ঢাকা, সোমবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

নূর সিদ্দিকীর গল্প- করম আলীর বেঁচে থাকা

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:২৪ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৮

সংগৃহীত ছবি

নূর সিদ্দিকী: একটুখানি আহা বা উহু বলে ছেড়ে দিলে আজকের এই গল্পের জন্ম নাও হতে পারতো। যদিও তাতে করম আলীর ভাগ্যের খুব পরিবর্তন হতো না। কারণ যে গ্রামে তার মন টেকেনি কোনোদিন সেই গ্রামেই যে তিনি আবার ফিরে যেতেন তাও বলা মুশকিল। শহুরে অনেকের কাছেই গ্রাম মানেই একটা ছবির মতন ব্যাপার। আহারে আমার ছবি! গোটা পঞ্চাশেক বাড়ি আর পেটে কৃমিওয়ালা বাচ্চা ছেলেদের মত দেখতে একটা খাল আর তার পাশে ফসলি মাঠ নিয়েই গ্রাম। ছবির মতই তো নাকি?

গল্প পড়ে অনেক কিছুই ছবির মতন মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। করম আলীদের সেই গ্রামের বাড়িগুলো থেকে যখন দুপুর কিংবা রাতে বাচ্চা ছেলে মেয়েদের কান্নার সুর ভেসে আসতে থাকে তখন আর সেই গ্রামের ছবি (বা চলচ্চিত্র) কারও ভাল লাগার কথা নয়। এখানে প্রশ্ন করতে পারে বাচ্চারা তো কান্না করবেই, দুধ খাওয়ার জন্য কান্না করাই তাদের কাজ, কথা ঠিক। কিন্তু বাচ্চাদের মুখে দুধের নহরটি জারি রাখার জন্য মায়ের স্তন যতটা টান টান থাকার কথা তা কিন্তু নেই ওই গ্রামে।

ঘরের বউয়ের বুক শুকিয়ে যাক আর বাচ্চারা কান্নাকাটি যতই করুক, গ্রামের পুরুষদের তাতে খুব আগ্রহ নেই। কারণ তারা দিনের বেশিরভাগ সময় কাটায় শাকিব খান আর অপু বিশ্বাসদের সঙ্গে। আধাবেলা কাজের পর আর ঘরে বসে বউ বাচ্চার ঘ্যান ঘ্যানানি না শুনে বাজারের চায়ের দোকানে বসে এককাপ চায়ের দামে ২/৩টা সিনেমা দেখে ফেলাই ভালো বলে মনে করে তারা। এইরকম একটা আনন্দ বিনোদনের গ্রামে করম আলীর মন টেকে না। তার মন চায় শহরে যেতে।

