ঢাকা, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২০ | ২০ আষাঢ় ১৪২৭

 
 
 
 

কুষ্টিয়ায় প্রান্তিক কৃষকের ফসল ক্রয় ও অসচ্ছল মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ সেনাবাহিনীর

গ্লোবালটিভিবিডি ৩:৫২ অপরাহ্ণ, মে ০৯, ২০২০

ছবি: সংগৃহীত

কাজী সাইফুল, কুষ্টিয়া : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যশোর সেনানিবাস'র ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কর্তৃক করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় জনগণকে করোনা পরিস্থিতিতে করণীয় এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় কুষ্টিয়া জেলার প্রতিটি উপজেলাতে প্রতিদিন করোনা সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি প্রান্তিক অসহায় কর্মহীন পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ এবং প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে নায্য মূল্যে শাক-সবজি ক্রয় কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে।

দেশে করোনাভাইরাসের এই ক্রান্তিকালে ও দেশের চলমান লকডাউনের কারণে যেসব প্রান্তিক অসচ্ছল মানুষ আয় রোজগার করতে পারছেন না, তাদের সাহায্যের জন্য সেনাবাহিনী প্রধানের অনুপ্রেরণায় যশোর সেনানিবাস থেকে সকল পদবীর সেনা সদস্যদের নিজস্ব রেশন থেকে এই ত্রাণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং বিগত ১ মাস যাবৎ ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যশোর সেনানিবাস'র ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট চেষ্টা করছে যারা প্রকৃতভাবেই বর্তমান পরিস্থিতিতে অসহায় তাদেরকে চিহ্নিত করে প্রতিটি পরিবারের জন্য ১ সপ্তাহের নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করা।

প্রতিদিন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যশোর সেনানিবাস'র ইউনিট ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কর্তৃক ১৫০টি প্রান্তিক পরিবারের মাঝে নিয়মিত ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করে হচ্ছে।

এইভাবে শুধুমাত্র কুষ্টিয়া জেলার বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় নিয়োজিত ইউনিট ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট-এর মাধ্যমে কুষ্টিয়া জেলার প্রতিটি উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে বিভিন্ন সংখ্যায় পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে গত ১ মাস ধরে।

এছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যশোর সেনানিবাস'র ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কর্তৃক প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে নায্য মূল্যে নিয়মিত সবজি ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

করোনাভাইরাস চলাকালীন সময়ে দেশের চালিকাশক্তি কৃষক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক-নির্দেশনায় এবং সেনাবাহিনী প্রধানের নির্দেশে ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং এর আদেশে ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকদের কাছ থেকে শাক সবজি ক্রয় করছে যা নিজেদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে।

লকডাউন চলার কারণে দেশের যোগাযোগ অবস্থা অচল হয়ে পড়ায় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল দূরের হাট বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে যেতে বা পাঠাতে পারছেন না। এর ফলশ্রুতিতে ফসলের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না তাঁরা। তাই কৃষকের সুবিধার কথা চিন্তা করে প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকের ক্ষেত থেকে ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়মিত ফসল সংগ্রহ করছে।

কুষ্টিয়া জেলার বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় নিয়োজিত ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ৩ দফায় কুষ্টিয়ার ৬টি উপজেলার বিভিন্ন কৃষকের কাছ থেকে সবজি ক্রয় করেছে এবং এই উদ্যোগ করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে যাতে করে কৃষকেরা এর মাধ্যমে উপকৃত হন।

কুষ্টিয়া মিউনিসিপ্যালিটি বাজার থেকে পাইকারি সবজি ক্রেতা সুবজ শেখ বলেন, সবজি বাজার প্রতিদিন এক থাকে না। এছাড়া চাহিদা ও সরবরাহের ওপর সবজির দাম বাড়া-কমা নির্ভর করে।

কুষ্টিয়া কৃষি বিভাগ সূত্র থেকে জানা যায়, করোনার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। জেলায় ১৩ হাজার কৃষকের প্রত্যেককে এক বিঘা জমিতে ফসল উৎপাদনের সমপরিমাণ বীজ ও সার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে ৩০ হাজার কেজি আউশ ধানের বীজ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।

কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক শ্যামল কুমার বিশ্বাস বলেন, যেকোন মহামারির পর খাদ্য সংকট দেখা দেবে এটা স্বাভাবিক। তবে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। এদিকে চাষীদের লোকসান কিছুটা লাঘব করতে এগিয়ে এসেছে সেনাবাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যশোর সেনানিবাসের ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমন্টের সেনা সদস্যরা জেলার বিভিন্ন এলাকার প্রান্তিক সবজি চাষিদের জমিতে থাকা সবজি বাজার মূল্যে কিনে নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অস্বচ্ছল পরিবারের মাঝে তা বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছেন। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। এতে করে সবজি চাষিরা উপকৃত হবে।

কুষ্টিয়ার জেলার মিরপুর উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামের সবজি চাষি হাজী শুর আলী বলেন, ঠিকমত মূল্য না পাওয়া এবং পরিবহন সমস্যার কারণে আমাদের অনেক সবজি জমিতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। সেনাবাহিনী ক্ষেতে এসে ন্যায্য মূল্যে সবজি কিনে নেওয়াতে নগদ টাকা হাতে পেয়েছি।

একই গ্রামের সবজি চাষি জিয়ারত আলী বলেন, আমার জমিতে আবাদকৃত মিষ্টি কুমড়া বিক্রি করতে না পারায় দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এখন সেনাবাহিনী নগদ টাকায় মিষ্টি কুমড়া কিনে নেওয়ায় আমি খুবই উপকৃত হলাম। সেনাবাহিনীর এই কার্যক্রম দেশের এমন পরিস্থিতে সামনের দিনেও চালু থাকলে কৃষকরা দারুণভাবে উপকৃত হবে।

সেনবাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে ত্রাণ পাওয়া কুষ্টিয়ার জেলার মিরপুর উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামের এক অসচ্ছল কর্মহীন ব্যক্তি বলেন, আমি আজ ২মাস কর্মহীন হয়ে পড়েছি। পরিবার নিয়ে অনাহার অর্ধাহারে খুবই অসহায় জীবন যাপন করছি। সেনাবাহিনীর এই ত্রাণ পাওয়ায় অন্তত ৭/৮ দিন ভালোভাবে পরিবার নিয়ে তিন বেলা খেতে পারবো। এমন উদ্যোগের জন্য সেনাবাহিনীর সকল সদস্যদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। আমাদের মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

এই কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ২০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট'র সেনা কর্মকর্তা মেজর জুভেন ওয়াহিদ বলেন, করোনার কারণে বাজারে চাষীরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে যেতে পারছেন না। তাছাড়া বাজারে ক্রেতা কম থাকায় সবজির উপযুক্ত দামও পাচ্ছেন না। মাঠেই সবজি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এ অবস্থায় সেনা প্রধানের নির্দেশনায় জেলার প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে ন্যায্য মূল্যে শাক-সবজি ক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এই সবজি ক্রয় করে যশোর সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে সেনা সদস্যেদের জন্য ব্যবহার এবং বিভিন্ন স্থানে অস্বচ্ছল মানুষদের মাঝে তা বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এছাড়াও এই সবজির সাথে আমরা আমাদের প্রাপ্ত রেশন থেকেও অস্বচ্ছল কর্মহীন মানুষদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য ১ সপ্তাহের বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বিতরণ করছি। আমাদের এই কার্যক্রম চলমান করোনা পরিস্থিতিতে অব্যাহত থাকবে।

এমএস/জেইউ


oranjee