ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

চুয়াডাঙ্গা থেকে প্রতিদিন ৭৫ লাখ টাকার চুল যাচ্ছে চীন দেশে

গ্লোবালটিভিবিডি ১০:২২ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ০৭, ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : নারীরা মাথা আচড়ানোর পর চিরুনিতে যে চুল আটকে যেতো তা ফেলে দেওয়া হতো। এখন তা যত্ম করে রেখে দেওয়া হয়। হকাররা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওই চুল কিনে নিচ্ছেন। প্রক্রিয়াজাতকরণের পর ওই চুল চলে যাচ্ছে চীন দেশে। নারীরা আগে যে চুল ফেলে দিতেন তা এখন হয়ে উঠেছে দামি পণ্য। এখন চুয়াডাঙ্গা জেলা থেকে প্রতিদিন ৭০-৭৫ লাখ টাকার চুল যাচ্ছে চীন দেশে। ঢাকার উত্তরায় গড়ে উঠেছে চুলের মোকাম।

চুল বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে ভাগ্য ফিরিয়েছেন অনেকেই। নারীরা নিজের ঘরে বসে কিংবা প্রতিবেশি কারো বাড়িতে বসে চুলের গুটি ছাড়িয়ে প্রতিদিন আয় করছেন ১০০/২০০ টাকা। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে তারা বাড়তি এ আয় করছেন। অনেক বেকার যুবকও নিজেদের জড়িয়েছেন চুল বাণিজ্যের সাথে। তাদের অনেকেই হয়েছেন স্বাবলম্বী।

চুল ব্যবসার সাথে সম্পৃক্তদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার সীমান্তবর্তি এলাকা কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রাম থেকে নারীদের ফেলে দেওয়া মাথার চুল সংগ্রহের কাজে জড়িয়ে পড়লেন এলাকার কিছু যুবক। তারা ওই চুল পাচার করতেন ভারতে। প্রশ্ন দেখা দিল, ফেলে দেওয়া এই চুল ভারতে কি কাজে লাগে?

একসময় জানা গেল, ফেলে দেওয়া নারীদের মাথার চুল ভারত থেকে চলে যাচ্ছে চীন দেশে। ২০০৯ সালে চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে প্রকাশ্যে শুরু হয় নারীদের মাথার ফেলে দেওয়া চুল কেনা-বেচা। চুল আর ভারতে পাচার হবে না। চুল থাকবে নিজের দেশে। বিক্রি হবে ঢাকায়। ততদিনে ঢাকার উত্তরায় চীন দেশের ক্রেতারা আসা শুরু করেছেন। তারা ভারতের মতো বাংলাদেশে এসেও চুল কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

সেই থেকে শুরু। তখন থেকে চুল কিনে ক্রেতারা তা নিয়ে যেতেন ঢাকায়। চীন দেশের ক্রেতাদের কাছে তা বিক্রি করা হতো। শুরুর দিকে ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা। আইন শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী ‘ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা’ কিংবা ‘ভারতে পাচারের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা’ সন্দেহ করে চুল আটক করতো। ওইসময় চুয়াডাঙ্গা থেকে চুল ঢাকায় নেওয়ার পথেও অনেক ব্যবসায়ীকে বিপদে পড়তে হয়েছে। চুল বহনের কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকায়, বৈধ পণ্য হওয়ার পরও অনেকে গোপনে তা নিয়ে যেতেন ঢাকায়। ২০১২ সালে সমবায় সমিতির অনুমোদন নিয়ে এখন প্রকাশ্যে চলছে চুলের ব্যবসা।

চুলের এ ব্যবসার উৎপত্তিস্থল চুয়াডাঙ্গা জেলার কার্পাসডাঙ্গা এলাকা। কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নটি জেলার দামুড়হুদা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তি একটি ইউনিয়ন। কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে ৩০০টি চুল প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। প্রায় ৫০ হাজার হকার বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চুল সংগ্রহের কাজ করছে। ১০ হাজার নারী কর্মি চুলের গিট ছাড়িয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় পাঠানোর উপযোগি করে। এ কাজে একজন নারী প্রতিদিন ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।