করম আলীর বিবেচনায় গ্রামের মানুষগুলো একবেলা কাজ শেষে চায়ের দোকানে বসে যে বিনোদন সঞ্চয় করে তার চেয়ে বেশি বিনোদন ঢাকা শহরে চব্বিশ ঘন্টাই চলতে থাকে। আগে যে কয়বার তিনি ঢাকায় গিয়েছেন ততবারই নতুন নতুন ঘটনা, নতুন নতুন দৃশ্য তার চোখের মধ্য দিয়ে মনের ভিতরে জমা হয়েছে। তবে প্রথমবারের কথা তার খুব মনে পড়ে- বিজয় স্মরণীর রাস্তায় তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। যাবেন তেজগাঁও তিব্বতের দিকে। পুরান এয়ারপোর্টের পাশের রাস্তায় যেখানে একটা উড়োজাহাজ ফিট করে রাখা হয়েছে সেখান থেকে তিনি হেটে মাত্র বিজয় স্মরণীতে এসেছেন। রাস্তা পার হতে যাবেন এমন সময় কে যেন তাকে কলার ধরে ফুটপাথে ফেলে দিলো। পড়া অবস্থায় পাশে দাঁড়ানো পুলিশটিকে খুব বড়ো মনে হলো। তাই পুলিশটিই তার কলার ধরেছেন এবং ঠিকই করেছেন, তাও তিনি ভেবে নিলেন। কিন্তু চারদিকের দৃশ্য দেখে করম আলী ধান্ধায় পড়ে গেলেন- ২মিনিট আগেও তো সব গরম গরম ছিল। কন্ডাক্টরদের- এই ফাঙ্গেট (ফার্মগেট) ফাঙ্গেট ফাঙ্গেট ফাঙ্গেট, এই মাকালি (মহাখালি) মাকালি মাকালি ইত্যাদি ডাক সে শুনেছে। এরপর করম আলী কিছু বুঝে ওঠার আগে অথবা উঠে দাঁড়ানোর আগেই প্রচণ্ড হুইসেল বাজিয়ে চারটা মোটর সাইকেল চলে গেলো। করম আলী ভাবলেন- মোটর সাইকেলের প্রতিযোগিতা হচ্ছে তাহলে, বাহ ভাল। কিন্তু দর্শক কোথায়? এরপর চলে গেলো আরও মিনিট পনেরো সময়। আবারও সেই নিরবতা। আর মাঝে মাঝে পুলিশের বাঁশি ফুকান্তিসের সঙ্গে এরওর কলার ধরে হেচকা টান মেরে পেছনে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য চলতে থাকলো। এরপর আর খুব বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না, বিশাল গাড়ির বহর আরও তীব্রতায় সাইরেন বাজিয়ে চলে গেলো দুই কি তিনবার চোখের পলক ফেলতে ফেলতেই। কিন্তু কার জন্য এই ক্ষণিক হরতাল আয়োজন বা কে চলে গেলেন এমন গতিতে তা নিজে থেকে করম আলী জানার চেষ্টাও করলেন না। তবে অজানাও থাকলো না বিষয়টা। করম আলীর মতো গলাধাক্কা খাওয়া এক পাবলিক রাগে দু:খে বাতাসে দুইটা লাত্থি মেরে বললেন- দ্যাশটা খালি পরধানমন্ত্রীর, আমরা সবাই কুত্তার বাচ্চা। এমন দৃশ্য কোনোদিন কোনোকালে করম আলীর গ্রামের মানুষ দেখবে না। দেখতে পারবেও না। কারণ তারা ছবির মতন গ্রামে ছায়াছবিময় জীবন কাটাতে ভালবাসে।

দুই ভূবনের দুই রঙের জীবনের অল্পস্বল্প যেহেতু করম আলীর জানা আছে, তাই আহা বা উহুরে বলে সেদিন করম আলীর অন্যদের মতই চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করম আলী তা না করে একখান গল্পের জন্ম দিয়ে গেলেন।

করম আলীদের সেই ছবির মতন গ্রামের অবস্থা তখন খুব খারাপ। মাঠের ধান চলে গেছে জমির মালিকদের ঘরে। ফলে গ্রামের কামলা খাটা মানুষগুলোর তখন সকাল সকালেই বাজারে যাওয়ার ঝোঁক। হাতে কাজকাম না থাকলে যা হয় আর কি। পান্তাটা খেয়ে এক হাতে কেরসিনের বোতল আর অন্যহাতে ফুটোওয়ালা বাজারের ব্যাগ অথবা খালই নিয়ে সবাই বাজারে যায়। দুপুর গড়িয়ে গেলে যখন ক্ষুধায় আর চায়ের দোকানে সোজা হয়ে বসার জো থাকে না তখন লোকগুলো মানে কামলাখাটারা বাড়িতে ফেরে। বাড়িতে ফিরলেও কারও কারও সেই ফুটোওয়ালা ব্যাগ অথবা খালইয়ে কেবল বাতাস খেলা করে। ল্যাজ নাড়ানো শোল বা বোয়াল দূরে থাক মরা টেংরাপুটিরও গন্ধ ব্যাগ থেকে বের হয় না। পকেট ভর্তি করে বাতাস নিয়ে গেলে ব্যাগ খালি থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের সেই করম আলীরও তখন দুই বেলা বাজারে বসে থাকার অবসর। তবে তার মাথায় ঢাকা শহরের বাত্তি দেখার যে ভুত বসে গুনগুন করে গান করতো সেই ভুতের খুব বেশিদিন লাগেনি তাকে গ্রামের বাজার থেকে বড় সড়কে মানে হাইওয়েতে টেনে নিয়ে আসতে।

