ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৬ ভাদ্র ১৪২৬

 
 
 
 

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত-নিহতদের পরিবারকে সকল রাষ্ট্রীয় সুবিধা দেওয়া হোক

সৈয়দ নূর-ই-আলম ৩:৪২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১১, ২০১৮

ফাইল ছবি

২১ শে আগস্ট ২০০৪। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নারকীয় দিন। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। এতে প্রাণে বেঁচে যান সেসময়ের বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের মহিলা লীগের নেত্রী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারান সেই হামলায়। আহত হন পাঁচ শতাধিক।

কারা এই নারকীয় ঘটনা ঘটিয়েছে-তা জাতির কাছে উম্মোচিত হয়েছে। বুধবার (১০ সেপ্টেম্বর) আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে এই হামলার সাথে জড়িত অপরাধীদের শাস্তি হয়েছে। রায়ে লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ১৯ জনের ফাঁসি ও তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শাস্তি তো হলোই কিন্তু আলোর বাইরে রয়ে গেল সেদিন অর্থ্যাৎ ২১ আগস্ট যারা নিহত ও আহত হয়েছে তারা। তাদের ঘিরে দুটি বিষয় এখন আলোচ্য। একটি হচ্ছে, তারা এই রায়ে সন্তুষ্ট কিনা, আরেকটি খুবই মানবিক দিক। সেটি হলো, সেদিনের সেই হামলায় আহত-নিহতরা যারা তাদের পরিবারের অবলম্বন ছিলেন সেই পরিবারগুলোর আর্থিক দৈন্যে খুবই সঙ্গীন জীবনযাপন করছেন। দলের সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে নিহত ও আহতদের পরিবার এখন সংসার চালাতেই হিমসিম খাচ্ছে-এ খবর কয়জন রাখেন। এদের মধ্যে কারও কারও অবস্থা ভালো হলেও অনেকেরই আবার খুব খারাপ। অথচ প্রকাশ্যে কেউ তাদের এই অবস্থার জন্য সরকার বা কারো কাছে লজ্জায় সাহায্য-সহেযোগিতা চাইছেন না।

সেদিনের সেই নিহত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানের মেয়ে তানিয়া বখতের একটাই দাবি ছিল, তিনি চেয়েছিলেন কঠোর শাস্তি। কিন্তু হামলার মূল হোতা তারেক রহমানের ফাঁসি না হওয়ায় নাখোশ হয়েছে তিনি। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন, তার আম্মা মারা গেছেন সেই হামলায়। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন হামলার অপরাধীদের আদালতের মাধ্যমে বিচার করার জন্য। তিনি আবার নাখোশও হয়েছেন তারেক রহমানের ফাঁসি না হওয়ায়। সংবাদমাধ্যমে তিনি তার এই অনুভূতি জানিয়েছেন।

২১ শে আগস্টে সেই হামলায় যারা নিহত বা আহত হয়েছেন তাদের পরিবারের সবাই তারেক রহমানের ফাঁসি দাবি করেছিলেন। কিন্তু তা না হওয়ায় প্রায় সবাই নাখোশ হয়েছেন। তবে এও জানিয়েছেন হামলার অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সরকার নজির সৃষ্টি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত শাস্তিও হয়েছে সবার। এখন তাদের সবারই দাবি, দ্রুত শাস্তি যেন কার্যকর হয়। যারা পলাতক আছে তাদেরকে ফিরিয়ে এনে শাস্তি দেওয়া হয়।

একটি বিষয় আলোচনা করা দরকার, তা হলো, ২১ আগস্ট হামলার নিহত আহতদের বর্তমান অবস্থা। এক কথায় ভালো নেই তারা। এই পরিবারগুলোর অনেকেরই একমাত্র অবলম্বন ছিলেন নিহত-আহতরা। আর্থিক উপার্জনে তাদের এই অনুপস্থিতি খুবই ভোগাচ্ছে তাদের। অসহায় জীবন যাপন করছেন তারা।

২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহসম্পাদক মোসত্মাক আহমেদ সেন্টু ছিলেন একজন। তার স্ত্রী আইরিন সুলতানা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সেন্টুর মৃত্যুর পর দলের পক্ষ থেকে তাকে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। সেই বেতনেই ছোটভাই ও একমাত্র সন্তান হৃদিকে নিয়ে রাজধানীতে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছেন আইরিন সুলতানা। সংসারে টানাটানি থাকলেও  সেন্টুর রেখে যাওয়া একমাত্র সন্তানকে অবলম্বন কোনোরকমে বেঁচে আছেন তিনি।

