ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯ | ৬ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

রাতে ঘুম হয় না বদির: ভাইয়েরা পলাতক

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৪২ অপরাহ্ণ, জুন ১৩, ২০১৯

ফাইল ছবি

জসীম উদ্দীন, কক্সবাজার: সময়টা ভালো যাচ্ছে না কক্সবাজার উখিয়া-টেকনাফের সাবেক আলোচিত সমালোচিত এমপি আবদুর রহমান বদির। টানা দুইবার নির্বাচিত সংসদ হওয়ার পরও তিনি মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে একাদশ সাংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোয়ন পাননি। তবে কৌশলগত কারণে মিসেস বদিকে মূল্যায়ন করে দল। তিনি বর্তমানে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের সদস্য।

এক প্রকার সিংহাসন হারিয়ে মানসিক যন্ত্রণায় থাকা বদিকে আরো যন্ত্রণা বাড়িয়ে দিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ইয়াবা সম্রাজ্যের রাজা সাইফুল করিম।

সাম্প্রতিক দেশের এক নাম্বার ইয়াবা ব্যবসায়ী খ্যাতি পাওয়া টেকনাফের সি আইপি সাইফুল করিম (ওরফে) হাজী সাইফুল করিম পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। পুলিশের তথ্যমতে, ৩০ মে রাতে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গেলে ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাইফুলের মৃত্যু হয়। ওই দিন ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ৯টি এলজি, ৪২ রাউন্ড শটগানের তাজা কার্তুজ, ৩৩ রাউন্ড কার্তুজের খোসা ও এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার করে।

জানা যায়, সাইফুল করিম নিহত হবার আগে পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সাবেক এমপি বদি, তার ভাই ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফরসহ ৬৪ জনের নাম বলে গিয়েছেন। এতে করে নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়েন বদি। যদিও তিনি মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ বার বার অস্বীকার করে এসেছেন।

তথ্যসূত্রে জানা যায়, বদি ছাড়াও সাইফুল করিমের বলে যাওয়া এ তালিকায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের নামও রয়েছে। পুলিশের বরাত দিয়ে দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমসহ প্রায় দেশের সব কয়টি পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টাল এ সংবাদ প্রকাশ করে।

সাইফুল করিম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে একেই কায়দায় বদিসহ শীর্ষ দশ ডনের শাস্তির দাবি তুলেছেন লাখো ফেইসবুক ব্যবহারি ও সচেতন মানুষ। দিন যতই গড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি আরো বেশি জোড়ালো হচ্ছে। এছাড়াও কক্সবাজারের বিভিন্ন সমাজিক সংগঠন বদি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলমসহ টপ ১০ ইয়াবা ডনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আন্দলোনের হুমকিও দিয়েছে ইতিমধ্যে।

এসব সংগঠনের নেতাদের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়সহ মাদকের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকার প্রথম নামটি বদির, তারপরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় অন্য মাদক কারবারিরা সাহস পাচ্ছেন বলে দাবি তাদের। এছাড়াও সাইফুল করিমের স্বীকারোক্তিতে বদির নাম আসার পর এখনো পর্যন্ত বদির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মাঝে।

সাবেক এই এমপির বিরুদ্ধে কি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানা না গেলেও আতংকে রাতে ঘুম হয় না বদির। সাইফুল করিম নিহত হবার পর থেকে তিনি মুখে যাই বলুক অনেক ভয় ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বদি পরিবারের এক নিকটতম আত্মীয় বলেন, সাবেক এমপি বদি সব কিছুর বিনিময় নিজেকে মাদকের দুর্নাম থেকে মুক্ত করতে যতই চেষ্টা করছে ততই বিপত্তি ঘটছে। কিছু সাংবাদিক ও ফেইসবুক ব্যবহারকারিদের জন্য এমনটি হচ্ছে বলে বদি ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে দাবি তার।


তিনি আরো বলেন, বর্তমান আ.লীগ সরকার মাদকের বদনাম থেকে দেশকে মুক্ত করতে যে কোন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারে এটি এমপি সাহেবের ভালো জানা। এ কারণ তিনি নিজেও তার ভাইদের নিয়ে বেশ উৎকন্ঠায় আছেন বলে দাবি তার।

কয়েকটি অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ করেন বদি। এটি তার ভেরিফাই ফেইসবুক পেইজে আলহাজ্ব আবদু রহমান বদি নামের আইডি থেকে শেয়ার করেন তিনি। সেখানেই ফেসবুক ব্যবহারকারী তাকে নিয়ে নানান রং তামাশায় মেতে উঠেছে এবং গালমন্দ করে মন্তব্য করছে।

এদিকে উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয় ও কক্সবাজার জেলা আ.লীগ নেতাদের সাফ কথা ইয়াবা সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে আ'লীগ নেই। যত বড় নেতাই হোক না কেন তার পাশে আ'লীগ থাকবে না। বরং মাদকমুক্ত সুন্দর দেশ গড়তে সব ইয়াবা ডনদের কঠিন শাস্তি দাবি করেছেন আ.লীগ নেতাকর্মীরা।

অপরদিকে সাবেক এমপি বদির কাছ থেকে বছরের পর বছর সুবিধা নেয়া নেতাকর্মীরা তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। রাতদিন পিছো না ছাড়া নেতাদেরও ইদানিং বদির সঙ্গে আর দেখা যাচ্ছে না। বেশিরভাগই চলে গেছেন আড়ালে।

