ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১ আশ্বিন ১৪২৬

 
 
 
 

অস্তিত্ব সংকটে হবিগঞ্জের খোয়াই নদী

গ্লোবালটিভিবিডি ৮:১৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০১৮

খোয়াই নদীর জায়গা দখল করে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে স্থাপনা, ভবন

ফয়সল চৌধুরী, হবিগঞ্জ: হবিগঞ্জ শহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা খোয়াই নদীটি এখন মরা খোয়াই নামে পরিচিতি লাভ করছে। ভূমিদুস্যদের দখল ও দূষণের কবলে খোয়াই নদীটি এখন অস্তিত্ব সংকটে। যেভাবে দখল উৎসব চলছে আগামী দুই-তিন বছরে তার অস্তিত্ব খোঁজে পাওয়া দুস্কর হবে। দখল আর দূষণ থেকে মুক্ত করতে নেই প্রশাসনের কোন উদ্যোগও।

নদী দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে

শহরের বুক চিড়ে বয়ে চলা খোয়াই নদীর জায়গা দখল করে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে স্থাপনা, কমছে নদীর প্রশস্ততা আর পানি প্রবাহ। প্রতি মুহূর্তে নদীতে ফেলা হচ্ছে দূষণকারী ভয়ঙ্কর সব বর্জ্য। সব মিলিয়ে হবিগঞ্জের মানুষের জন্য ব্যাপক দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ নদী।

বর্তমানে পুরাতন খোয়াই নদী হবিগঞ্জ শহরের সর্ববৃহৎ ডাস্টবিনে রূপ নিয়েছে। এই ময়লা-আবর্জনা ফেলার মধ্য দিয়ে দখল প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানির প্রধান আধার পুরাতন খোয়াই দখল হয়ে ভরাট যাওয়ায় শহরে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। যা এখন হবিগঞ্জ শহরের প্রধান সমস্যা।

জানা যায়, ভারতের আসামে প্রদেশে খোয়াই নদী উৎপত্তি হয়ে হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট, শায়েস্তাগঞ্জ, হবিগঞ্জ শহর, লাখাই উপজেলা হয়ে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। ১৯৭৮-৭৯ সালে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে খোয়াই নদীকে শহর থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার বাইরে নেওয়া হয়। এরপর থেকে পুরনো খোয়াইয়ের দুই পাড়ে দৃষ্টি পড়ে ভূমিদস্যুদের।

খোয়াই নদী দখল করে অট্টালিকা তৈরি করছেন শহরের প্রভাবশালীরা। অবৈধ দখলদারদের তালিকায় রয়েছেন রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসব, সরকারি কর্মকর্তা, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিক। জেলা আইন শৃংখলা সভায় অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে করার বিষয় নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয় কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। ব্যাপক তোড়জোড় নিয়ে প্রশাসন মাঠেও নামে কিন্তু অদৃশ্য সুতোর টানে তা কিছুদিন পড়েই স্তিমিত হয়ে পড়ে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শহরের মাছুলিয়া থেকে হরিপুর পর্যন্ত পুরাতন খোয়াই নদীর দৈর্ঘ্য ৪ কিলোমিটার। আর অবৈধ দখলদারের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক। দখলদারের অবৈধ দখল করা জমির পরিমাণ প্রায় ২একর। এই খোয়াই নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে পুরাতন খোয়াই নদী রক্ষা কমিটির নামে একটি কমিটি গঠন করা হয় ২০১২ সালে। সেই সঙ্গে এই নদীকে রক্ষার্থে আন্দোলন করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপাসহ কয়েকটি সামাজিক সংগঠন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে কিছুদিন পর তাদের আন্দোলন বন্ধ হয়ে যায়।

বাপার হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, পুরাতন খোয়াই নদী রক্ষা কমিটির উদ্যোগে ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে পুরাতন খোয়াই নদী দখলমুক্ত সীমানা চিহ্নিতকরণ ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণের দাবিতে এক বিশাল গণসমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও নদী দখলমুক্ত রাখতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে বাপা। আন্দোলনে যোগ দেন সুলতানা কামাল, সৈয়দা রেজওয়ানা, শওকত জামিলসহ অনেকই। তারপরও খোয়াই নদী দখলমুক্ত করা যায়নি।