সকালে বৃদ্ধ মা যখন নিত্যকার মত শ্বাসের টান উঠে হাসফাঁস করছে তখন করম আলীর চিন্তা উদয় হয়- অ্যামনে অ্যামনে আর কয়দিন। টাউনে না গেলে পকেটের বাতাস বাজার ঘুরে আর মুখের খাবারের সংস্থান করতে পারবে না। ফলে করম আলী শহরমুখী হন। বাসস্ট্যান্ড এসে পছন্দসই বাসের জন্য তাকে খানিকটা অপেক্ষাই করতে হলো। কারণ যেকোনো বাসে উঠে পড়লেই সব্বোনাশ- ভাড়া বাবদ যা নেবে তাতে ঢাকায় গিয়ে শেষতক না খেয়ে থাকতে হতে পারে। করম আলীকে নেবার জন্য অবশেষে পাটুরিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে আসা একটি বাস থমকে দাঁড়ায়। করম আলীও সুযোগটা লুফে নেন, তবে তার আগে ভাড়া মিটিয়ে নিতেও কার্পণ্য করেন না। মাত্র ২০ টাকা ভাড়ায় তিনি বাসের ছাদে উঠে পড়েন। ছাদে উঠলে পাছার নিচে নরম গদি পাওয়া যায় না, কিন্তু তাতে করম আলীর মনে কোন আক্ষেপ তৈরি হয় না, কারণ- করম আলী কখনো নরম গদির সিটে বসে ঢাকায় যায়নি।

ছাদের লোহার রডের ওপর বসে ঘন্টা দুই ভ্রমণের পর করম আলী গাবতলীতে পৌঁছে একধরণের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। এই শহরে সাত দিন থাকতে পারলে আর হাত পায়ের ওপর ভরসা রাখতে পারলে মোটামুটি কিছু টাকা তার পকেটে যাবেই, ভিক্ষা করতে হবে না, গতরে খাটার কাজ এই শহরে অনেক। এই কথাগুলো কেবলি করম আলীর নিজের। গ্রাম ছেড়ে শহরে থাকার শক্তি এই কয়েকটি কথা। করম আলী এর আগেও যতোবার শহরে এসেছেন ততোবারই এসব ভেবেছেন।

টেকনিক্যাল মোড়ে এসে বাস থেকে নামেন করম আলী। কোথাও যাওয়ার তাড়া যেমন নেই, তেমনি নেই নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্যও। ফলে বাস থেকে নামা আর বাসে বসে থাকার মধ্যে কোনো ফারাকও নেই তার কাছে। তবুও নামতে হলো, সবাই নেমে যাচ্ছে বলে।

করম আলীর খুব ক্ষুধা পেয়েছে। বাসের ঝাঁকুনিতে পেটের সব দানাপানি গলে গেছে, খুব হিস্যুও পেয়েছে। হিস্যু না করলে এক গ্লাম পানিও তিনি গিলতে পারবেন না। কিন্তু শহরে হাগা-মুতার জায়গার খুব অভাব। কোনো দিকে বসে বা দাঁড়িয়ে কাজটা করা যায় না, চারিদিকে খালি মানুষ আর মানুষ। হয় রাস্তার মানুষ, নাহয় বিল্ডিংয়ের জানালা বা ছাদে মানুষ। কিন্তু উপায় নাই। কিছু একটা করতে হবে। এসময় করম আলী দেখেন বাঙলা কলেজের দিকের রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা জটলা। সেখান থেকেই হইহই লাগ লাগ ইত্যাকার আওয়াজ ভেসে আসছে।

