ঢাকা, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

পাবনায় ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে নিড়ানি ছাড়া পাট চাষ প্রযুক্তি

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:১৩ অপরাহ্ণ, জুন ১৫, ২০১৯

ছবি সংগৃহীত

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা : ‘বিনা নিড়ানি পদ্ধতি’তে পাট আবাদ পাবনার চাটমোহর উপজেলার কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। চাটমোহর কৃষি অফিস থেকে সম্প্রতি অবসরে যাওয়া উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা(এসএপিপিও) আব্দুল খালেকর এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এ পদ্ধতিতে পাট আবাদ করে কৃষকের খরচ কমেছে বিঘাপ্রতি অন্তত: ৬ হাজার টাকা।

কৃষিবিদদের মতে, পাট আবাদের এ পদ্ধতি পাবনার সব উপজেলার কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে বছরে পাট নিড়ানি বাবদ শ্রমিক খরচ সাশ্রয় হবে প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা। আর প্রযুক্তিটি সারা দেশে সম্প্রসারণ
ঘটলে শত শত কোটি টাকার শ্রমিক খরচ বেচে যাবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হাসান রশীদ হুসাইনী জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর সহযোগিতায় চাটমোহর উপজেলায় এবছর প্রায় ৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে এ পদ্ধতিতে পাট আবাদ করেছেন কৃষকরা। আর ‘বিনা নিড়ানি পদ্ধতি’তে উপজেলার লাঙলমোরা, বড়দানগর, চরনবীন, কাটেঙ্গা, ছাইকোলা,
সবুজপাড়া, কারিগরপাড়া, পশ্চিমপাড়া প্রভৃতি এলাকায় ১৫ শ’ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আইসিএম ক্লাবের শিক্ষার্থী চাষির মাধ্যমে প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে পড়েছে চাটমোহর উপজেলার গ্রাম- গ্রামান্তরে। এর আগে পাট আবাদের এ পদ্ধতি পরিদর্শন করেছেন উর্দ্ধতন কৃষি কর্মকর্তারা।

‘বিনা নিড়ানি’ পদ্ধতির উদ্ভাবক আব্দুল খালেক প্রযুক্তিটি সম্বন্ধে জানান, এটি একটি ছোট কৌশলমাত্র। ওই কৌশল সম্বন্ধে তিনি জানান, পাট চারা গজানোর ১০- ১৫ দিন পর ১০ কেজি ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। প্রথম প্রয়োগের ১৫ দিন পর গাছ ৯ ইঞ্চির মত হলে বিঘা প্রতি আরও ১০ কেজি ইউরিয়া সার দিতে হয়।
এতে গাছ দ্রুত বাড়ে, ঘাস নিচে পড়ে যায়। এছাড়া পর্যাপ্ত কার্বন ডাই অক্সাইড, আলো- বাতাসের অভাব ও পাট গাছের গরমে ঘাস একাই পচে মরে যায় । এতে ক্ষেতে ঘাস বলতে কিছু থাকে না আর তাই দু’ দফায় নিড়ানিও দিতে হয় না। এতে বিঘাপ্রতি কমপক্ষে ৩০ জন শ্রমিকের খরচ বেচে যায়। সে হিসেবে এতে কম করে হলেও বিঘা প্রতি ছয় হাজার টাকা উৎপাদন খরচ সাশ্রয় হয় বলে তিনি জানান।

চাষিরা কেমন সুফল পাচ্ছেন, তা জানতে চাটমোহরের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকের সাথে সরেজমিন কথা হয়। ছাইকোলা কারিগরপাড়ার চাষি সাবেদুর রহমান জানান, তিনি গত দু’বছর ধরে এক একর জমিতে পাট চাষ করছেন। তিনি জানান, তার সার বাবদ অতিরিক্ত দু’শ’ টাকা খরচ হয়েছে। তবে তার ২৫- ৩০জন কৃষি শ্রমিক এর
খরচ বেঁচে গেছে। এতে বিঘা প্রতি নিট সাশ্রয় হয়েছে ছয় হাজার টাকা। মিজানুর রহমান, আসাদ, বুদ্ধ, রেজাউল করিম, আমিন উদ্দিন, হোসেনের মত বহু চাষি এখন বিনা নিড়ানিতে পাট চাষ করে লাভবান বলে জানান।