প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় চুল বাছাই করে ছোট চুল ও বড় চুল আলাদা করা হয়। এরপর তা পাঠানো হয় ঢাকায় বিক্রির উদ্দেশ্যে। শুরু থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে চুল ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হন। তারা ২০১২ সালে গঠণ করেন ‘একতা হেয়ার প্রসেসিং ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি’ নামের একটি সংগঠন। চুল ব্যবসায়ী কুতুবপুর গ্রামের শামীম হোসেন জানান, নারীদের মাথার ফেলে দেওয়া চুল এখন আর ছোটোখাট ব্যাপার নয়। বরং একসময়ের এই আবর্জনা এখন নিয়ে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা। যার মাধ্যমে দেশের অনেকে সাবলম্বি হয়েছেন। চুয়াডাঙ্গা জেলার হাজার হাজার মানুষের কর্ম-সংস্থান হয়েছে।
চুল ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত সাদ্দাম হোসেন বলেন, কার্পাসডাঙ্গা, কুতুবপুর, মুন্সীপুরসহ আশ-পাশ এলাকার দরিদ্র কোনো নারী এখন আর বেকার নন। কয়েকজন নারী একত্রিত হয়ে নিজেদের বাড়িতে বসে চুলের গিট ছুড়াচ্ছেন। এভাবে তারা বাড়তি আয় করে সংসারে সচ্ছলতা আনছেন। একসময় যাদের দিন কাটতো অভাব অনটনে তাদের অনেকেই এখন কোটি টাকার মালিক।

চুয়াডাঙ্গা থেকে শুরু হওয়া চুলের এ ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে। চুয়াডাঙ্গায় ব্যবসা শুরু করে সফলতা পাওয়া অনেক চুল ব্যবসায়ী এখন যশোর, সাতক্ষিরা, খুলনা, নওগাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গিয়ে কারখানা তৈরি করে ব্যবসা করছেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে একতা হেয়ার প্রসেসিং ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন চুলের ব্যবসায়ী সহিদ বিশ্বাস। তিনি জানান, শুরুতে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হলেও এখন তা কমে এসেছে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীও এখন জানে এ ব্যবসা অবৈধ কোনো ব্যবসা নয়। এ ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে অনেকেই সফলতা পেয়েছেন। হকাররা চুয়াডাঙ্গা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ফেলে দেওয়া চুল সংগ্রহ করে বিক্রি করে কারখানা মালিকদের কাছে। অন্য জেলা থেকেও চুল কিনে চুয়াডাঙ্গার কারখানায় এনে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে পাঠানো হচ্ছে ঢাকায়। এখন চুয়াডাঙ্গার কার্পাসডাঙ্গা থেকে প্রতিদিন ৭০-৭৫ লাখ টাকার চুল যাচ্ছে ঢাকায়, তারপর তা চলে যাচ্ছে চীন দেশে।

চুল ব্যবসায়ীরা জানান, প্রক্রিয়াজাতকরণ করার পর এক কেজি চুল বিক্রি হয় ৮ হাজার ৫০০ টাকায়। চীন দেশের ব্যবসায়ীরা ওই চুল কিনে বাংলাদেশেই তারা আবারও প্রক্রিয়াজাত করে। তারপর তা পাঠানো হয় চীন দেশে। চীন দেশে তৈরি হয় পরচুলা, চুলের ক্যাপ, খোপা প্রভৃতি। যা সারা পৃথিবীতে বিক্রি হয় উচ্চমূল্যে। চুল কেনা হকার কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের মজিবর রহমান বলেন, বিভিন্ন গ্রামে ফেরি করে নগদ টাকা ও খাবারসহ বিভিন্ন রকম জিনিস দিয়ে গ্রামের মহিলাদের কাছ থেকে চুল সংগ্রহ করি। তখন এ সব চুল থাকে অগোছালো। পরে তা কারখানায় (প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র) এনে বিক্রি করি। তিনি বলেন, গ্রামের মহিলারা এক সময় এ সব চুল ফেলে দিত। প্রথম দিকে এ চুল কম দামে কিনতাম। কিন্তু এখন চুল আর কেউ ফেলে না। গ্রাম থেকে এ চুল কিনতে হচ্ছে দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা দিয়ে । আর তা বিক্রি করি তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকায়। কারখানা মালিকরা চুল ঠিকঠাক করার পর ঢাকায় নিয়ে আরো বেশি দামে বিক্রি করেন। কার্পাসডাঙ্গা গ্রামের গৃহবধু সাবিনা খাতুন বলেন, চুলের গিট ছুড়িয়ে প্রতিদিন পাওয়া যায় ১০০/১৫০ টাকা। সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমরা এ কাজ করি।

আরএইচ/আরকে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


oranjee