রত্না আক্তার রুবী। ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় প্রায় ৫০টি স্প্লিন্টার এখনও শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন ৩৮ বছর বয়সী এই নারী। অসুস্থতার প্রয়োজনে প্রতি মাসে ইনজেকশান এন্টিবায়োটিক বাবদ খরচ করতে হচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। ঘটনার পর আর্থিক সাহায্য যা পেয়েছিলেন তা চিকিৎসাতেই ব্যয় হয়েছে। স্বামীর ব্যবসায়ের আয়ে সংসার চলে রুবির। বর্তমানে চরম দুঃসহ দিন পার করছেন রুবি।

শুধু রুবিই নয় এমন শত শত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী স্প্লিন্টারের আমৃত্যু যন্ত্রণা শরীরে বয়ে চলেছেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। এই নেতাকর্মীদের অনেকেই তাদের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন বিধায় গত কয়েকবছরে আর্থিক দৈন্যে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন।

পুরান ঢাকার মাজেদ সরদার রোডে বাস করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেত্রী রাশেদা আক্তার রুমা। শরীরে ক্যান্সার বয়ে বেড়াচ্ছেন। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা যে ট্রাকে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সেই ট্রাকের পেছনে ছিলেন তিনি। সংবাদমাধ্যমকে রুমা জানিয়েছেন, এখনও তার শরীরে প্রায় দুই হাজার স্প্লিন্টার রয়েছে। গ্রেনেডের আঘাতে ১৮টি দাঁত পড়ে যায় তার। ডান পা পচতে পচতে হাড়ে লেগেছে। এখন পচতে শুরু করেছে বাম পা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া অর্থসহ স্বামীর অর্থে চিকিৎসা চালাচ্ছেন তিনি।

বর্বরোচিত সে গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এস এম কামাল হোসেন এখনও ১০ থেকে ১২টি স্প্লিন্টার শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন। আর্থিক দৈন্যের মধ্যে না থাকলেও তিনি রায়ে দেওয়া শাস্তি দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন।

লিটন মোল্লা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন তিনি। অসুস্থতার কারণে অকর্মণ্য হয়ে পড়েছেন তিনি। পরিবার ও স্বজনদের সহায়তায় এবং প্রধানমন্ত্রীর দেয়া আর্থিক সহযোগিতায় কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছেন তিনি। আবার এই টাকার বেশির ভাগ চলে যাচ্ছে চিকিৎসা খরচে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় প্রাণে বেঁচে গেলেও শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার বয়ে বেড়াচ্ছেন নাজমুল হাসান নাজিম। স্প্লিন্টারের যন্ত্রণার মতোই ১৪ বছর আগের গ্রেনেড হামলাকারীদের এখনো বিচার না হওয়া তাকে কষ্ট দেয়। এই রায়ে তিনি খুশি হয়েছেন বলে জানান।

তিনি জানান,  ওই ঘটনার পর তো পঙ্গুর মতো হয়ে গিয়েছিলাম। এখন কিছুটা ভাল হলেও ব্যথা রয়েছে। শরীরে যেসব স্প্লিন্টার রয়েছে সেগুলো অপারেশন করে বের না করলে এ যন্ত্রণা থেকেই যাবে। সেজন্য আরও চিকিৎসা প্রয়োজন।

তবে ভারতে চিকিৎসা ছাড়াও দেশে ফিরে আরও কয়েকদফা চিকিৎসা করতে গিয়ে আর্থিক চাপে রয়েছেন বলে জানান তিনি।

উল্লেখ করা এদের মতো আরও অনেকেই সেই গ্রেনেড হামলায় আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করছেন। তাদের পরিবার একমাত্র অবলম্বন সামর্থ হারিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের শাসন ১০ বছর পেড়িয়েছে। দলের সভানেত্রী ও প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে নিয়ে গেছেন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পথ চলার সেই কর্মীরা যারা গ্রেনেড হামলার নিহত হয়েছেন এবং যারা বেঁচে গিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছেন তাদের সংসার চলছে নিদারুণ কষ্টে। তাদের জন্য কি কিছু করা যায় না? সরকারি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদেরকে কি এই দুঃসহ অবস্থা থেকে রক্ষা করা যায় না?

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞজন। তিনি প্রদীপের বাইরে থাকা ক্ষতিগ্রস্থ নিহত ও পঙ্গুত্ববরণকারীর পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন, এটাই প্রত্যাশা মাদার অব হিউম্যানিটির কাছে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, গ্লোবাল টিভি

এসএনএ


oranjee