চরনবীন গ্রামের কৃষক আব্দুল মান্নান, আবদুস সালাম ও নাজমুল হক জানান, ‘এই পদ্ধতিতে পাট আবাদ করলে জমিতে নিড়ানি দিতে হয়না। নিড়ানি দিতে যে শ্রমিক খরচ হতো তা এখন সাশ্রয় হচ্ছে আমাদের। ফলে আমরা লাভবান হচ্ছি।’ বিঘা প্রতি শ্রমিক খরচ বাবদ ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বেচে যাচ্ছে বলেও জানান তারা।

আব্দুল খালেক তার সরেজমিন গবেষণা সম্বন্ধে জানান, ২০১০ সালে উপজেলার চাটমোহর উপজেলার ছাইকোলা পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক মো. সাইফুদ্দিনের দুই বিঘা জমিতে বিনা নিড়ানিতে পাট আবাদ পদ্ধতি প্রদর্শন করে সাফল্য আসে। এরপর ২০১১ সালে চরনবীন, লাঙ্গলমোড়া, বরদানগর, ছাইকোলা সোনাহারপাড়া, সবুজপাড়া
গ্রামের ৩০ বিঘা জমিতে এই পদ্ধতিতে পাট আবাদ করে ব্যাপক সফলতা পান কৃষকরা। ভাল ফলন পান আব্দুল মান্নান, আব্দুর রহমান, আব্দুস সালাম, আজাহার আলী, শামসুর রহমান, দেল মাহমুদ, রোকন উজ্জামান, নাজমুল হক সহ অন্যান্য কৃষক। ২০১২ সালে ছাইকোলা ইউনিয়ন জুড়ে প্রায় শতভাগ জমিতে নিড়ানি ছাড়া পাট
চাষ হয়। এখন প্রায় গোটা উপজেলা জুড়ে নিড়ানি ছাড়া পাট চাষ হচ্ছে। ধীরে ধীরে এ প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ছে পাবনা জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষকদের মাঝে।

চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাসান রশীদ হুসাইনী জানান, পাট উৎপাদন করতে গিয়ে কৃষকের মুলত শ্রমিক খরচটাই বেশি হয়। পাট উৎপাদনের নিড়ানির শ্রমিক খরচ কমানোর জন্য এ প্রযুক্তিটি অভিনব ও সহজ।

তিনি আরও বলেন, বিনা নিড়ানিতে পাট আবাদের পদ্ধতিতে পাট বোনার সময় কৃষকদের ঘন করে পাট
বুনতে হবে। বোনার পর বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১২ কেজি পটাশ আর ৫ থেকে ৬ কেজি টিএসপি সার প্রয়োগ করতে হবে। বোনার ২০ দিন পর ৭ থেকে ৮ কেজি এবং তারও ১৫ দিন পর আর ৭/৮ কেজি ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। এছাড়া পাট একটু বড় হবার পর চিকন পাটগুলো বেছে দিতে হবে। এ কৃষিবিদ জানান, বেলে মাটির চেয়ে এঁটেল মাটিতে এর সফলতা ভাল পাওয়া যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পাবনার উপ-পরিচালক আজাহার আলী বলেন, ‘এ পদ্ধতিতে পাট আবাদ পাবনা জেলার সকল উপজেলার কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে বছরে এ জেলায় কৃষকদের প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা শ্রমিক খরচ সাশ্রয় সম্ভব হবে। আর গোটা দেশে তা ছড়িয়ে গেলে পাটচাষিরা লাভবান হবেন আর সাশ্রয়
হবে পারে হাজার কোটি টাকা। তা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।’

এএএচ


oranjee

আরও খবর :