করম আলী সেই জটলার কাছে গিয়ে মুত্রত্যাগ করারও সমাধান পেয়ে যান। জটলার পেছনে যে দেয়াল সেখানে করম আলীর আগে অনেকেই মুত্রত্যাগ করে মোটামুটি ছোটখাটো বুড়িগঙ্গা বানিয়ে রেখেছে। তারপরও করম আলী নিজের সম্মান রক্ষায় যতটা সম্ভব ঢেকে রেখে কাজটা শেষ করেন।

করম আলী যখন জটলার একজন হয়ে ওঠেন তখনই আসলে আহা উহু করার ঘটনাটা ঘটলো। খেলা দেখাতে দেখাতে বানরওয়ালা হঠাৎ বুকে হাত দিয়ে পড়ে গেলো। খেলাও প্রায় শেষের দিকেই ছিলো। বানর যখন থালা হাতে সবার কাছে গিয়ে টাকা চাইবে তখনই লোকটার বুকে ব্যথা উঠলো। ফলে বানরের খেলা দেখে পয়সা না দিয়ে পালানোর এটাই সুযোগ ভেবে চলে গেলো অনেকেই। তবে কেউ কেউ যাবার সময় আহা-উহুটা করে গেলো। আহা-উহু করতে তো আর পয়সা লাগে না। কিন্তু করম আলী আহা-উহু না করে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলেন। দৃশ্যটা বেশ করুণ। বানরওয়ালা বুকে হাত দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। বানরটা দুই হাত মাথায় দিয়ে মরে যাওয়ার অভিনয় করে যাচ্ছে। আর আমাদের সেই ছবির মতন গ্রাম থেকে আসা করম আলী নিশ্চল পাথরের মত দাঁড়িয়ে। কি করবে ভেবে পাচ্ছিলেন না করম আলী। এসময় বানরটাই তার করণীয় নির্ধারণ করে দেয়। করম আলী দেখতে পায় বানরটা তাকে হাত ধরে টানছে, বানরওয়ালাকে টেনে তুলতে বলছে। এরপর আর করম আলীর আহা উহু করে পালানোর কোনো সুযোগ থাকে না।

বানরওয়ালার ঝোলা থেকে পানি বের করে লোকটার চোখে মুখে ছিটিয়ে দেন করম আলী। লোকটা কিছুটা সুস্থ্যবোধ করলে করম আলী একটা রিক্সা ডেকে বানরওয়ালাকে পাশে বসিয়ে মাজার রোডের দিকে রওনা হন। বানরটা তখন করম আলীদের পায়ের কাছে বসা।

মাজার রোডের একটা ঝুঁপড়ি ঘরের সামনে এসে রিক্সা থামে। ঝুঁপড়িতে একটা মাত্র রুম। সেখানেই বানর আর তার মালিকের ওম ভাগাভাগি করে থাকার ব্যবস্থা, বুঝে ফেলেন করম আলী। ঘরে পৌঁছে বানরওয়ালা কিছুটা স্বস্তি পায়। বলে- অনেকদিন ধরে তার বুকে ব্যথা করে মাঝে মাঝে। তখন আর জ্ঞান থাকে না। করম আলী গলির মাথার একটা ওষুধের দোকান থেকে গ্যাসট্রিকের ওষুধ নিয়ে আসে। করম আলীর কোন গন্তব্য নেই জেনে বানরওয়ালা লোকটা আশ্বস্ত হয়। কিন্তু ঘরের মধ্যে বানরের বোঁটকা গন্ধ করম আলীর ভাল লাগছিল না। তবে উপায়ও ছিলো না বের হয়ে আসার, তাছাড়া এই সন্ধ্যায় সে যাবেই বা কোথায়। তারচেয়ে এখানেই যদি রাতটা কাটানো যায় তো মন্দ কি।

