ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১ আশ্বিন ১৪২৬

 
 
 
 

অনুরূপ আইচের গল্প- ভালোবাসাবাসি

গ্লোবালটিভিবিডি ৫:২৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০১৮

ফাইল ছবি

ভালোবাসাবাসি

অনুরূপ আইচ

 

এই রিয়া কোথায় গেলি? এতদূর থেকে এসেছিস একটু বিশ্রাম দরকার ছিল না। তোর জন্য কত রকম রান্না করে রেখেছি, খেয়ে গেলি না। তোর সঙ্গে দেখা করার জন্য আশপাশ কত মানুষ এসে বসে আছে, জানিস? তুই এতো অস্থির হয়ে বের হয়ে গেলি। কার কাছে যাচ্ছিস শুনি।

মা---তুমি একটু থামো। একনাগারে এতো কথা কেউ বলে নাকি? আমি দূরে কোথাও যাচিছ না।

কোথায় যাচ্ছিস তাহলে?

মা, তোমার কি তিতলির কথা মনে আছে?

একটু ভেবে...হ্যা, মন পড়েছে, তোর বাল্যবন্ধু। বুঝেছি, বেশি দেরি করিস না।

ঠিক আছে মা।

ফোন রেখে রিয়া ড্রাইভারকে বলে, বাঁয়ে যাও।

কিছুক্ষণ পর একটা বাসার সামনে এসে দাঁড়ায় গাড়িটি।

গাড়ি থেকে নেমে বাসাটির সামনে গিয়ে কড়া নাড়ে রিয়া। দরজা খুলে দেয় সতেরো আঠারো বছরের একটি মেয়ে।

রিয়া জিজ্ঞেস করে তোমার নাম রুনু না?

হ্যা, একটু ভেবে রিয়া আপু আপনি! ইংল্যান্ড থেকে কবে এসেছেন?

এই তো চিনতে পেরেছো। কিছুক্ষণ আগে এসেছি। তোমার শরীর খারাপ নাকি?

নাহ,মা হাসপাতালে, হার্ট অ্যাটাক করেছে। ওনার অবস্থা খুব খারাপ। আপু ওনার সঙ্গে আছে।

রিয়ার কপালে চিন্তুার রেখা দেখা দেয়..রুনুর কাছ থেকে হাসপাতালের বিস্তারিত নিয়ে সেদিকে রওনা দেয় সে। পাঁচ বছর পর দেখা করতে এসে তিতলির এই বিপদের কথা শুনে বিচলিত বোধ করে রিয়া। প্রিয় বান্ধবী তার। এই ক’বছর নানা কারণে বান্ধবীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেনি সে।

 

হাসপাতালের আইসিইউ সামনে এসে তিতলিকে দেখতে পায় রিয়া। কাছে এসে বান্ধবীর মাথায় হাত রাখে সে। মাথা তুলে রিয়া দেখতে পেয়ে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপর উঠে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে তিতলি। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে প্রথমে ভাষা খুজে পায় না রিয়া। তারপর বলে সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস, আন্টি ভালো হয়ে যাবে। তারপর তিতলি বসিয়ে আইসিইউতে ঢুকে যায় রিয়া। দেখে তিতলির মা অচেতন। নাকে নল, বুকে কি যেন ফিট করা। হাতে আর কি কি যেন। চোখের কোন বেয়ে তারও পানি বের হয়। মনে পরে যায় আন্টি তাকে কত আদর করতো। একটু অন্যমনস্ক হয়। সম্বিত পায় ডাক্তারের ডাকে। ডাক্তার তাকে বের হয়ে যেতে বলে। রিয়া বের হয়ে এবার তিতলির পাশে বসে।

নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছিল।

তিতলি কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে(যেন প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন)। তারপর বলে সকালে ওর বাবা এসেছিল বাসায়। তারপর মায়ের স্ট্রোক হলো। ডাক্তার বলেছে সম্ভাবনা কম।

ঘটনা কি খুলে বল। ‘ও’ টা কে? রিয়া জিজ্ঞেস করে।

কিছুক্ষণ তার দীর্ঘদিনের বান্ধবীর দিকে চেয়ে থাকে তিতলি। তারপর বলতে থাকে...

