ঢাকা, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

কবি বেঁচে থাকুক সৃষ্টিতে

সৈয়দ নূর-ই-আলম ১:০৯ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৯

কবি আল মাহমুদ। ছবি: সংগ্রহ

কবির সৃষ্টি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে। কবি তাই সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না। আবার সময় ও পরিস্থিতির কারণে অনেক কবি ধর্মীয় কিংবা সাম্প্রদায়িক কবিতা লিখে থাকেন। এটাকে দু’ভাবে ধরা যায়। যদি তিনি জ্ঞানত তা করে থাকেন তবে হয় তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা নয়তো তিনি কপট। জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা একুশ শতকে এসে মানা একটু কষ্টকর। জ্ঞান-বিজ্ঞান যেখানে অতি উচ্চস্তরে আছে এবং আহরণ করাও সহজলভ্য সেই অবস্থান থেকে একজন কবির সাম্প্রদায়িক হওয়া কপটতা ছাড়া অন্য কিছু নয়।  আবার এমন একটা সমাজ কিংবা সময় যা ওই সময়কেই ধারণ করে -এমন অবস্থায় কবির কপটতা হয় না। কারণ সেই সময় থেকে বের হওয়া খুবই কঠিন। যদি কেউ বের হতে না পারেন তাহলে তা দোষের হবে না।

কবি হবে আপনভোলা কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা ছেড়ে দিয়ে নয়। তাইতো তার দেশের রাজনীতি নিয়েও সচেতন থাকতে হয়। তাই বলে কোনো দলের ভাব সদস্য হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাতে নিজের স্বত্ত্বা বাঁচে না। সৃষ্টিও মহান হয় না।

এতো আলোচনা কেন হলো? তার পেছনে একটা কারণ সাম্প্রতিক বিতর্ক। কবি আল মাহমুদের মৃত্যুর পর যেটা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। লোক লোকান্তর (১৯৬৩), কালের কলস (১৯৬৬), সোনালী কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬), আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া’সহ অনেক কাব্যগ্রন্থ তাকে অমর করে গেছে। আবার তার কবিতায় সাম্প্রদায়িক ছোঁয়া স্পষ্ট।

বাংলা কবিতায় ‘আজান’ ‘ফেরেস্তা’ ‘কবুল’ ইত্যাদি ধার্মিক টার্ম ব্যবহার করে বাঙালি মুসলমানদের প্রিয় কবি হয়ে ওঠা আল মাহমুদ আসলে আমাদের চেতনার জগতে মারাত্মক ক্ষতি করেছেন। ক্রমাগত একটি বিশেষ ধর্মের লোকদের তিনি তার কবিতায় উজ্জীবিত করে গেছেন আধুনিক অসাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে।

তাই বলে কি আল মাহমুদের পুরোটাই শেষ। তিনি কি সাহিত্যিক হিসেবে ব্যর্থ। তাকে কি বাংলা সাহিত্যে স্থান দেওয়া যাবে না? এমনটা বলাও ঠিক হবে না। তার লেখনি বাংলা সাহিত্যকে উর্বর করেছে দূর্বল নয়-এটা তার নিন্দুকরাও বলেন। 

 

 

একুশের কবিতা

 

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ

দুপুর বেলার অক্ত

বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?

বরকতের রক্ত।

 

হাজার যুগের সূর্যতাপে

জ্বলবে এমন লাল যে,

সেই লোহিতেই লাল হয়েছে

কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !

 

প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে

ছড়াও ফুলের বন্যা

বিষাদগীতি গাইছে পথে

তিতুমীরের কন্যা।

 

চিনতে না কি সোনার ছেলে

ক্ষুদিরামকে চিনতে ?

রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে

মুক্ত বাতাস কিনতে ?

 

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়

ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,

ফেব্রুয়ারির শোকের বসন

পরলো তারই ভগ্নী।

 

প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী

আমায় নেবে সঙ্গে,

বাংলা আমার বচন, আমি

জন্মেছি এই বঙ্গে।

 

আল মাহমুদের এমন কিছু কবিতা তাকে অমর করে দিয়ে গেছে। যেন কবিতার গায়ে তার নাম খোদাই করা হয়ে গেছে। এই যেমন-

 

কবিতা এমন

 

কবিতা তো কৈশরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান

আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি

পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাই-বোন

আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি--- রাবেয়া রাবেয়া-----

আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট!