পরদিন সকালে বানরওয়ালা আবার খেলা দেখাতে যাওয়ার উদ্যোগী হলে করম আলী তাতে আপত্তি করেন। করম আলী বলেন- আপনের যে শরীলের অবস্থা মতলেব ভাই, যাইয়েন না। তার চাইয়া আমি বরং হামদু মিয়ার গেরেজে গিয়া দেহি রিস্কা পাই নাহি। সারাদিন চালাইলে দুই আড়াইশ লইয়া আইতে পারুম।

করম আলীর কথায় মতলেব মিয়া আন্তরিকতা খুঁজে পায়। বানরের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে-আপনে কিডা ভাই কনতো, আপনে কি ফিরিশতা। বান্দরের খেলা দেহাই বইলা কেউ ঘরেই ঢুকবার দ্যায় না আর আপনে আমার ঘরে থাকলেন, খাইলেনও।

মতলেব মিয়ার আবেগ আর বাড়তে না দিয়ে করম আলী বলেন- আপনে ঘরে থাহেন, সইন্ধ্যাকালে দেহা অইবো। বলে করম আলী বের হয়ে যান। ঘরের মধ্যে মতলেব মিয়া আর তার প্রিয় বানর ও ডুগডুগি। মতলেব মিয়া বানরের সঙ্গে কথা বলেন- কিরে আমি কি আর খেইল দেহাইতে যাইতে পারমু? বানর হ্যাঁ বোধক মাথা ঝাঁকায়। মতলেব মিয়া খুশি হয়। কিন্তু খুশিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না আবার বুকে ব্যথা অনুভব করে। বানরটাই একগ্লাস পানি এগিয়ে দেয়। মতলেব মিয়ার দুই হাত গ্লাসের দিকে না গিয়ে বুক চেপে ধরতে বাধ্য হয়। ব্যথা বাড়লে মতলেব মিয়ার পায়ের ধাক্কায় অ্যালুমিনিয়ামের গ্লাসটি মেঝেতে পড়ে যায়। বানরটি যা বোঝার বুঝে গেছে। ফলে একবার মনিবের মাথার কাছ আবার পায়ের কাছে সে দ্রুত চলতে থাকে। মনিবকে জড়িয়েও ধরে থাকে বানরটি। ঘরের দরজার সামনে গিয়ে বাইরের মানুষের মনযোগও আকর্ষণ করে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দারা বানরের এমন আচরণ দেখে দেখে অভ্যস্ত বলে কেউ এগিয়ে আসে না। অথচ কেউ একজন যদি বানরটির চোখের দিকে তাকাতো তবে সেখানে মনিব হারানোর সংবাদটিই দেখতে পেতেন টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজের মত।

এদিকে, করম আলী হামদু মিয়ার গ্যারেজে গিয়ে খুব সুবিধা করতে পারেননি। ক’দিন আগে হামদু মিয়াকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে নকল নাম্বারপ্লে তৈরির অভিযোগে। করম আলীর খবরটা পাওয়ার পর মনে হয়েছে হামদু মিয়ার ব্যবহার খারাপ কিন্তু তাই বলে হাজতে যাওয়ার মত খারাপ মানুষ তিনি নন। গ্যারেজের ম্যানেজার লোকটি নতুন এসেছে। ফলে করম আলীর পক্ষে তার কাছ থেকে রিক্সার চাবি আদায় করা সম্ভব হলো না। করম আলীকে চেনেন এমন দুই একজন রিক্সা চালকের সহযোগিতা পাবেন এই আশায় সেখানে বসে থাকতে থাকতে দুপুর গড়িয়ে গেলেও তেমন কারও দেখা পেলেন না করম আলী। ঘরে অসুস্থ্য মতলেব মিয়ার কথা বলেও ম্যানেজারের মন নরম করতে পারলেন না তিনি। শেষ বিকেলে পরিচিত এক রিক্সা চালককে পেলেও ওই লোকটা করম আলীর জিম্মাদার হতে রাজি হলেন না। ফলে আর সেখানে দাঁড়াতেও লজ্জা হচ্ছিল করম আলীর। মাথা নিচু করে দ্রুত হেঁটে মতলেব মিয়ার ঝুঁপড়িতে চলে আসেন তিনি।