তুই তো লন্ডন চলে গেলি তাও পাঁচ বছর হয়ে গেল। তুই যাবার দু’বছরের মাথায় বাবা মারা যায়। বাবার পেনশনের টাকায় চলছিল না তাই টিউশনি করে এতোদিন সংসার চালিয়ে আসছি। রেহমান গ্রুপের চেয়ারম্যান রেহমান সাহেবের ছোট মেয়ে টুশিকে পড়াই। সেখানেই তার বড় ভাই আবরারের সঙ্গে পরিচয়.........

ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায় তিতলি

 

তিতলি ম্যাম, ভাইয়া মনে হয় আপনাকে কিছু বলতে চায়

টুশির এমন কথায় চমকায় সে। মেয়েটা মাত্র ক্লাস সিক্সে পড়ে অথচ টাস টাস কথা বলে।

বেশি কথা বলো না, অঙ্ক শেষ করো। হালকা ধমক দেয় তিতলি।

ধমক খেয়ে অঙ্ক সমাধানে মনোযোগ দেয় টুশি।

টুশির বড় ভাই আবরারের বিষয়টা তাকে ইদানিং বেশ ভাবাচ্ছে। প্রায়ই তার সামনে কারণে অকারণে আসছে। কিছু একটা বলতে চায় যেন। কিন্তু বলতে পারছে না। সেও তাকে কেয়ার করছে না। তার ছোট বোনকে পড়ায়। এই কয়েকটা টিউশনি আর বাবার পেনশনের টাকায় কোনোমতে সংসার চালায়। তার কি কোনো দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ আছে। যদিও মা প্রায়ই বলে বয়স ত্রিশ হয়ে গেল বিয়ে কি করবি না? সে ভাবে বিয়ে! সংসারের যা অবস্থা তাতে বিয়ে তার জীবনে নেই। প্রেম তো দূরের কথা। তাই আবরারকে এড়ানোই ভালো। অবশ্য আবরারের প্রতি একটা গোপন দূর্বলতা যে তৈরি হয়নি তা নয়। বড়লোকের ছেলে হলেও তার মধ্যে এতোটুকু অহংকারবোধ নেই। বাড়তি খরচের হাত নেই। স্মার্ট ও সৎ। বাবার ব্যবসায়ে সহযোগিতা করে। সে অনেকদিন ধরেই তাকে কিছু বলতে চায় এমন ভাব করছে। আবার তাকে বিরক্তও করছে না। এতে অবশ্য কিছুটা মজাই পাচ্ছে তিতলি। কিন্তু প্রেম করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তার পরিস্থিতি প্রতিকূল তাই নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে। এ নিয়ে তার দু:খবোধও কাজ করে না। কারণ তার একটাই লক্ষ মা ভাই আর বোনকে সামলানো।

ম্যম, এই অঙ্কটা পারছি না।

টুশির কথায় বাস্তবে ফিরে এসে তিতলি অঙ্কের সমাধান করে দেয়।

তারপর উঠতে যাবে এমন সময় রেহমান সাহেব প্রবেশ করেন। জিজ্ঞেস করেন, কি খবর? কেমন আছো?

ভালো আছি আঙ্কেল। আপনার শরীর কেমন- জিজ্ঞেস করে তিতলি।

যতোক্ষণ ব্যস্ত থাকি ততোক্ষণ ভালো থাকি। আজ ছুটি নিয়েছি, আজকেই শরীরটা জ্বর জ্বর লাগছে। ওষুধ খেয়েছি ঠিক হয়ে যাবে।

আর কিছু জিজ্ঞেস না করে রেহমান সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে যাবে এমন সময় একটা কল আসে। অপরিচিত নাম্বার। ধরবে কি ধরবে না ভাবতে ভাবতে কলটা রিসিভ করে। ওপাশ থেকে কণ্ঠ বলে উঠে..আমি আবরার...গলির মুখে আসেন।

তিতলি একটু দ্বিধায় পড়ে যায়। তার কথায় কেন যাবে সে। ভাবতে ভাবতে গলির মুখে এসে পড়ে সে। দেখে গাড়ির দরজা ‍খুলে বসে আছে আবরার।

তিতলি এখনও একটু দূরে। আবরার আজ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে আছে আজ একটা বিহিত করতে হবে। দু’বছর ধরে তাকে একতরফা পছন্দ করে আসছে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেভাবেই হোক মনের কথাটা আজ তিতলিকে জানাবেই। কাছে আসতেই বলে উঠে, উঠুন গাড়িতে।

তিতলি একটু চমকায়। অস্ফুটে বলে উঠে কেন?

