ঢাকা, সোমবার, ২৬ আগস্ট ২০১৯ | ১০ ভাদ্র ১৪২৬

 
 
 
 

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর অকালপ্রয়াণে

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৪৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০১৮

কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে ড. তপন বাগচী

ড. তপন বাগচী: কবিতা, ছন্দচর্চা, বানানচর্চা ছাড়াও ছড়া তথা শিশুসাহিত্য রচনাতেও তিনি শীর্ষস্থানীয়। মৌলিক প্রবন্ধ রচনাতেও তার দক্ষতা ঈর্ষণীয়। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ৯৪ বছরে তাঁর মৃত্যুকেও আমি অকালপ্রয়াণ মনে করি। শ্রদ্ধা সতত।

কলকাতার কবি কাজল চক্রবর্তী তার ‘সাংস্কৃতিক খবর’ পত্রিকা একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। তাতে সেই শ্রদ্ধেয় কবিকে নিয়ে আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম। কবিতাটি এখানে তুলে ধরা যায়-
উলঙ্গ রাজার খোঁজে তুমি সেই ছেড়েছিলে গ্রাম/নিভৃত ফরিদপুর তোমাকে ডেকেছে নিরালায়/চশমার আবডালে কতটুকু দৃষ্টি ঢাকা যায়!/কবিতার ক্লাসে ক্লাসে জেগে থাকে সেই পুণ্য নাম।/বরফ যখন গলে তখন তিনটা বাজে, তাই নড়ে বসি/মায়াবী ঘণ্টার ধ্বনিÑনেচে ওঠে তোমার নিবাস/দেখেছি কলকাতার যিশু হেঁটে যায় দলে মুথাঘাস/পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে চান্দ্রাগ্রাম, রক্তের পড়শী।

এটি ছাপা হওয়ার পর কলকাতায় তার সঙ্গে দেখা হয় সাংস্কৃতিক খবর পদক নিতে গিয়ে। কাজলদা ছিলেন অনুষ্ঠানের আয়োজক। নীরেনদা ছিলেন প্রধান অতিথি। তখন এই কবিতা নিয়ে কথা হয়। আমি পা ছুঁয়ে প্রণাম করি। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আশীর্বাদ করেন। এ আমার পরম পাওয়া।

আমার সেই আরাধ্য কবি আমার ৫০তম জন্মদিনে আশীর্বাদ জানিয়েছেন ছোট্ট গদ্য লিখে। এটা আমার জন্য যে কতটা গৌরবের, তা বলে বোঝানো যাবে না। এর পর কলকাতায় ‘সুভাষ পদক’ নিতে যাওয়ার কথা ছিল। যেতে পারিনি। পরে সনদ হাতে এলে দেখি তাতে তার স্বাক্ষর রয়েছে। এটি আমার জন্য বড় স্বীকৃতি বটে।

