ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৬ ভাদ্র ১৪২৬

 
 
 
 

বুকে এখনো পাকবাহিনীর গুলি, তবুও জোটেনি যুদ্ধাহতের স্বীকৃতি

গ্লোবালটিভিবিডি ৫:৫৫ অপরাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০১৯

ছবি- সংগ্রহ

মনি চন্দ্র দাস, নেত্রকোনা প্রতিনিধি: মুক্তিযুদ্ধে নেত্রকোণার ‘মদনের যুদ্ধ’ গোটা ময়মনসিংহ অঞ্চলে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধগুলির মধ্যে অন্যতম। অদম্য সাহস ও ত্যাগের বিনিময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সেদিন বিতাড়িত করতে পেরেছিল এই অঞ্চলের যোদ্ধারা। সেই যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিয়ে ফেরার পথে পাকস্তানি সেনাদের একটি বুলেট এসে পিঠ দিয়ে প্রবেশ করেছিল বারো-তেরো বছরের কিশোরী সালেহার। মৃত মনে করে কেউ আর আগ্রহ দেখায়নি তখন তাকে বাঁচানোর জন্য। ৭/৮ দিন অজ্ঞান থাকার পর সবাইকে অবাক করে দিয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান তিনি। স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও বুকের ভেতরে রয়ে গেছে সেই বুলেটখানি, যা এক্সেরের কাগজে স্পষ্ট দৃশ্যমান। তা নিয়েই দুঃসহ জীবন অতিবাহিত করে চলেছেন তিনি। যুদ্ধে অবদান রাখা সত্ত্বেও আজো জোটেনি কোন স্বীকৃতি ও সহায়তা।

জানা যায়, ১৯৭১ সালে ভাটি অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের দমনের জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মদন সদরে ঘাঁটি তৈরি করে। মগড়া নদী তীরবর্তী পুরাতন থানা ভবন ও বুড়া পীরের মাজার এলাকায় বাংকার তৈরি করে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাজিতপুর গ্রামে কাজী ফোর্সের মুক্তিযোদ্ধারাও বাংকার তৈরি করে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খাদ্য ও পানীয় জলসহ প্রয়োজনীয় রসদসামগ্রী সরবরাহ করতেন স্থানীয় নারী ‘মিরাশি বেগম’ এবং কিশোরী ‘সালেহা বেগম’। ৩০ অক্টোবর রাত থেকে দু’পক্ষের মধ্যে থেমে থেমে গোলাগুলি শুরু হয় যা একটানা ৬ নভেম্বর পর্যন্ত বলবৎ ছিল। মর্টারের তুমুল শেল বর্ষণ ও গোলাগুলির মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে যাচ্ছিলেন। এমনই এক সময়ে বাংকারে খাবার পৌঁছে দিয়ে ঘরে ফিরে আসার সময় পেছন থেকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ছোড়া একটি বুলেট কিশোরী সালেহার পিঠে বিদ্ধ হয়। যুদ্ধে অবদান রাখায় পরবর্তীতে `মিরাশি বেগম'কে বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হলেও গুলিবিদ্ধ কিশোরী সালেহার কোন খেতাব জোটেনি আজো।

সারা জীবন শরীরের ভিতর দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে গুলি বহন করে চলতে চলতে সেই কিশোরী আজ ষাটোর্ধ। প্রায়শ:ই তীব্র ব্যাথায় ছটফট করতে করতে প্রাণ যেন উষ্ঠাগত হতে চায় তার। ইদানিং স্মৃতিভ্রংশ রোগ বাসা বেঁধেছে মস্তিষ্কে। অনেক কিছুই আর আগের মতো মনে রাখতে পারেন না তিনি। অপারেশন করে গুলি বের করতেও প্রচণ্ড অনীহা রয়েছে তার। গুলি বের করতে গিয়ে যদি মৃত্যু হয়ে যায়। তার শেষ ইচ্ছে যুদ্ধাহতের মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিয়েই মৃত্যুবরণ করার। যতদিন না তা পাচ্ছেন তিনি ততদিন শরীরেই বহন করবেন গুলিটিকে।

