ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১ আশ্বিন ১৪২৬

 
 
 
 

ঘুরে আসুন শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লায়

গ্লোবালটিভিবিডি ৩:৫০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৯, ২০১৯

এ কে আজাদ, ফেনী: শত বছর বাঙালির ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে বাঁশ। এ বাঁশ দিয়ে আমাদের গ্রাম বাংলার লোকজ শিল্প টিকে আছে। বাংলার গ্রামীণ জীবনে বাঁশ একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে রয়েছে। শিল্পের আগ্রাসনে বাঁশের ব্যবহার কমে আসছে। সেই জন্য এখন আর বাঁশের তৈরি তৈজসপত্র কিংবা এর শৈল্পিক ব্যবহার চোখে পড়ে না। কিন্তু ভেবে দেখেন যদি এমন একটি জায়গায় যেতে পারেন যেখানে আধুনিক স্থাপত্য আর লোকজ কৃষ্টির মিশেলে আসবাবপত্র থেকে থাকার ঘর পর্যন্ত সব কিছু সাজানো হয় তাহলে কেমন লাগবে আপনার! তেমনি বাঁশ, খড় আর ছনের নান্দনিক ব্যবহারে গড়ে উঠেছে শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা রিসোর্ট। সম্পূর্ণ বাঁশের তৈরি এই রিসোর্টটি ফেনীর ছাগলনাইয়াতে ভারতীয় সীমান্তের কাছে চম্পক নগর ও সোনাপুর গ্রামে অবস্থিত।

অবকাঠামোগত দিক বাদেও এই রিসোর্টটির পেছনে লুকিয়ে আছে ঐতিহাসিক কিছু তাৎপর্যও। এই শমসের গাজী ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী এবং ত্রিপুরার রোশনাবাদ পরগনার কৃষক বিদ্রোহের নায়ক। ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির আগ্রাসন প্রতিহত করতে গিয়ে মৃত্যু বরণ করেন তিনি। শমসের গাজী, যিনি ভাটির বাঘ বলে পরিচিত, নবাব সিরাজউদ্দৌলা পর ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে নিহত হওয়া প্রথম ব্যক্তি তিনি। বর্তমানে যেখানে রিসোর্টটি আছে সেখানে থাকার কথা ছিলো শমসের গাজীর রাজপ্রাসাদ। তাকে হত্যা করার পর শত্রুরা তার প্রাসাদ এবং সমস্ত স্থাপনা মাটির সাথে একেবারে গুড়িয়ে দেয়। শমসের গাজীর তৈরি দুর্গটিও এখন বিলুপ্ত। তারপরও এখানে তার স্মৃতিবিজড়িত কৈয়্যারা দিঘী, গুপ্ত সুড়ঙ্গ রয়ে গেছে এখনো।

শমসের গাজীর উত্তরসূরি ওয়াদুদ ভূঞা গড়ে তুলেছেন চমৎকার শিল্পমানের রিসোর্টটি। নির্মাণশৈলীর দিক দিয়ে এটি থাইল্যান্ড ও জাপানের বিভিন্ন শৈল্পিক রেস্ট হাউজের আদলে গড়া। এর কারুকাজ হিসেবে কাজ করেছিলেন কানাডার লুই ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য প্রকৌশলী ‘সুরান না’। রিসোর্টের ভেতর বাহির সব কিছুতেই আছে বাঁশের চমৎকার ব্যবহার। ত্রিপুরার রাজ্যের নবাব শমসের গাজীর বংশধর ওয়াদুদ ভূঞা এখন থাকেন খাগড়াছড়িতে। ওয়াদুদ ভূঞার জন্ম স্থান এই সোনাপুরেই। তিনি মাঝে মধ্যে এখানে আসেন।