মরিয়া আবরার। আবার বলে, উঠুন বলছি।

ততোক্ষণে চারপাশে কিছু উৎসুক মানুষজন তাদের দিকে তাকাচ্ছে।

একটু ভেবে গাড়িতে উঠে যায় তিতলি।

গাড়ি টান দেয় আবরার। এলাকা ছাড়িয়ে মহাসড়কে গাড়ি দ্রুত বেগে চালায় সে।

তিতলি জিজ্ঞেস করে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে।

একটু হেসে আবরার বলে কথা হবে একটু পর।

গাড়ি একটি নদীর কাছে চলে আসে। আবরার নেমে গিয়ে তিতলির পাশের দরজাটা খুলে দিয়ে নামতে বলে। তিতলি নামলে তাকে অনুসরণ করতে বলে আবরার। নদীর কাছে গিয়ে বসে আবরার। পাশে তাকেও বসতে বলে সে। তিতলি যেন একটু ঘোরের মধ্যেই আছে। প্রতিবাদ করতে চাইছে কিন্তু পারছে না। কিছু না বলে বসে পড়ে। তারপর বলে কেন এখানে নিয়ে এসেছেন আমাকে।

আমি দু:খিত এখানে আপনাকে জোর করে নিয়ে এসেছি বলে। আমি আসলে আজকে আপনার মতামত জানতে এখানে নিয়ে এসেছি, আবরার বলে।

কি মতামত? তিতলি জিজ্ঞেস করে।

নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন আমি আপনাকে পছন্দ করি। সেটা সেই দু’বছর আগে থেকেই। কিছুতেই বলতে পারছিলাম না। এতোদিন সমস্যা হয়নি কিন্তু এখন আমার অফিসের কাজেই সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। আপনাকে ভাবতে ভাবতে আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি আপনাকে ভালোবাসি।

এভাবে সরাসরি এমন কথা শুনে একটু চমকে উঠে তিতলি। কিছুক্ষণ আবরারের দিকে চেয়ে থাকে সে। তারপর বলে আমি বিয়ে করবো না যতক্ষণ পর্যন্ত আমার পরিবার প্রতিষ্ঠিত না হয়।

আমি সব খবর নিয়েছি আপনাদের। আমি আপনাদের পরিবারের একজন হতে চাই। আমার মা নেই। আমি আপনার মাকে মা ডাকতে চাই বলে মাথা নিচু করে ফেলে আবরার। অনেকটা মুখ লুকাতে চায় এমন।

এবার লজ্জায় পড়ে যায় তিতলি। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে আমি এ বিষয়ে এখন কিছু বলতে পারবো না। আমাকে ভাবতে হবে।

আপনি ভাবুন। সময় পাবেন ২৪ ঘণ্টা। আমি আর ধৈর্য রাখতে পারছি না। বেপরোয়াভাবে বলে উঠে আবরার নিজেই নিজের কথায় চমকে যায়।

দেখা যাক বলে উঠে পড়ে তিতলি। পারলে দৌড় দেয় এমন। আবরারও উঠে পড়ে। এরপর তিতলিকে তার বাসার কাছে নামিয়ে দেয় আবরার। গাড়িতে সে ফিরতে ফিরতে একটা বিষয় সে নিশ্চিত হয়েছে তিতলি তাকে অপছন্দ করে না। অজান্তে তার মুখে মৃদু হাসি উঠে আসে।

এদিকে এমন ঘটনায় একটু অস্থির হয়ে উঠে তিতলি। আজ আরও দুটি টিউশনি ছিল তার। তা না করে বাসায় চলে এসেছে। বাসায় ঢুকতেই মা বলে উঠে, তিতলি একটা খুশির খবর আছে। রনি  বৃত্তি পেয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত যাদের রোল ১ তাদের বিনা বেতন ও ফিতে পড়াবে।

খুশি হয়ে উঠে তিতলি। বলে, কই রনি?