ভরাট হয়ে যাচ্ছে খোয়াই নদী

এরপর ২০১৪ সালে মে মাসে দখল হওয়া খোয়াই নদী পুনরুদ্ধারে আটঘাট বেঁধে মাঠে নামে জেলা প্রশাসন। জনমনে প্রত্যাশা জাগে এবার নদী দখলমুক্ত হবে কিন্তু কিছুদিন চেইন-ফিতা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যায়। প্রশাসনের উদ্যোগে একটা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির মাধ্যমে পরবর্তীকালে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতাল স্টাফ কোয়ার্টার পর্যন্ত পুরাতন খোয়াই নদীর সীমানা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে এই জলাধার সংরক্ষণ প্রকল্পের এস্টিমেট পাঠানো হয়। যা এখনো ফাইল বন্দী রয়েছে।

এছাড়া পুরাতন খোয়াই নদীর বাকি অংশ সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় সরকার, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও পৌরসভার সমন্বয়ে কাজ করার কথা থাকলেও জেলা পরিষদের সামনে ও শহরের মাহমুদাবাদের পশ্চিম ও শায়েস্তানগর এলাকার পূর্ব দিক, মুসলিম কোয়ার্টার- নিউ মুসলিম কোয়ার্টার, সিনেমা হল, উত্তর শ্যামলী এলাকায় পুরাতন খোয়াই নদীতে দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ফেলে দখল করে বাড়ি নির্মাণ করছে একটি মহল। আর প্রতিদিন শহরের নানা আবর্জনা তো পড়ছেই নদীতে। ময়লার গন্ধে ভারি হয়ে উঠেছে পরিবেশ, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে নদীর পানি। ফলে শহরবাসী মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন।

বিভিন্ন স্থানে নদীর গতিপথ সরুহয়ে তলদেশ উঁচু হয়ে গেছে। ফলে সার্বিক পরিবেশ শুধু বিপন্নই হয়নি, জেলা শহর মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং অসচেতনতার জন্য নদী নির্ভর জীবনযাত্রাকেও বিপন্ন করছে। কোথাও কোথাও শহর থেকে ৮/১০ ফুট উঁচুতে উঠে গেছে নদীর তলদেশ। এসব স্থানে নদীর অস্তিত্ব ছিল বলে দেখলে মনে হয় না।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ সাহিদুল আলম জানান, শহর রক্ষার জন্য ৭০-এর দশকের শেষে মাছুলিয়া-রামপুর ও খোয়াই মুখ-গরুর বাজার পর্যন্ত দুই দফায় ৫ কিলোমিটার লুপ কাটিংয়ের মাধ্যমে খোয়াই নদীর গতি পরিবর্তন করে শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত করে দেওয়া হয়। ফলে শহরের মাঝ অংশ দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা খোয়াই হয়ে যায় পুরনো খোয়াই নদী। নদীর এই ৫ কিলোমিটার অংশ লুপ কাটিং করার আগে নদীর প্রস্থ ছিল স্থান ভেদে ২৫০ থেকে ৩০০ ফুট এবং গভীরতা ছিল ২৫ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত। নদী শাসনের পর দীর্ঘ এ সময়ের মধ্যে পুরাতন খোয়াই নদীর অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদ জানান, আমি এখানে যোগদানের পরই খোয়াই নদী দখলের বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। খোয়াই নদী রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে পুরাতন খোয়াই নদী উদ্ধার করতে শুধু প্রশাসন নয়, হবিগঞ্জের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে পুরাতন খোয়াই নদী শহরের সর্ববৃহৎ ডাস্টবিনে রূপ নিয়েছে। নদীর আশপাশের বাসাবাড়ির পয়ঃনিষ্কাশন, ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে নদীতে।

 

 

এফসি/এমএস


oranjee

আরও খবর :