ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯ | ২ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

বদলে যাবে পতাকা, দেশ হবে অঙ্গরাজ্য

কাশ্মীরের পুনর্গঠনের অপেক্ষায়

গ্লোবালটিভিবিডি ১:১৭ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৭, ২০১৯

সংগৃহীত ছবি

উম্মুল ওয়ারা সুইটি : জম্মু ও কাশ্মীর আর বিশেষ মর্যাদায় থাকছে না। ৩৭০ ধারা বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতোই কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়বে কাশ্মীরে। বদলে যাবে তাদের পতাকা আর থমকে যাবে বিশেষ সুবিধা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হওয়ার লড়াই।

দীর্ঘ এই স্বপ্ন ভ্রমণের পরিণতি এখনো বিতর্ক মুক্ত হয়নি। এই উপত্যকায় দুই রাজ্য হবে হয়তোবা। হয়তোবা কী? হয়েই যাবে। কাশ্মীর পুনর্গঠনের অপক্ষো করবো।

উন্নয়নের রোডম্যাপ তৈরি হবে, ভবন হবে। বাণিজ্যে প্রসার আসবে। শিশু-কিশোরেরা এক ছাতার নীচে এসে বলবে, বন্দে মাতরম, বন্দে মাতরম। ভারতীয় নাগরকিদরে সঙ্গে মিশে একাকার হবে ক্ষুদ্র বিশেষ সুবিধা পাওয়া জম্মু-কাশ্মীর। বড় দেশের অংশ হবে, চরিত্র পাল্টাবে। জমির দাম বাড়বে। নতুন নতুন মহাজন আসবে এবং কর্মসংস্থান হবে কতগুণ! আজ হোক কাল হোক একটা ফয়সালা তো হতেই হবে। আগে ভাগে হলে ভালো। পাকিস্তান-ভারতের যাঁতাকলে আর কতো?

যাই হোক না কেন, বিষয়টা এতো সহজ হবে না। আমি রক্তপাত চাই না। আপনিও না, আমরা কেউ না। তবু হবে। পতাকা আর সেমি স্বাধীনতার পোকা সহজে সরানো যাবে কি সেই কিশোর আর তরুণদের মাথা থেকে? একা এক বিশেষ মানে অন্যরকম নিয়মের দেশে, সেখানে আপনি কে ভাগ বসাবেন? আপনাকে তো মোড়লই মনে হবে।

হুম মি. নরন্দ্রে মোদী। আপনি সত্যি ম্যাজিশিয়ান। ভোটের আগে কথা দিয়েছেন, কথা রাখছেন। তবে কোনো রক্তপাত নয়। হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্ত না নিলে কি ক্ষতি হতো? আমি যতদূর জানি, স্বায়ত্তশাসনরে বাইরে কাশ্মীর হর্তাকর্তারা তো ভারতের বাইরে যেতে চায়নি। পাকিস্তান ওঁত পেতে থাকলওে তাদের পক্ষে নেই এই দুই উপত্যকার অধিবাসীরা।

২০১৯ সালরে ৫ আগস্ট কাশ্মীরিদের জন্য কেমন দিন হবে, পরবর্তী দিনগুলো কিভাবে যাবে, সেই প্রশ্নই আজকে ঘুরপাক ভারতীয়দের কাছেও। ৩৭০ ধারা রহিতের ঘটনায় ভারতীয় সংসদে তুলকালাম কান্ড ঘটে গেছে। কংগ্রেসে মোদী সরকাররে এই ঘোষণায় অন্য গন্ধ দেখছে। কেউ কেউ বলছে, মুসলিম-প্রধান কাশ্মীরের চরিত্র বদলানোই মূল লক্ষ্য। এর মধ্য দিয়ে মুসলিম-গরিষ্ঠ কাশ্মীরের ‘ডেমোগ্রাফি’ বা জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলে যাবে।

সাত দশকের অভ্যাস থেকে এই উপত্যকাবাসীকে ভারতের সংবধিানে ফিরতে হবে। যদিও ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় পাকিস্তানের পাশে না থেকে ভারতকেই সমর্থন দিয়েছিল সেই সময়ের কর্তারা। এই সমর্থন দেয়ার বিষয়টাও ৩৭০ ধারার মধ্যইে নিহিত রয়েছে। আজকরে এই পর্যায়ে এসে জম্মু-কাশ্মীরের নেতারা বলছেন, ভারতকে সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। তবে তারা এটাও বলছেন না, তাদের পাকিস্তানকে স,র্থন দেয়া ভালো ছিল।

এখনো জম্মু-কাশ্মীরে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত দুই সপ্তাহে এই উপত্যকা অঞ্চলে হাজার হাজার ভারতীয় সেনা প্রবেশ করেছে। বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা। জায়গায় জায়গায় জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা ও কারফিউ।

অবশ্য ২০১৫ সাল থেকেই প্রস্তুতিটা চলছে। প্রথমত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল কাশ্মীরের জন্য যে 'ডোভাল ডকট্রিন' ফর্মুলেট করছিলেন, সেই অনুযায়ীই আগাচ্ছে। তার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনাই ছিল ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে লোকজনকে কাশ্মীরে এনে বসত করানো। ৩৭০ সেখানে একটা বিষফোঁড়া। বিজিপি সেই ফোঁড়াটা কেটেছে। এখন যদি ইনফেকেশান না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ডোভালের ডকট্রিনে ছিল, কাশ্মীরে হিন্দু পন্ডিতদের জন্য আলাদা কলোনি স্থাপন, কাশ্মীরে শিল্পাঞ্চলে জন্য বাকি ভারত থেকে শিল্পশ্রমিকদের এনে বসতি গড়া কিংবা ভারতীয় সেনার সাবেক সদস্যদের এনে কাশ্মীরে জমি দেওয়া।

