলে খুলনার ল্যাবে নমুনা আসার পরিমাণ কিছুটা কম ছিল কিন্তু বর্তমানে নমুনা আসছে বেশি।

ল্যাব সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আগামী বুধবার পর্যন্ত এক হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হওয়ার অপেক্ষায় আছে, ল্যাবের সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে টেস্ট করলেও তা শেষ হতে অন্তত ৫ দিন লাগবে। এর মধ্যে যদি আরও বেশি নমুনা আসে তাহলে স্বাভাবিকভাবেই একজন রোগীর নমুনা নেওয়ার পর ৫ দিনের বেশি সময় লাগবে রিপোর্ট দিতে যার ফলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

খুমেক হাসপাতালের করোনা সাসপেকটেড আইসোলেশন সেন্টারে গত মঙ্গলবার তিনজনসহ এ পর্যন্ত ২৫ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আর করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের। এর মধ্যে শিশু ছিলো ৮ জন। কিন্তু দেখা যায়, মৃত্যুর পর মাত্র ২ জনের শরীরে করোনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, বাকি ২৭ জনের মৃত্যুর পর করোনা পরীক্ষায় কোন ভাইরাস পাওয়া যায়নি।

মৃত্যু হওয়া এসব ব্যক্তিদের স্বজনদের অভিযোগ, করোনা সাসপেকটেড হওয়ায় তাদের স্বজনদের কাছে চিকিৎসক বা নার্স কেউ ঠিকমত আসেননি। এছাড়া এসব মৃত মানুষের অনেকের আবার দাফনের আগে ঠিকমত গোসল ও জানাজাও হয়নি। ফুলতলা থানার ব্যবসায়ী নুরুজ্জামান (৬০) মৃত্যুর পর তার জানাজা ও গোসল দিতে পারেননি তার পরিবার। কিন্তু মৃত্যুর ২ দিন পর পাওয়া রিপোর্টে তার করোনা পাওয়া যায়নি। করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার রাতে মৃত্যু হওয়া ফারুক হোসেনের রিপোর্ট পাওয়া গেছে বুধবার বিকেলে। এর মধ্যে সামাজিক দূরত্ব মেনে তার দাফন হয়েছে।

তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ সাধারণ রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। খুমেক ফ্লু কর্ণারে এসে নড়াইলের কালিয়া এলাকার বাসিন্দা নাজমা বেগম (৩২) ভর্তি হয়েছিলেন গত ২৮ এপ্রিল। সেখানে করোনা পরীক্ষায় তার ফলাফল নিয়ে চিকিৎসা নিতে ওয়ার্ডে গেছেন গত বুধবার রাতে। সঠিক চিকিৎসা ছাড়া একজন রোগীকে ৫ দিন অপেক্ষা করার অর্থ হচ্ছে তাকে জেনে শুনে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি একজন রোগীকে নমুনা পরীক্ষার ফলাফল পেতে যদি ৫ দিন বা তারও বেশি সময় লাগে তবে বিনা চিকিৎসায় বা সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে রোগীর মৃত্যু শঙ্কা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, খুমেকের পিসিআর ল্যাবে বিভাগীয় প্রধান ডা. শাহনাজ পারভীন ও সহকারী অধ্যাপক ডা. তুষারসহ ল্যাব সংশ্লিষ্ট সকলের কঠোর পরিশ্রমের পরেও পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে নিয়মিত রোগীদের বাইরে সুস্থ হয়ে যাওয়া করোনা আক্রান্ত রোগীদের দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের পরীক্ষায় এতো সময় লাগলে আবারও তারা আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কাও রয়েছে।

খুলনা মেডিকেল কলেজের সিনিয়র চিকিৎসকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখনই খুলনার বাইরে বিশেষ করে যশোর ও কুষ্টিয়ার পাশাপাশি সাতক্ষীরায় ল্যাব স্থাপন করা জরুরি। ফলে সংশ্লিষ্ট এ জেলাগুলোতে যদি নমুনা পরীক্ষা করতে পারে তাহলে খুলনার উপর চাপ কমবে।

এছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি ডা. গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও পিসিআর মেশিন থাকায় তাদের মাধ্যমে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের মাধ্যমে পরীক্ষা চালুর কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

খুলনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. এসএম তুষার আলম বলেন, খুলনার বাইরে সঠিক ও নির্ভুল পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সম্ভব হলে জেলায় জেলায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। না হলে অন্তত সাতক্ষীরা, যশোর ও কুষ্টিয়ায় নমুনা পরীক্ষায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে ল্যাব চালু হলে খুলনার উপর চাপ কমবে। অন্যথায় বর্তমানে যে পরিস্থিতিতে নমুনা পরীক্ষা চলছে তাতে কমপক্ষে ৫ দিনের বেশি সময় লাগবে একজনের রিপোর্ট পেতে।

এমএস/জেইউ


oranjee