এই রিসোর্টের বাঁশের চেয়ার, বাঁশের টেবিল থেকে সমস্ত আসবাবপত্রই বাঁশের। কেল্লার প্রবেশপথে সবার চোখে পড়বে ‘ঐকতান’ নামের একটি ঢোল, তবলা, হারমোনিয়াম ও একতারা সংবলিত ভাস্কর্য। আঙ্গিনায় বাগানের পাশে রয়েছে বাঁশের মাচার উপর তৈরি পাহাড়ি ঘর। নানা রকম গাছগাছালি ঘেরা এই রিসোর্টে গাছের ফাঁকে ফাঁকে আছে বসে আড্ডা দেয়ার জন্য ছোট ব্রাঞ্চ। বাগানের পাশেই দৃষ্টিনন্দন লেক আর পারাপারের জন্য সুদৃশ্য ব্রিজ। ইচ্ছে হলে পায়ে চালিত নৌকা দিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারেন লেকের পানিতে। লেকের ওপাড়ে গেলেই দেখা পাবেন মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে মাথায় হাত দিয়ে আধ শোয়া চিন্তা মগ্ন স্ট্যাচু। দেখলে হয়তো তার ভাবনা নিয়ে আপনিও ভাবনায় পড়ে যেতে পারেন। আছে দুইটি বানর ও খরগোশ।

আবাসিক এই রিসোর্টে একেবারে পারিবারিক আবহ এর ভেতর কাটিয়ে যেতে পারেন রাত কিংবা দিন। গরমের দিনেও রিসোর্টটিতে আরাম আয়াশে থাকতে পারেন। কারণ এটা সবসময় শীতল থাকে। ৫টি কক্ষ বিশিষ্ট রিসোর্টের সিঙ্গেল বেড-৩০০০ থেকে ৩৫০০ টাকা। আর ডাবল বেড-৭০০০ টাকা।

রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত থাকার ব্যবস্থা। পাশাপাশি ডাইনিং হল, পাঠ কক্ষ, মেহমান কক্ষ, চা কর্নার, পানির ফোয়ারা, পাহাড়ি গাছপালার আবহ, আর দৃষ্টিনন্দন লেকের কথা তো বলাই হলো। আরেকটা চমৎকার বিষয় হলো এখানে এসে উপভোগ করতে পারেন ত্রিপুরা মেয়েদের নাচ আর গান।

পর্যটকদের খাবারের জন্য রয়েছে ঘরোয়া পরিবেশের ক্যান্টিন। ছুটির দিন প্রায় ২-৩শ' জন পর্যটক ঘুরতে আসে।

এই দৃষ্টিনন্দন রিসোর্টের ভেতরে প্রবেশে অনাবাসিকদের খরচ করতে হবে মাত্র ২০ টাকা। চার একর জমিতে এ রিসোর্টটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নাট্য নির্মাতারা এখন নাটকের শুটিং করতে পারেন।

নান্দনিক এই ‘শমসের গাজীর বাঁশের কেল্লা’ ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার শুভপুর হয়ে জগন্নাথপুর সোনাপুর গ্রামে অবস্থিত। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এসে বারইয়ারহাট নামতে হবে। এরপর রামগড় রোড দিয়ে করেরহাট বাজার পেরিয়ে শুভপুর বাজার। শুভপুর বাজার থেকে সোজা পূর্বদিকে একটি সরু সড়ক বেয়ে প্রায় ৩ কিলোমিটার সড়ক পার হলেই দেখা মিলবে এই বাঁশের কেল্লার। বারইয়ারহাট থেকে সিএনজি অটোরিকশাযোগে ভাড়া পড়বে ৪০-৫০ টাকা। আবার ফেনী শহর থেকে ছাগলনাইয়া হয়েও শুভপুর যাওয়া যায় ভাড়া জনপ্রতি ৫০-৬০ টাকা। চাইলে যেকোন সময় ঘুরে আসতে পারেন এই দৃষ্টিনন্দন বাঁশের কেল্লাটিতে। রিসোর্টের দেখাশোনা করেন ম্যানেজার মোজ্জামেল হোসেন- ০১৫৫২৯২৬০০৯। এছাড়া নিরাপত্তার ও অ্যাপায়নের জন্য আরো ছয় জন লোক রয়েছে।


একেএ/এমএস


oranjee