বাইরে গিয়েছে, চলে আসবে, মা উত্তর দেয়।

তিতলির মনটা খুশিতে ভরে উঠে। হয়তো আরও যে একটা ঘটনা ঘটে গেছে তার জন্যও। সময় পেড়োয় রাত আসে। অর্ধেক রাত শেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছে তিতলি। তারপর ঘুমিয়ে যায় সে।

পরদিন ফোন দেয় আবরার, বলে আমি আপনাদের বাড়ির দুই গলি পরে গাড়ি নিয়ে বসে আছি।

বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে গিয়ে বসে তিতলি। আবরার আবার সেই নদীর ধারে চলে আসে।

সেখানে বসে পরে দু’জন। কিছুক্ষণ এভাবে বসে থাকার পর আবরার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে কিছু বলছেন না যে? সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?

তিতলি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে আবরারের দিকে, তারপর বলে আমি পরিবারকে ছাড়তে পারবো না। সে হিসেবে আমার বিয়ে করাও ঠিক না। তবে আমি আপনাকে পছন্দ করি।

এবার একটু উত্তেজিত হয় আবরার।

আমার কথা শেষ হয়নি। একটু থেমে তিতলি বলে, আমি আপনাকে বিয়ে করবো তবে যতোদিন আমার পরিবার ঠিকঠাকমতো অবস্থায় না পৌঁছাতে পারবে ততোদিন আমি আমার বাসায় থাকবো। আপনি মাঝে মাঝে আসতে পারবেন বাসায়।

এবার হাসি ছড়িয়ে পড়ে আবরারের চোখে মুখে। আমি আপনাকে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করি তাতো সহ্য করবেন না। তবে তাই হোক। আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি। আমি বিয়ে করেও আজীবন আপনার অপেক্ষায় থাকতে পারবো।

লজ্জা পেয়ে যায় তিতলি। অন্যদিকে মুখ ঘুরায়।

এবার হাতটা দাও। দেখিতো তোমার হাতে কয়টা রেখা।

ফাজিল একটা, দুষ্টুমি করে হাতটা আবরারের হাতে সঁপে দেয় তিতলি। তারপর কথায় কথায় সময় কেটে যায়।

পরদিন থেকে টুশিকে পড়াতে যাওয়া বন্ধ করে দেয় তিতলি। কিন্তু টুশি কিছুতেই তিতলিকে ছাড়া অন্য কারো কাছে পড়বে না। রেহমান সাহেব তাকে ফোন করে। বিনয়ের সাথে তাকে মানা করে তিতলি। শেষ পর্যন্ত আবরার তাকে অনুরোধ করে পড়াতে যেতে। তার অনুরোধে আবার টুশিকে পড়াতে যায়। এদিকে প্রতিদিন একটা সময় দেখা করে আবরার আর তিতলি। কখনো নদীর ধার কখনো বা রেষ্টুরেন্ট। এভাবেই তাদের প্রেম চলছিল বেশ। কিন্তু বাধ সাধেন রেহমান সাহেব। একদিন বিকালে অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে রাস্তায় দেখেন হাতে হাত ধরে হাটছে আবরার ও তিতলি। চোখ কটমট তাকিয়ে থাকেন সেদিকে। পরদিন অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দেন আবরারকে। তার পরদিন সকালে তিতলির ঠিকানা খুঁজে তিতলির বাড়িতে হাজির হন আবরার সাহেব। দরজা খুলে দেন তিতলির মা। অপরিচিত লোক দেখে জিজ্ঞেস করেন, কাকে চাইছেন?

