ঢাকা, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

খুলনায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার মূল কারণ পলিথিন: নীরব প্রশাসন

গ্লোবালটিভিবিডি ৫:১৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৬, ২০১৯

সংগৃহীত ছবি

এম এ কবির, খুলনা: প্রতি বছর বর্ষায় খুলনা মহানগরের অধিকাংশ এলাকায় ভয়াবহ জলজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম সংকটে পড়তে হয় নগরবাসীকে।

জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসীকে স্বস্তি দিতে খুলনার বেদখল খালগুলোকে দখল মুক্ত করে নগরবাসীর কাছ থেকে প্রশংসার দাবিদার হলেও গুপ্তচর হিসেবে খালগুলোর উপরে এবং নিচের স্তরে ককশিট ও পলিথিন ভয়াবহতা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। নিষিদ্ধ হলও কাঁচা বাজার থেকে শুরু করে প্রতিটি দোকানেই ব্যবহৃত হচ্ছে পলিথিন ও ককশিট। এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তৈরি ওয়ান টাইম প্লেট গ্লাস যুক্ত হয়েছে জলাবদ্ধতার নতুন মাত্রায়।

ব্যবহারের পরে এসকল পলিথিন ও ককশিট নগরের প্রতিটি নালা-নর্দমায় ফেলা হচ্ছে। খাল বা নর্দমায় ফেলানো এ সকল পলিথিন পানির নিচের স্তরের পানি প্রবাহিত হতে বাধা সৃষ্টি করে পলি জমে। অপরদিকে ককশিট না পানির উপরের স্তরে ভেসে থাকায় প্রবাহিত পানিকে উপরের থেকে বাধা সৃষ্টি করে। আর এ সকল কারণে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে নগরীতে। অথচ ভয়াবহ এসকল পলিথিন ককশীট তৈরি হচ্ছে নগরীতেই। কিন্তু এসব উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে কার্যকর কোনো ক্রাশ প্রোগ্রাম চালাচ্ছে না প্রশাসন। তবে মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু পলিথিন জব্দ করা হলেও কারখানা বন্ধের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

ঢাকার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদিত কোটি কোটি পলিথিন প্রতিদিন আসছে নগরে। আর বড়বাজার ও দৌলতপুর বাজার হয়ে এসব পলিথিন ছড়িয়ে পড়ছে খুলনা নগর ছাড়িয়ে গ্রাম গঞ্জে। অপরদিকে সকল ককশিট ব্যবহার বেড়েছে বিপজ্জনকভাবে। আমসহ সকল প্রকার ফল মাছ বিভিন্ন পণ্য বহন করায় বিপদজনক হারে বেড়েছে এর ব্যবহার। চীন জাপান থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানিকৃত ককশিটের কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে ককশিট এর প্যাকেট ও প্লেন শীট। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলায় সাচিবুনিয়ায় রয়েছে ককশিট তৈরির ফ্যাক্টরি। একটি ককশিট বিক্রি হচ্ছে ১৫০-৩৫০ টাকায়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, পরিবেশবাদীদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার ২০০১ সালে ২০ মাইক্রনের (পুরুত্বের একক) নিচে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজারজাত নিষিদ্ধ করে। কিন্তু বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ব্যবহারের কথা বলে ২০০৮ সালে নতুন আদেশ জারি করা হয়। যাতে ৫৫ মাইক্রনের নিচে পলিথিন উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়। পাশাপাশি ব্যাগ আকৃতির যেকোনো পলিথিন উৎপাদন নিষিদ্ধ রাখা হয়। কিন্তু দেশে গার্মেন্টস, লবণ ও চিনিসহ ২৩ ধরনের পণ্য প্যাকেজিং-এ মোটা পলিথিন ব্যবহারের অনুমোদনকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী পাতলা নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন করছে।

