ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

বদলে যাচ্ছে চুয়াডাঙ্গার দোয়ারপাড়া গ্রাম

গ্লোবালটিভিবিডি ৫:০৭ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৯

ছবি সংগৃহীত

 

রকিব হোসেন, চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দোয়ারপাড়া গ্রামের পরিবেশ বেশ মনোরম। গ্রামের মাঝখান দিয়ে যে রাস্তাটি চলে গেছে তা বেশ সুন্দর। মসৃণ পথ। দুপাশে চাষাবাদের ক্ষেত কিংবা বড় পুকুর-লেক। কোথাও কোথাও ঘরবাড়ি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছিলেন, গ্রাম হবে শহর। তা হবে ২০৪১ সালের মধ্যে। সেই ঘোষণার বাস্তবায়ন ঘটানোর উদ্দেশ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ওয়াশীমুল বারী সদর উপজেলার দোয়ারপাড়া গ্রামটিকে বেছে নেন। দোয়ারপাড়া গ্রামটি আর গ্রাম থাকবে না। দোয়ারপাড়া হয়ে যাবে পুরোপুরি শহর। ইতিমধ্যেই কাজ শুরু হয়েছে। অনেকটাই বদলে গেছে দোয়ারপাড়া। এখন যে কেউ দোয়ারপাড়া গ্রাম দেখে স্বীকার করবেন, গ্রাম থেকে শহর হচ্ছে দোয়ারপাড়া।

‘গ্রাম হবে শহর’ এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ভিলেজ-২০৪১। দোয়ারপাড়া গ্রামটিকে শহর হিসেবে দেখার জন্য ২০৪১ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার হবে না। আগামি এক বছরের মধ্যে গ্রামটিকে শহর হিসেবে ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ওয়াশীমুল বারী।

শুরু হলো কাজ: দোয়ারপাড়া গ্রামকে শহর করার কাজ শুরু হয় চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল। খুলনা বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া দোয়ারপাড়া গ্রামকে রুপান্তর কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
দোয়ারপাড়া গ্রামটি সদর উপজেলার শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের অন্তর্গত। চুয়াডাঙ্গা শহর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে হলেও দোয়ারপাড়া গ্রামে শহরের কোনো ছোঁয়া ছিল না। চুয়াডাঙ্গার সাবেক জেলা প্রশাসক গোপাল চন্দ্র দাসকে সাথে নিয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ওয়াশীমুল বারী গ্রাম ঘুরে দেখলেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এই গ্রামটিকেই শহর করা হবে। দোয়ারপাড়া গ্রামকে শহর করতে হলে আগে গ্রামের পুরো তথ্য-উপাত্থ নিতে হবে। শংকরচন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মোঃ ফয়জুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হলো গ্রামের তথ্য সংগ্রহের। সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী গ্রামে পরিবারের সংখ্যা ১২০। পাকা বাড়ি ৯০টি, কাচা বাড়ি ৩০টি, সরকারি চাকরিজীবী মাত্র চার জন, গ্রামে আছে একটি সরকারি বিল, একটি করে আছে মসজিদ, কবরস্থান, ঈদগাহ, ক্লাব। মাত্র চারটি দোকান আছে গ্রামে। গ্রামের মাত্র চারজন থাকে দেশের বাইরে, অন্য দেশে। তার মধ্যে দুজন পুরুষ, দুজন মহিলা। গ্রামে কৃষক আছে ৯৪ জন। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ১৩৮ জন শিক্ষার্থী আছে গ্রামে। এছাড়াও আরো অনেক তথ্য সংগ্রহ হলো।

আয়তনে গ্রামটি বেশ ছোট। মাত্র আধা কিলোমিটার দৈর্ঘ্য গ্রামের। প্রস্থ ৮০০ গজ।
তথ্য অনুযায়ী গ্রামের প্রাকৃতিক পরিবেশ ছাড়া গ্রামে দর্শনীয় অন্য কিছু নেই। গ্রামে নিরাপদ পানি সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা নেই। মাত্র আধাকিলোমিটার পাকা রাস্তা। এছাড়া নাগরিক আরো অনেক সুযোগ-সুবিধা নেই গ্রামে। এই গ্রামকে শহর করতে হলে নাগরিক সব সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই চিন্তা-ভাবনা থেকে শুরু হয়েছে কাজ।

বদলে ফেলা হচ্ছে যা কিছু: গ্রামে কাঁচা রাস্তা ৬০০ ফুট। ইটের রাস্তা আছে ৪০০ ফুট। ইট কিংবা কাঁচা কোনো রাস্তা গ্রামে থাকবে না। সব রাস্তা পাকা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে। পাঁচ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি পানির ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রামের সব বাড়িতে পৌছে দেওয়া হবে নিরাপদ পানি, কাজ চলছে।

সরকারি বিলটি অন্য গ্রামের সাধারণ বিলের মতোই। তাকে দৃষ্টিনন্দন করা হচ্ছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করার উপযোগী করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই বিলের মাঝখানে উড়াল পথ নির্মাণ করা হয়েছে। মাঝখানে আছে বসার স্থান। দর্শনার্থীরা গ্রামে গিয়ে বিলের মাঝখানে বসে চারদিকের মনোরম দৃশ্যাবলি দেখতে পারবেন। সেই সুযোগ এখনই তৈরি হয়েছে। একটি বড় পাঠাগার তৈরির জন্যও স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।