আমার মেয়ে টুশিকে পড়ায় আপনার মেয়ে তিতলি বলে রেহমান সাহেব।

ও আচ্ছা। আসেন ভেতরে বলে তাকে ভেতরে নিয়ে বসায় তিতলির মা। তারপর বলেন, তিতলি পড়াতে গেছে। আজকে আপনার ওখানে তো যাওয়ার কথা।

রেহমান সাহেব বলে উঠেন, আমি জানি। আর আমি বসতে আসিনি।

রেহমান সাহেবের এই ধরণের কথায় একটু আশ্চর্য হয় তিতলির মা।

বলুন, কি বলবেন। বলেন তিতলির মা।

আপনি কেমন মা বলেন তো। মেয়ে কোথায় কি করছে খবর রাখেন কিছু? রাগতস্বরে বলেন রেহামন সাহেব।

কেন কি হয়েছে? বিচলিত হয় তিতলির মা।

আমাকে মেয়েকে পড়াতে যায়, সেখানে সেটাই করবে, না, আমার বড় ছেলের মাথাটা খেয়ে ফেলেছে। প্রেম করে বেড়াচ্ছে। বড়লোকের ছেলে বাগানোর চিন্তা আরকি। আর আপনিও কেমন মা, মেয়েকে ছেড়ে রেখেছেন বড়লোক পাত্র খোঁজার জন্য নাকি? লজ্জা নেই, বামন হয়ে গাছে উঠতে চান। নাকি আপনার গোষ্ঠীতেই এমন প্রবলেম আছে? আমি বলে গেলাম। যদি আপনার মেয়েকে না সামলান তাহলে বড় পদক্ষেপ নেব। এতে বড় ক্ষতিও হয়ে যেতে পারে আপনাদের। কথাগুলো বলে হনহন করে বেড়িয়ে যান রেহমান সাহেব।

রেহমান সাহেবের কথাগুলো শুনে স্থবির হয়ে যায় তিতলির মা। রুনু বলে ধপ করে পরে যান মাটিতে। দৌড়ে আসে রুনু। কি করবে বুঝতে না পেরে পাশের বাসার আঙ্কেলকে ডেকে নিয়ে আসে। তারপর সোজা হাসপাতাল।

ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ফিরে আসে তিতলি..এই হচ্ছে অবস্থা।

ঠিক হয়ে যাবে সব, চিন্তা করিস না বলে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করে রিয়া।

করিডরে চোখ পড়ে তিতলির, তাকিয়ে থাকে সেদিকে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখে একটি সুদর্শন ছেলে এগিয়ে আসছে ব্যস্ত পায়ে। রিয়া বুঝে যায় সবকিছু।

তিতলিকে বলে, আবরারের তো কোনো দোষ নেই।

তিতলি কিছু বলে না, শুধু বলে হু।

তোমার মায়ের কি অবস্থা? উদ্বিঘ্ন আবরার জানতে চায়।

রিয়া উঠে আইসিইউর দিকে যায়। তিতলির পাশে বসে আবরার। সাথে সাথে কেঁদে ফেলে তিতলি। বলে, ডাক্তার বলেছেন সম্ভাবনা কম।

চিন্তুা করো না তিতলি, খালাম্মা অনেক শক্ত মনের মানুষ, ওনার কিছু হবে না। সাহস রাখো। তোমার ছোটভাই কিছুক্ষণ পর আসবে। কথা হয়েছে আমার সাথে।

তোমার বাবা তো চায় না আমরা মিশি, আবরারকে বলে তিতলি।

রাজশাহীতে গিয়েছিলোম। কাজ দ্রুত শেষ হয়ে গেছে তাই বাসায় ঢাকায় চলে এসেছি। ফেরার সাথে সাথে বাবা আমাকে শাসাতে এসেছিলেন। তার কাছ থেকেই ঘটনা শুনেছি। শুনে তার সঙ্গে রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছি। আমি তোমাদের সঙ্গে থাকবো। ও বাসায় আর যাচ্ছি না। চলো খালাম্মাকে দেখে আসি। বলে দু’জন আইসিইউতে ঢুকে।

তিতলি দেখে মায়ের জ্ঞান ফিরেছে। সে মায়ের পাশে গিয়ে বসে। তিতলির মায়ের চোখে পানি চলে আসে মেয়েকে দেখে। আবরার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে তিতলির কাছে আসে। সে জানায়, আশঙ্কা কেটে গেছে। দুদিন হাসপাতালে থাকতে হবে। কিছূক্ষণ পরই কেবিনে নেওয়া হবে।

তিতলির মাকে কেবিনে নেওয়া হয় কিছুক্ষণ পর। এরমধ্যে তিতলির ছোট দুই ভাই-বোন চলে এসেছে। কেবিনে আনার পর তিতলির মা আবরারকে বলেন, তোমার বাবা...