 

কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী

কুয়াশায় ঢাকা পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন

পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ

মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠোনে ছড়ানো জাল আর

বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।

 

কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে উঠা অসুখী কিশোর

ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান

চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে

নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্র‍জের কাতর বর্ণনা।

 

কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস

ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর

গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর

কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।

 

আসলে সাম্প্রদায়িক কিংবা দলবাজ কবি- এইদুটো তকমাই কোনো কবির গায়ে থাকা উচিত নয়। অথচ এটা থোড়াই কেয়ার করেন অনেক কবি। সাময়িক সুবিধা লাভ কিংবা মানসিক দৈন্যতার কারণে কবিরা হয়ে উঠেছেন সাম্প্রদায়িক নয়তো দলবাজ। অথচ কবিদের হওয়ার কথা ছিল ঝড়নার মতো স্বচ্ছ আর সুন্দর। কথা ছিল পাঠকদের কবিতার পিপাষা মিটিয়ে সাহিত্যকে ঝরণার মতো সুন্দর ও স্বচ্ছ করে তুলবেন।

আল মাহমুদের বিষয়টা রীতিমতো অস্বস্তিকর। অর্থ্যাৎ তার অবস্থান বিভ্রান্তিকর। ব্যক্তি আল মাহমুদের ভূমিকা যেমন প্রশ্নবিদ্ধ তার রচনায় সেই ছাপ কিছুটা রয়ে গেছে। শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মাইকেল মধুসুদন দত্ত থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের খ্যাতিমান কবি যাদের ব্যক্তিজীবন প্রশ্নবিদ্ধ, তাদের থেকে আল মাহমুদের বিষয়টা একটু ভিন্ন। কবির জীবন যারা কাছ থেকে দেখেছেন তারা মাত্রই জানেন মতাদর্শের দিক থেকে তার পিছল খাওয়ার অভ্যাসের কথা। সাম্প্রদায়িকতা তার সৃষ্টিশীল জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এজন্য তিনি সর্বজন শ্রদ্ধেয় হতে পারেননি। আবার তার কবিতা সম্ভারকে কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। তার রচিত কবিতার বেশীরভাগই বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি হিসেবে মানেন বোদ্ধারা।

 

না ঘুমানোর দল

 

নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল

ডাবের মতো চাদঁ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল ।

ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে এলেম ঘর

ঘুমন্ত এই মস্ত শহর করছিলো থরথর ।

মিনারটাকে দেখছি যেন দাড়িয়ে আছেন কেউ,

পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ ?

 

চৌকিদারের হাক শুনে যেই মোড় ফিরেছি বায় --

কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিল আয় আয় ।

পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লাল দিঘীটার পাড়

এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার ।

আমায় দেখে কলকলিয়ে দীঘির কালো জল

বললো, এসো, আমরা সবাই না ঘুমানোর দল-

পকেট থেকে খুলো তোমার পদ্য লেখার ভাজঁ

রক্তজবার ঝোপের কাছে কাব্য হবে আজ ।

দীঘির কথায় উঠলো হেসে ফুল পাখিদের সব

কাব্য হবে, কাব্য হবে- জুড়লো কলরব ।

 

কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই

পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই ।

 

আল মাহমুদের ব্যক্তিজীবন যেমন সাহিত্য রচনায় প্রভাব ফেলে তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আবার তার রচিত সাহিত্য মান বিচারে তাকে অমর করেছে। এই দুই মিলিয়ে আল মাহমুদকে নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের তৈরী হয়েছে পাঠক ও বোদ্ধাদের মধ্যে। এই দুই শ্রেণি তাকে না ফেলতে পারছেন না পারছেন রাখতে। এই অবস্থার তৈরীর জন্য তিনি নিজেই দায়ী। তাই চিরন্তন বলে একটা কথা আছে, কবিদের রাজনীতি কিংবা ধর্ম বিষয়ে সচেতন থাকতে হয় কিন্তু এগুলোতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতে হয় না। যেটা তার সাহিত্যকেও ক্ষতিগ্রস্থ করবে। তার ব্যক্তিস্বত্ত্বা এমনকী সৃষ্টিকেও বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেবে। তাই আমরা চাই, কবিরা বেঁচে থাকুক সৃষ্টিতে, বিভ্রান্তির মধ্যে নয়।

 


oranjee