বদির বলয়ে গড়ে উঠা টেকনাফে বদি লীগ নামে উপাধি পাওয়া নেতারাও তার পাশে নেই বললে চলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাতদিন সাবেক এ সাংসদের সঙ্গে থাকা এক নেতা বলেন, সময় এখন বদলে গেছে। বদির যে কোন সময় ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন নিজ জীবন বাঁচানোই আমি ফরজ মনে করছি।

আ'লীগের একটি সূত্র দাবি করেছে, সর্বোচ্চ মহলেও এখন আর বদির কোন তদবির তেমন একটা চলবে না। ফলে সামনের দিনগুলো বদির আরোও খারাপ যাবে বলে দাবি করেন সূত্রটি। সূত্রটির দাবি কেউ এখন আর বদির পক্ষে কথা বলে বদনামের ভাগীদার হতে চাইবেনা। বিশেষ করে এ মরণ নেশা ইয়াবার বদনাম যে কোন মূল্যে সরকার এ দেশ থেকে মুছে ফেলতে চাইছে। তাই জড়িত কেউ পার পাবে না।

কক্সবাজার পিপলস ফোরামের মুখোপাত্র এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, সাবেক এমপি বদির উচিত তার ভাই ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফরসহ শীর্ষ ইয়াবা ডনদের ধরিয়ে দেয়া। এটি যদি তিনি করতে পারেন বাংলাদেশকে ইয়াবামুক্ত করা সময়ের ব্যাপার মাত্র। তিনি আরোও বলন, এতে করে বদি নিজেও দায় মুক্তির সুযোগ পাবেন। আশা করি তিনি এ সুযোগ কাজে লাগাবেন।

এ ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত বদির পক্ষ থেকে কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ১১জুন টেকনাফ পৌরসভার একটি পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অংশগ্রণ করেন বদি। সেখানে ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে উদ্দেশে বলেন, যারা ইয়াবা ঝুল খেয়েছো তারাও বাঁচতে পারবেনা। আমার ভাইয়েরা যদি ইয়াবা ব্যবসা করে তারাও পার পাবে না।

এরই মধ্যে সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদির দুই ভাই ও এক ফুফাত ভাইয়ের ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করতেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ডন সাইফুল করিম। পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে তারাসহ ৩৩ ইয়াবা ডনের নাম বলে গেছেন এ ইয়াবাকারবারি। তার নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে করা মামলার এজাহারেই এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

গত ৩১ মে টেকনাফ মডেল থানার এসআই রাসেল আহমদ বাদী হয়ে ৩৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করেন। এর মধ্যে ১৮ আসামির পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা
মামলার এজাহারের তথ্যানুযায়ী, বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার আগে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ৩৩ প্রভাবশালী ইয়াবা ব্যবসায়ী ও হুন্ডিচক্রের নাম প্রকাশ করেন সাইফুল করিম। এর মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির দুই ভাই মৌলভী মুজিব ও আবদুল শুক্কুর, ফুফাত ভাই রাসেল, টেকনাফ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তার ছেলে টেকনাফ সদর ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া, টেকনাফের হুন্ডিসম্রাট জাফর আলম ওরফে টিটি জাফর, তার ছোট ভাই গফুর, নাজিরপাড়ার ইয়াবা ডন নুরুল হক ভুট্ট, এনামুল হক মেম্বারসহ অনেকের নাম রয়েছে।

এ ঘটনার পর থেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন বদির ভাইসহ বেশিভাগ আত্মীয় স্বজনেরা। এর আগেও বদির আরোও দুই ভাই আত্মসমর্থন করে জেলে আছেন।
পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বদির ডান হাত হিসেবে পরিচিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম ও তার ছেলে। ডন শাহাজান চেয়ারম্যানও মিয়ানমারে পালিয়ে গেছে বলে শোনা যাচ্ছে।

এক প্রকার সাবেক এমপি বদির পাশে এমপি বৌদি ছাড়া আর কেউ নেই বললে চলে। জানা যায়, এই ইয়াবা ডনেরা কেউ পাশের দেশ মিয়ানমারে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ বা বর্তমানে ঢাকাতে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে দুবাই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাই আছেন তারা।

এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ। তিনি বলেন, মৃত্যুর আগে সাইফুল পুলিশের পৃথক জিজ্ঞাসাবাদে বদির দুই ভাইসহ কয়েকটি সিন্ডিকেটের ৩৩ জন ইয়াবা ও হুন্ডি ব্যবসায়ীর ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে গত ৩১ মে মামলা করা হয়েছে। এবং পুলিশ বসে নেই, আসামীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেই খানে পালিয়ে যাক তাদের খুঁজে বের করে হাত কড়া পরানো হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কক্সবাজারে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার ইকবাল হোসাইন বলেন, ইয়াবা ডনেরা কেউ আগে আর কেউ পরে সবাই পুলিশের জালে আটকা পড়বে। যত বড় মাপের ব্যাক্তি বা শক্তিশালী হোক না কেন কেউ রেহাই পাবে না। পর্যায়ক্রমে সবাইকে আইনের আওয়াতায় আনা হবে বলে জানান তিনি।

জেইউ/এমএস


oranjee