তিনি বলেন, ছোট্ট একটি ঘরে মাত্র ৫-৭ লাখ টাকা দামের মেশিন স্থাপন করে চলছে পলিথিন উৎপাদন। লোকবলও তেমন বেশি লাগে না। চার পাঁচজন লোক দিয়ে একটি পলিথিন কারখানা চালানো সম্ভব। একজন ব্যক্তি অটোমেটিক মেশিনটি চালাতে পারেন। অপরদিকে একই কারখানায় একই মেশিনে মোটা বা সরু পলিথিন উৎপাদন হয়। কাঁচামালও একই। এতে কারখানাগুলো নিয়ন্ত্রণ বেশ কঠিন বলে জানান এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, কারখানা থেকে কাভার্ড ভ্যান বোঝাই করে পলিথিনগুলো পাঠানো হয় দেশের বিভিন্ন স্থানে। রাস্তাঘাটে প্রতিটি কাভার্ড ভ্যান তল্লাশি করে সরু পলিথিন ধরা খুব কঠিন। মোটা পলিথিন বোঝাই কাভার্ড ভ্যানেই সরু পলিথিন বোঝাই করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, পলিথিন কারখানার মালিকদের শক্ত একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে। এই নেটওয়ার্কই দেশব্যাপী পলিথিন সরবরাহ করে। বড় বাজার ও দৌলতপুর বাজারে গড়ে উঠা সংঘবদ্ধ একটি চক্র পলিথিন সংরক্ষণ এবং বাজারজাত করে। চক্রটি নমুনা হিসেবে একটি বা দুইটি পলিথিন গোপনে দোকানে রাখে। ক্রেতাদের নমুনা দেখিয়ে গোডাউন থেকে পলিথিন বিক্রি করে। পরে রাতের আঁধারে এসব পলিথিন সরবরাহ হয় খুলনার বিভিন্ন স্থানে। এক্ষেত্রে পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজনকে ম্যানেজ করে এসব বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ব্যবসায়ী বলেন, আমাদের এসব দোকান ও গুদাম থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হয়। মাঝে মধ্যে দুয়েকটি অভিযান চললেও আমরা আগে থেকে সতর্ক থাকি।

ইঞ্জিনিয়ার মৃধা ইয়াসিন হামিদ বলেন, পলিথিন আমাদের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে একটি বলা যায়। কারণ বাজার করার জন্য ঝামেলা মুক্ত। তবে পলিথিন যেভাবে পরিবেশ এবং জলাবদ্ধ সৃষ্টি করছে, সে হিসেবে এটা কে আমাদের সাধারন জনগনের পরিত্যাগ করা উচিত। অথবা আমরা ব্যবহারের পরে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে তা পুড়িয়ে ফেলা উচিত। অপরদিকে ককশিট অপচনশীল একটি পণ্য সুতরাং এসব জিনিস আমরা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে রাখা ভালো বলে তিনি মনে করেন।

রুপসা মাছের আড়ৎ এ ককসীট ব্যবসায়ী আরমান মিয়া বলেন, আমরা এ সকল ককশিট যারা বিদেশ থেকে মাছ এবং ফল আনেন তাদের থেকে এসকল ককশিট আমরা কিনে রাখি। পরবর্তীতে এখান থেকে যারা মাছ কিনে তারা আমাদের থেকে সকল ককশিট কিনে নেয়। একটি ককশিট ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে কাজ শেষে যে সকল ককশীট যখন ফুটা বা ভেঙে যায় তখন এ সকল ককশিট ফেলে দেওয়া হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে এ ব্যবসায়ী বলেন, এ সকল ককশিট ১০০ -১৫০ বছরেও পচে না। এগুলো পানির উপর ভেসে থাকে।

আর এসকল কথার সত্যতা মিললো রুপসা মাছের আড়ৎ এর পাশে খুলনার একমাত্র প্রবাহিত বড় ট্রেনটিতে গিয়ে। যেখানে গিয়ে দেখা যায়, ককশীটে জলাবদ্ধ হয়ে রয়েছে ড্রেনটি।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের কনজারভেটিভ অফিসার আনিসুর রহমান বলেন, ককশীট পলিথিনের থেকেও জলাবদ্ধতার জন্য ভয়াবহ। এ সকল ককশিট পানির উপর ভেসে থাকে। আর পলিথিন পানির নিচের স্তরে থাকে, বিভিন্ন প্রবাহিত ময়লা আটকে রাখে পানির নিচে। আর ককশিট পানির উপরের অংশে প্রবাহিত বিভিন্ন ময়লাকে বাধা সৃষ্টি করে। এসকল কারণেই জলাবদ্ধতার ভয়াবহ রূপ নিয়েচ্ছে নগরীতে। এর জন্য আমাদের সাধারণ জনগণকে সচেতন হতে হবে ।

এমএকে/এএইচ/এমএস


oranjee