বাবাকে নিয়ে আপনি এখন ভাববেন না তো। তাকে ছেড়ে এসেছি। এখন আপনারাই আমার পরিবার।

দুজনের কথার মাঝে রেহমান সাহেব কেবিনে ঢোকেন সঙ্গে টুশি। তাকে দেখে রেগে উঠে আবরার।

রেহমান সাহেব মানসিকভাবে পুরোটাই ভেঙে গেছেন। ছেলে তার কাছ থেকে চলে আসার পর ভুল বুঝতে পেরেছেন নিজের। অনেক ভেবেছেন তিনি। সবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েই এখানে এসেছেন।

রেহমান সাহেব ছেলের দিকে না তাকিয়ে তিতলির মাকে সরাসরি ভাঙা কণ্ঠে বললেন, আমি বড় ভুল করে ফেলেছি আপনাকে কষ্ট দিয়ে। আমার জন্যই আপনার এই অবস্থা। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন দয়া করে।

তিতলির মা বলে উঠলেন, আরে কি করেন, আপনার অবস্থান থেকে যা করার কথা তাই করেছেন। আমি আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

না তো আপনি আমাকে ক্ষমা করেননি। রেহমান সাহেব বললেন।

করেছি তো। তিতলির মা বলেন।

কিভাবে বুঝবো ক্ষমা করেছেন। কই আমার ছেলেকে তো আপনার মেয়ের জামাই হিসেবে গ্রহণ করেননি। আর শোনেন, আমি আবরারের কাছ থেকে শুনেছি তিতলির শর্তের কথা। আমার একটি শর্ত আছে।

কেবিনের সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে রেহমান সাহেবের দিকে তাকায়। রেহমান সাহেব বলেন, তিতলি আমার কোম্পানিতে চাকরি করবে। সেই টাকা আপনাকে দেবে। আর আমার একজন অভিভাবক লাগবে। আমি টাকা টাকা করে নষ্ট হয়ে গেছি তো। আমাকে ঠিক করবে। তাই সে আমার বাসাতে থাকবে চারদিন আর আপনার সঙ্গে থাকবে তিনদিন। ওকে?

নাহ, তিতলি আপনার বাসাতেই থাকবে। বিয়ের পর তো স্বামীর ঘরেই থাকে মেয়েরা।

আমি নিয়ম পাল্টেছি। এখন আমার শর্ত এটাই।

তিতলির মা হেসে সায় দেয়।

এবার রেহমান সাহেব আবরারের দিকে তাকায়। বলে, কি এখনও রাগ করে আছিস বাবার সঙ্গে।

আবরার বলে, তোমাকে বোঝা খুব ‍মুশকিল বাবা। তুমি আসলেই অনেক ভালো। আদনান আসলো না যে? জিজ্ঞেস করে আবরার।

রেহমান সাহেব বলেন, তোর ছোট ভাই, তুই চিনিস না? কোথায় কোথায় ঘুরে। তার এক বন্ধুর কাছে গেছে।

রেহমান সাহেব এবার তিতলির দিকে তাকিয়ে বলে, কি আমার বড় মা হবি?

লজ্জা পেয়ে যায় তিতলি। মাথা নিচু করে ফেলে সে।

টুশি হঠাৎ সামনে চলে এসে বলে, সবাই এদিকে তাকাও। সবাই তাকিয়ে দেখে সে সেলফি তুলতে চাইছে। আবরার তিতলির কাছ ঘেসে আসে। সবার অলক্ষে তিতলির হাত চেপে ধরে সে। তিতলি একবার তাকায় আবরারের দিকে তারপর সামনে দিকে মোবাইল ক্যামেরার দিকে মনোযোগ দেয় হাসি হাসি মুখে। শুধুই তারই নয়, সবারই হাসিমুখ।

টুশি সেলফি তোলে সবাইকে নিয়ে।

 

 

এসএনএ


oranjee