বিগত সাধারণ নির্বাচনের আগে বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও সংবধিানের ৩৭০ ধারা ও আর্টিকল ৩৫-এ বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরাসরি ঘোষণা দিয়েছিল, ভোট দিয়ে জেতালে কাশ্মীরে জমিজিরাত কিনতে পারবেন আনায়াসে।

আজ শুধুই কাশ্মীর র্চচা। সমঝদারদের কথা, সীমান্তবর্তী রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর এমন একটি প্রদেশ, যার সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি সবই বাকি দেশের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এই রাজ্যে বৌদ্ধ ও মুসলিমরা থাকেন, কাশ্মীরে থাকেন মুসলিম, পন্ডিত ও শিখরা। আর জম্মুতে জনসংখ্যার ষাট শতাংশ হিন্দু, আর বাকি চল্লিশ শতাংশ মুসলিম। ৩৭০ ধারা এই সংস্কৃতিকে বেঁধে রেখেছে।

এর মধ্যেই কথা উঠেছে, ইসরায়েলে এতদিন যা ফিলিস্তিনি-অধ্যুষিত অঞ্চলে করেছে অথবা চীনও করেছে তিব্বতে - সুন্নি মুসলিম-গরিষ্ঠ কাশ্মীরেও তাই হলো। অনুচ্ছদে ৩৭০-এ ভারতীয় রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরকে নিজেদের সংবিধান ও একটি আলাদা পতাকার স্বাধীনতা দেয়। এছাড়া পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়াদি, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগ বাদে অন্যান্য সব ক্ষেত্রে স্বাধীনতার নিশ্চয়তাও দেয়।

এই ৩৭০ ধারাটি ভারতের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর। ১৯৫৪ সালে এর সঙ্গে ৩৫ -এ ধারা যুক্ত করা হয়। এই দুই ধারা বলে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতীয় সংবধিানের আওতাভুক্ত রাখা হয় (অনুচ্ছদে ১ ব্যতিরেকে)। অর্থৎ সারা ভারতে যে সংবিধান বলবৎ ছিল জম্মু-কাশ্মীরের ক্ষেত্রে তা ছিল ভিন্ন।

ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাশ্মীরের পুনর্গঠনের প্রস্তাবগুলো এখন সংসদের উভয় কক্ষের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। । এর আগে সংবিধানের ৩৫-এ অনুচ্ছেদের সুবাদে জম্মু ও কাশ্মীরে যারা 'স্থায়ী বাসিন্দা' ছিলেন, শুধু তারাই সেখোনে জমিজমার মালিক হতে পারতেন। এখন যে কেউ ঐ রাজ্যে গিয়ে জমি কিনতে পারবে। এর আগে কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য রাজ্য সরকারের চাকরিগুলো নিশ্চিত করা ছিল। এখন ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে প্রার্থীরা কাশ্মীরে সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারবেন। এর বাইরে ভারতের দণ্ডবিধি কিংবা স্থানীয় পেনাল কোড-এর ভবিষ্যৎ নিয়েও কেন্দ্রীয় সরকার কিংবা সংসদকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রথা থাকবে কি না, সেটার প্রশ্নেও সিদ্ধান্ত নেবে ঐ দুটি প্রতিষ্ঠান।
এবার দেখা যাক- ৩৭০ ধারায় কি কি সুযোগ-সুবিধা পেতেন কাশ্মীরের নাগরিকেরা-

১) জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দাদের দুটি নাগরিকত্ব থাকে।

২) জম্মু-কাশ্মীরের রাষ্ট্রীয় পতাকা আলাদা।

৩) জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভার কার্যকাল ৬ বছরের, যা অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে ৫ বছরের হয়ে থাকে।

৪) এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের ভিতরে ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকার অপমান করা অপরাধ নয়।

৫) জম্মু-কাশ্মীরের কোনো মহিলা ভারতের ২৯ রাজ্যের মধ্যে ২-৩টি ছাড়া বাকি রাজ্যর পুরুষের সঙ্গে বিবাহ করলে ওই মহিলার জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিত্ব সমাপ্ত হয়ে যায়।

৬) ঠিক একইভাবে ভারতের অন্য কোনো রাজ্যের কোনো মহিলা জম্মু-কাশ্মীরের কোনো বাসিন্দাকে বিয়ে করলে তিনি জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিকত্ব পেয়ে যান। এমনকি পাকিস্তানি কোনো নারী জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিককে বিয়ে করলেও তার সমস্যা হয় না। সে কশ্মীরের নাগরিকত্ব পায়।

৭) ৩৭০ ধারার বলে ভারতের সংবিধানের কোনো ধারা জম্মু-কাশ্মীরে কার্যকর হয় না।

৮) জম্মু-কাশ্মীরে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার আইন নেই।

৯) ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা আদেশ জম্মু-কাশ্মীরে প্রয়োগ হয় না।

১০) জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দারা ভারতের কোথায়ও জমি কিনতে পারেন না।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক


oranjee