গত বছর আমাকে নিয়ে তিনি একটা লেখা দিয়েছেন কবি মানিক দে-র মাধ্যমে। লেখাটি এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। তিনি লেখেন- ‘সম্প্রতি কলকাতার কবি মানিক দে সম্পাদিত ‘চোখ’ পত্রিকার উদ্যোগে ‘কবি সুভাষ পদক’ গ্রহণ করতে সে কলকাতা এসেছিল। ওই পদকের সনদপত্রে আমারও স্বাক্ষর আছে। তপন বাগচীকে এই পদক দেওয়ায় আমি খুশি হয়েছি। আমি এই সুযোগে মানিক দে-কে ধন্যবাদ জানাই। তপন বাগচীর সঙ্গে আমার আলাপ এই বছর সাতেক আগে। কবি কাজল চক্রবর্তীর সাংস্কৃতিক খবর কবিতা উৎসবে সে এসেছিল। সেখানেই সে এগিয়ে এসে পরিচয় দেয় ‘রক্তের পড়শী’ বলে। আমার জন্ম ফরিদপুর জেলার চান্দ্রাগ্রামে। তপনও ফরিদপুরের এক নিভৃত গ্রাম কদমবাড়ীতে জন্ম নিয়েছে। সেই সূত্রে একধরনের আত্মীয়তা রয়েছেই। তপন সে বছর ‘সাংস্কৃতিক খবর পদক’ গ্রহণ করতে এসেছিল। কলকাতার পূর্বাঞ্চলীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে তার সঙ্গে অনেক কথা হয়। আমার ‘কবিতার ক্লাস’ আর ‘উলঙ্গ রাজা’ তাকে কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা দিয়েছে, সে কথা সে জানায়। কিছুদিন আগে ‘সাংস্কৃতিক খবর’ পত্রিকা আমার ওপর একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। সেখানে তপন একটি কবিতা লেখে ‘উলঙ্গ রাজার খোঁজে’ নামে। সেই কবিতায় সে আমার পরিচয় এবং কবিতার কিছু পরিচয় তুলে ধরে।’
আমাকে উদ্দেশ করে সে লেখে,‘উলঙ্গ রাজার খোঁজে তুমি সেই ছেড়েছিলে গ্রাম/নিভৃত ফরিদপুর তোমাকে ডেকেছে নিরালায়/চশমার আবডালে কতটুকু দৃষ্টি ঢাকা যায়!/কবিতার ক্লাসে ক্লাসে জেগে থাকে সেই পুণ্য নাম।’ কবিতাটি আমার ভালো লেগেছে। কবিতার শেষ দু’চরণে সে লেখে, ‘দেখেছি কলকাতার যিশু হেঁটে যায় দলে মুথাঘাস/পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে চান্দ্রাগ্রাম, রক্তের পড়শী।’ আমার এই রক্তের পড়শীর সঙ্গে কিছু দিন আগে ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে দেখা হয়। ‘কালি ও কলম’ পত্রিকার একটি অনুষ্ঠানে আমি গিয়েছিলাম। সে বাংলা একাডেমির ডেপুটি ডিরেক্টর। আমার তা জানা ছিল না। চেহারাটাও ভুলে গিয়েছিলাম। সে এগিয়ে এসে পরিচয় দিতে মনে পড়ে। আমাদের ‘কালি ও কলম’ পত্রিকার কলকাতা সংস্করণেও তার লেখা ছাপা হয়েছে। কবিতার পাশাপাশি তপন প্রবন্ধ লেখে, ছোটদের জন্য লেখে। শুনেছি নদিয়ার ‘কথাকৃতি’ এবং ঢাকার ‘দৃষ্টি’ পত্রিকা তার ৫০ বছরে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতে যাচ্ছে। কবি তপন বাগচীর জন্মদিনে আমার আশীর্বাদ রইল। আর সম্পাদকদের প্রতি রইল শুভ কামনা।’
এটি প্রকাশিত হয়েছে বীরেন মুখার্জী সম্পাদিত ‘দৃষ্টি’ পত্রিকায় (২৩বর্ষ, ১৭ সংখ্যা। ২৩ অক্টোবর ২০১৭)। একজন অনুজ কবির প্রতি এমন উদার অভিনন্দন কজন অগ্রজ জানাতে পারেন।

নীরেন্দ্রনাথ ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’র ব্যবহারবিধি ‘কী লিখবেন কেন লিখবেন’ প্রণয়ন করেছেন। প্রিন্টার্স লাইনে খুব ছোট করে তার নাম। অফিসিয়াল দায়িত্ব বলেই হয়তো তার কৃতিত্ব উচ্চকিত হয়নি তেমন করে। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। বানান শিখতে ওই বই আমরা অনেকেই অনুসরণ করি। এই বইটির জন্যও তিনি শ্রদ্ধার আসন পাবেন।

মূলত কবি, পেশায় সাংবাদিক ছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (১৯২৪-২০১৮)। জন্ম বাংলাদেশের ফরিদপুরের চান্দ্রা গ্রামে। কবির শৈশব কেটেছে ফরিদপুরের গ্রামে। তার পর কলকাতা যান উচ্চশিক্ষার জন্য। দেশভাগের পর আর ফিরে আসা হয়নি। তিনি লিখলেন ‘কলকাতার যীশু’ আর চলে গেলেন যিশুখ্রিস্টের জন্মদিনে, এই বড়দিনে।

‘উলঙ্গ রাজা’র (১৯৭১) কবি, ‘অমলকান্তি’র স্রষ্টা, ‘কবিতার ক্লাসে’র লেখক-সকলের প্রিয় কবি আমাদের। আমরা যারা ছন্দের ব্যাকরণ শিখেছি, তা ওই কবিতার ক্লাস পড়ে। এতো সহজে যে ব্যাকরণ শেখানো যায়, নীরেন্দ্রনাথের বইটি না পড়লে তা বোঝা যাবে না। প্রবোধচন্দ্র সেন কিংবা মোহিতলাল মজুমদারের আলোচনা পড়ে ছন্দ শেখা তো কঠিন ব্যাপার। আবদুল কাদির কিংবা শঙ্খ ঘোষের আলোচনা হৃদয়ঙ্গম করাও সহজ নয়। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, উত্তম দাশ, আবদুল মান্নান সৈয়দ পড়ে যতটা শিখেছি, তার ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়েছিলেন নীরেন্দ্রনাথ। আমাদের ছন্দশিক্ষক নীরেন্দ্রনাথকে তাই আভূমি প্রণাম জানাই।

লেখক পরিচিতি : কবি ও উপপরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা

এসএনএ


oranjee