প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধা এখলাছ আহাম্মদ কোরেইশী জানান, মদন থানায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সবচেয়ে বড় ঘাঁটি ছিল। এই ডিফেন্সকে লণ্ডভণ্ড করার জন্য আমরা স্বল্প কিছু মুক্তিযোদ্ধা সুপরিকল্পিতভাবে ৩০ অক্টোবর শনিবার রাত ২টায় বাজিতপুর, মদন দক্ষিণ পাড়া ও আরগীলা দিয়ে ত্রিমুখী আক্রমণ করেছিলাম। মাঝে মাঝে ইমদাদপুর দালানবাড়ি ও মামুদপুর দিয়ে আরো দুটি ফন্ট বাড়ানো হতো। ফলে পাকবাহিনী ভয় পেয়ে যায় এই ভেবে যে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলেছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম গাজী আব্দুস সোবহান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম সিরাজুল ইসলাম খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের চৌধুরী গোলাপ, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম নজরুল ইসলাম খান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মিরাশী বেগম, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত খগেন্দ্র তালুকদার ও আমি বাজিতপুর ফ্রন্টে বিচিত্র যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলাম। অবিরাম ভূমি কাঁপানো সেই যুদ্ধে রাজাকার কোম্পানি কমান্ডার এনায়েত উল্লাহ মঞ্জু ও পাকবাহিনীর প্লাটুন কমান্ডার হাসমাত খানের নেতৃত্বে শত্রুরা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের কড়া জবাব দিচ্ছিল। তাদের ভারী অস্ত্রে আমরা তটস্থ ছিলাম। কিন্তু ওরা আমাদের হাতে একে একে মরতে থাকে।

বাজিতপুর গ্রামের কাঁচু ফকিরের চঞ্চলা কিশোরী কন্যা সালেহা ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা মিরাশী বেগমের সার্বক্ষণিক সাথী। বাংকারে বাংকারে গুলির বাক্স ও খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ করতো সে। সামনে এগিয়ে গিয়ে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য রাখতো। এমনি এক সময়ে ফিরে আসার সময় ১৯৭১ এর ৫ নভেম্বর শুক্রবার বিকেলে পাক সেনারা তাকে পেছন থেকে গুলি করে দেয়। মিরাশী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। আমরা সবাই দুঃখ পেলেও যুদ্ধে যুদ্ধে সব ভুলে গেলাম।

স্বাধীনতার সাড়ে ৪৬ বছর পর জানতে পারলাম বুলেটটি তার শরীরে আজো রয়ে গেছে। আমার সহযোদ্ধারা আজ আর জীবিত নেই। সে দিনের সেই দিনগুলোর ঘটনাপঞ্জি সেলুলয়েডের ফিতার মতো আজো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে। তখনকার সেই কিশোরী আজকের বৃদ্ধার আশ্চর্যজনক সেই দেশপ্রেমের অপরিসীম অবদান আমার মুক্তিযুদ্ধের সরকার কিভাবে মূল্যায়ন করবে তার দিকেই তাকিয়ে আছি। এমনটি কি আর কোথাও ঘটেছে? প্রশ্ন ছিল তার।

বাজিতপুর গ্রামের মানুষগুলোও ছালেহাকে নিয়ে গর্বিত। নিজ বাবার বাড়িতে আসলে প্রতিবেশীরা তাকে দেখতে আসে ও খোঁজ খবর নেয়। ৮০ বছরের বৃদ্ধ আব্দুল জলিল যুদ্ধের সময়ে এই ছোট মেয়েটির ছোটাছুটি ও সাহস দেখে অবাক হতেন।

৯০ বছরের বৃদ্ধা ছালেহার মা জাহানারা স্মৃতি হাতড়ে জানান, তার মেয়ে গুলির খোসা নিয়ে খেলা করতো সেসময়। যখনই মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু পৌঁছে দিতে বাংকারের পাশে যেতো এগুলো কুড়িয়ে আনতো। বোনের গুলিবিদ্ধের খবরে মহেশখলার ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকা বড় ছেলে নান্টু দীর্ঘ পথ উত্তাল হাওর নৌকায় পাড়ি দিয়ে বাড়ি চলে আসে। টুকরো টুকরো অনেক স্মৃতিই মনে ভেসে উঠে জাহানারার।

একাত্তরের সেই বীর সাহসী কিশোরী সালেহা এখন ৫ সন্তানের সহজ সরল জননী। ছেলে রাসেলের সাথে কথা বলে জানা যায়, ছোটবেলা থেকেই মাকে শারীরিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে বড় হয়েছেন তিনি। যুদ্ধের সময় পিঠে বিদ্ধ গুলিটি যে শরীরে থেকে গিয়েছিল তা জানতে পারেননি তারা। বেশিরভাগ সময় মায়ের পেটে,কোমরে, বুকে ব্যাথা করতো তারা ব্যথা ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খেতে দিতেন। বছর খানিক আগে বুকে প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে বুকের এক্সরে করা হয়। তখনই বুলেটের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। বুলেটটি সময়ে সময়ে স্থান পরিবর্তন করে।

বীর নারী ছালেহা বেগম বলেন,‘মুক্তিযুদ্ধে যেহেতু আমার অবদান আছে তাই আমি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চাই। আর বঙ্গবন্ধুর মেয়ে যদি আমার শরীরের গুলি বের করতে বলে তাহলে আমি অপারেশন করতে রাজি। আমি তার সাথে দেখা করতে চাই।’

এমসিডি/এমএম

 


oranjee