ঢাকা, সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯ | ১০ ভাদ্র ১৪২৬

 
 
 
 

ঘুণে ধরা রাজনীতিতে সৈয়দ আশরাফ একটি নির্মোহ দৃষ্টান্ত

সৈয়দ নূর-ই-আলম ৪:১৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৪, ২০১৯

ফাইল ছবি

জাতীয় চার নেতার অন্যতম ও বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। বাবার মতোই তিনিও হয়েছিলেন একজন রাজনীতিবিদ। সৈয়দ নজরুল ইসলাম নেতৃত্বের পর্যায়ে থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সারথী হয়েছিলেন। তার ছেলেও বঙ্গবন্ধুর গড়া দল আওয়ামী লীগের আজন্ম কর্মী হিসেবে দলের নানা দু:সময়ে নিবেদিত প্রাণ হিসেবে সহযোগিতা করেছেন জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনাকে। তিনি ছিলেন দল-মত নির্বিশেষে শ্রদ্ধেয় কেননা তাকে সবাই আপাদমস্তক সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবেই জানতো। তিনি বৃহস্পতিবার (৩ জানুয়ারি) না ফেরার দেশে চলে গেছেন। রেখে গেছেন তাকে নিয়ে আলোচনা করার মতো অনেক অনেক কথা।

ধনী-সম্পত্তির প্রতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কোনো আলাদা টান কখনোই ছিল না। ছিল না ক্ষমতার লোভও। শেখ হাসিনাই বরং জোর করে ক্ষমতায় রেখেছিলেন তাকে। চেয়েছিলেন তার কাছাকাছি বিশ্বস্ত কেউ থাকুক। কেননা তিনি শেখ হাসিনার দুঃসময়ের সহযাত্রী; একজন নির্ভরযোগ্য ও আস্থাভাজন মানুষ ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী (২০০৭) আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে জিল্লুর রহমানের (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি দলের হাল ধরেছিলেন। দলকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে বিতাড়নের যে খেলা তখন চলেছিল, তার বিরুদ্ধেও সোচ্চার ছিলেন তিনি।

সৈয়দ নজরুল ইসলামের সমালোচকরাও তাকে প্রশংসা করতো। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, সৈয়দ আশরাফ যখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়  মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও ঠিকমতো মন্ত্রণালয়ে অফিস করতেন না। গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ঠিকমতো উপস্থিত থাকতেন না। দাফতরিক কাজের ব্যাপারে তার খুব একটা আগ্রহ ছিল না। তবে সমালোচকরা এও বলেন, তিনি ছয় বছরের বেশি সময় এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। আবার কোনো ফাইলও তার দফতরে আটকে নেই। এর একটা রহস্য অবশ্যই ছিল এবং তা হলো তিনি অফিসিয়াল বেশিরভাগ কাজ বাসাতেই করে ফেলতেন। যদিও মন্ত্রীর বাসাকেও অফিস বলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ে তার দফতরে না গেলেও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড মোটেও থেমে থাকেনি। সর্বশেষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বেশিরভাগ সময়েই তিনি অসুস্থ ছিলেন। তারপরেও এই মন্ত্রণালয়ের কোনো ফাইল আটকে থাকার ঘটনা ঘটেনি কিংবা উন্নয়ন কাজ থেমে থাকেনি।

কিভাবে এ কাজটি সম্ভব হয়েছে? কারণ, তিনি যখন যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সেখানে দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন। আর এ কর্মীবাহিনীর বেশিরভাগই ছিলেন তার মতোই সৎ। তিনি তাদেরকে সবসময় কাজের মধ্যে রেখেছিলেন। যদিও তাকে মন্ত্রণালয়ে দেখা যেতো খুব কম কিন্তু প্রতিটি ফাইল যেন আটকে না থাকে এজন্য তার কড়া দৃষ্টি ও নির্দেশনা ছিল বলে তার কাছের মানুষদের কাছ থেকে জানা যায়।

তিনি আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। এই পদে থাকাকালীন তিনি কারো কাছ থেকে বিশেষ সুযোগ নিয়েছেন এমন ঘটনা জানা যায়নি। বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন তিনি। দুর্নীতি করলে কত কত টাকা তিনি অবৈধ উপার্জন করতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। এসময়ে এমন ঘটনা খুবই দুর্লভ। যেখানে রাজনীতিবিদের উপর সাধারণ মানুষের ভরসা দিনকে দিন কমতে শুরু করেছে সেখানে সৈয়দ আশরাফকে তার সহকর্মী থেকে শুরু করে দেশের মানুষ সৎ হিসেবে জানতেন।

স্বাধীনতার সময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে কাণ্ডারির ভূমিকায় ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ (মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন অস্থায়ী সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ)। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে তাঁরা সবচেয়ে আস্থাভাজন মানুষ ছিলেন। তা না হলে স্বাধীনতাযুদ্ধ সঠিকভাবে পরিচালিত হতো কি না সন্দেহ। কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পর কিছু সুবিধাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধুকে ভুল বুঝিয়েছিলেন। তাঁরা দেখলেন, তাজউদ্দীন সাহেব বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকলে তাঁরা সুবিধা নিতে পারবেন না। তাই ষড়যন্ত্র শুরু করলেন এবং বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের দূরত্ব সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেন। সেটাই বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্য কাল হলো।

সৈয়দ আশরাফ গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেছিলেন নিজেই বলেছেন, তার বাবা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেইমানি করেননি। সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। বেইমানি না করে নেতার জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি বলেন, এটাই আমার রক্ত। তিনি এও বলেছিলেন, মন্ত্রী থাকি আর না থাকি, দেশ ও জনগণের জন্য কাজ করে যাবো।

সৈয়দ নজরুল ইসলামের বড় সন্তান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম টানা চারবার কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ অতীতে বেসরকারি বিমান চলাচল ও পর্যটন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ি এবং  এলজিআরডি দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে সবকিছুর বাইরে ২০০৭-০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সংস্কারপন্থিরা যখন আওয়ামী লীগ থেকে শেখ হাসিনাকেই মাইনাস করার অপতৎপরতায় লিপ্ত ছিলেন, সেই ক্রান্তিকালে দলীয় প্রধানের পক্ষে নেতা-কর্মীদের ঐক্য অটুট রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন সৈয়দ আশরাফ।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম যেমন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের উপর অগাধ বিশ্বাস ছিল তেমনি সৈয়দ আশরাফও জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা ছিল অবিচল। মন্ত্রণালয় কিংবা দলীয় বিষয়ে বেশ কয়েকবারই নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ্টি তৈরি হলে তিনি তাদের উদ্যেশ্যে বলেছেন, নেত্রীর প্রতি আস্থা রাখুন। তিনি নিশ্চয়ই আপনাদের হতাশ করবেন না।

 

লেখক: বার্তা সম্পাদক, গ্লোবাল টিভি

এসএনএ


oranjee