গ্রামের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার জন্য পায়ে হেঁটে কিংবা ভ্যানে চড়ে চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়ক পর্যন্ত যেতে হতো। দূরত্ব এক কিলোমিটার। ওখান থেকে বাস কিংবা অন্য কোনো যানবাহনে চড়ে যেতে হতো চুয়াডাঙ্গায় কিংবা নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের গত গত ২০ আগস্ট ২৫ শিক্ষার্থীকে বাইসাইকেল দেওয়া হয়েছে। তারা এখন বাইসাইকেলে চড়ে যেতে পারে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

গ্রামে স্মার্ট ফোন ছিল হাতে গোনা কয়েকটি। এখন তা বাড়ছে। কারণ, গ্রামে বসানো হয়েছে ওয়াইফাই সংযোগ। আপাতত ৮০০ গজের মধ্যে থাকলে যে কেউ পাবেন ফ্রি ইন্টারনেট সংযোগ। আগে রাতের গ্রাম ছিল অন্ধকার। এখন পুরো গ্রাম আলো-ঝলমল। গ্রামে বসানো হয়েছে ১৬টি সৌরবিদ্যুতের পোল। সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের আলোয় এখন আলোকিত থাকে পুরো গ্রাম।

গ্রামে আছে ১০টি জলাশয়। সবগুলো দৃষ্টিনন্দন করার পরিকল্পনা আছে। পর্যটকরা এসে জলাশয়গুলো ঘুরে দেখে আনন্দ পাবেন, সে ব্যবস্থা করা হবে।

গত ২০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এসডিজি বিষয়ক) মো. মোকাম্মেল হোসেন এসেছিলেন দোয়ারপাড়া গ্রামে। তিনি গ্রামের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখে অভিভূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সীমিত সম্পদের ব্যবহারে গ্রামের এমন পরিবর্তন না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। গ্রামের বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসন গ্রামের যে পরিবর্তন করেছে তা অভাবনীয়। ‘গ্রাম হবে শহর’ বাস্তবায়নে চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ সফল হলে চুয়াডাঙ্গার দোয়ারপাড়া গ্রাম হবে বাংলাদেশের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।


গ্রামবাসিদের অনুভুতি: গ্রামে গিয়ে অনেকের সাথে কথা বলে বোঝা গেল, পুরো গ্রামবাসি খুশি। না চাইতেই সবকিছু পেয়ে যাচ্ছেন তারা। গ্রামের মন্ডল-মাতব্বরদের একজন ইউছুপ মন্ডল। তিনি বললেন, আমরা খুবই খুশি। সন্ধ্যা লাগলে গ্রামকে আর গ্রাম বলে মনে হয় না। মনে হয় শহর হয়ে গেছে। গ্রামে অনেক কিছু হচ্ছে, আমরা সৌভাগ্যবান।

গ্রামের দরিদ্র কৃষক নিজাম উদ্দিন। নিজেই ক্ষেতে খামারে কাজ করেন। তিনি জানান, তার মেয়ে ডিঙ্গেদহ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী। আগে পায়ে হেটে তাকে স্কুলে যেতে হতো। তাকে একটি সাইকেল দেওয়া হয়েছে। আমার মেয়ে এখন সাইকেলে চড়ে স্কুলে যায়।

শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ডের সদস্য শওকত আলী বলেন, দোয়ারপাড়া গ্রামটিকে শহর করা হবে ঘোষণার পর থেকে আমরা প্রতিদিন গ্রামে গিয়ে গ্রামবাসিদের মোটিভেশন করছি। গ্রামবাসিদের কাছ থেকেও ভাল সাড়া মিলছে। গ্রামবাসির সহযোগিতা নিয়েই আমরা দোয়ারপাড়া গ্রামকে প্রতিদিন বদলে দিচ্ছি। গ্রামটি শহর হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় আসবেই দোয়ারপাড়া দেখতে ঢাকা থেকেও মানুষ আসবেন চুয়াডাঙ্গায়।

শংকরচন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আব্দুর রহমান বলেন, একটা ভাল উদ্যোগ নিয়ে আমরা সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। আমরা সবাই মিলে গ্রামটিকে আধুনিক শহর করে ফেলবো।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ ওয়াশীমুল বারী বলেন, শংকরচন্দ্র ইউনিয়ন পরিষদ এবং সদর উপজেলা পরিষদের উন্নয়ন তহবিল থেকে গ্রামটিকে শহর করার জন্য উন্নয়ন কাজ চলছে। সরকারি সব অফিসের উন্নয়ন সুযোগ সুবিধা এই গ্রামে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। পুরো গ্রামে থাকবে পর্যটকদের আকর্ষণ করার বিষয়। এখন গ্রামে যা কিছু আছে তাকে ঘিরেই পরিকল্পিতভাবে আকর্ষণীয় করা হচ্ছে। যাতায়াত, নিরাপদ পানি, চিকিৎসা, খেলার মাঠ করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত চলছে উন্নয়নকাজ।

চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোঃ নজরুল ইসলাম সরকার বলেন, অতি সম্প্রতি দোয়ারপাড়া গ্রামে নতুন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাঠাগার হবে। জায়গা নির্ধারণ হয়েছে। ওই গ্রামের উন্নয়নকাজ অব্যাহত থাকবে। যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব দোয়ারপাড়া গ্রামকে শহরে রূপান্তরিত করা হবে।

এএইচ


oranjee