করম আলী দরজায় আসতেই বানরটি লাফ দিয়ে তার কোলে উঠে বসে। বানরের আচরণে প্রথমে ক্ষুব্ধ হলেও ঘরে ঢুকে মতলেব মিয়ার অবস্থা দেখে বানরটিকে বুকে জড়িয়ে ধরেন পরম মমতায়। বানরটি করম আলীর কোল থেকে নেমে গিয়ে আবার মতলেব মিয়ার বুকে আছড়ে পড়ে। করম আলী বেকুব হয়ে যাওয়া চেহারায় দাঁড়িয়ে থাকেন। বানরটি ততক্ষণে গড়াগড়ি করে কান্না করতে শুরু করে দেয়। করম আলী বুঝতে পারেন না একটি বানরকে কিভাবে সান্তনা দিতে হয়। বানরটি করম আলীর সামনে দাঁড়িয়ে কি বলার চেষ্টা করে তাও থেকে যায় বোঝার বাইরে।

করম আলী স্থানীয়দের সহযোগিতায় মতলেব আলীর মৃতদেহ আঞ্জুমানে মফিজুল ইসলামের গাড়িতে তুলে দিতে গেলে বিপত্তি বাধায় বানরটি। লাশটি গাড়িতে তোলার পর বানরটিও লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসে। আঞ্জুমান কর্মীরা এমন দৃশ্য আগে দেখেছেন বলে মনে হয় না। করম আলী বানরকে অনুরোধ করার ভাষা জানেন না। তবে শেষ পর্যন্ত করম আলীর চাহনি দেখে বানরই বুঝতে পারে মনিবকে বিদায় বলার সময় হয়ে গেছে। করম আলীর কোলে উঠে পড়ে বানরটি। গাড়িটি যত দূরে যেতে থাকে বানরটি ততই যেন করম আলীর বুকের সঙ্গে মিলিয়ে যেতে চায়। করম আলীর বুকে মুখ ঘষে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে পশুটি।

ঢাকা শহরে আশ্রয়হীন করম আলী একটি ঘর পেয়ে যান। সঙ্গী যে জুটে গেছে তা আর বলতে হচ্ছে না। কিন্তু রুটি কলা খেয়ে দুই দিন কাটানোর পর করম আলীর পকেট ফাঁকা হয়ে যায়। করম আলী ভাবতে থাকেন বানরটি নিয়ে গ্রামে চলে গেলে কেমন হয়। আবার ভাবেন অচেনা শহরে যা খুশি করে দিন কাটালেও গ্রামের মানুষ কিছুই জানবে না। কিন্তু গ্রামে গিয়ে বানরওয়ালা পরিচয় দেওয়া কঠিন। এসব ভেবে ভেবে না খেয়ে বানরটিকে উপোষ রেখে আরও একদিন কাটিয়ে দেন করম আলী।

বানরটি করম আলীর অবস্থা বুঝতে পারে। সিদ্ধান্তটিও তাই বানরের পক্ষ থেকেই আসে। খেলা দেখানোর ডুগডুগিটি করম আলীর হাতে তুলে দেয় বানরটি। দুর্বল শরীর নিয়ে বানরটি খেলা দেখানোর ভঙ্গী করে। করম আলী তবুও নিশ্চল। কারণ তিনি জানেন না বানরের খেলা দেখানোর ভাষা ও সংকেত। বানরটি এরপর কখনো নাচের ঢং বা মরে যাওয়ার অভিনয় করে দেখায়। মাথা থেকে উকুন মেরে দেখায়। এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে করম আলীকে দর্শক বানিয়ে বানরটি তাকে খেলা শেখাতে থাকে।


পরদিন ডুগডুগি হাতে করম আলীকে রাস্তায় নামতে দেখা যায়।

 

এসএনএ

 

 


oranjee