ঢাকা, শনিবার, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি ভাষা আন্দোলন

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৩৮ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৯

ফাইল ছবি

বাহালুল মজনুন চুন্নূ

বাঙালি জাতির জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি অবিস্মরণীয় একটি দিন। এ দিনটি বাঙালির জাতীয় জীবনের সকল চেতনার উৎস। এই দিনটিতে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা জন্য যে সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ করা হয়েছিল তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল এক দৃষ্টান্ত। ভাষা আন্দোলন বাংলার জনগণের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছিল যার ভিত্তিতেই পূর্ব বাংলার মানুষ ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; এবং পরিণতিতে একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যেমে বিশ্বের মানচিত্রে এঁকে দিয়েছিল লাল-সবুজের পতাকা। প্রায় সহস্রাধিক বছর আগে প্রাকৃত ভাষার বিবর্তনের মধ্য দিয়ে জন্ম হয়েছিল বাংলা ভাষার। এই ভাষার  ঊষালগ্নে বৌদ্ধ, চর্যা ও দোহার কবি ভূষক দৃপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, তিনি বাঙালি। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে বৈষ্ণব পদাবলি, মঙ্গল কাব্য ও আখ্যানমূলক কাব্যকে আশ্রয় করে বাংলা ভাষার উন্নয়ন ঘটতে থাকে। ধর্ম,বর্ণ, গোত্র ইত্যাদি ভেদাভেদকে অতিক্রম করে প্রতিষ্ঠিত হয় ভাষাভিত্তিক জাতিসত্তা, বাঙালি জাতিসত্তা। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের উম্মেষ ঘটে বায়ান্নোর মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে।

সাতচল্লিশে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও নৃতত্তগত কোনো মিল না থাকার পরও চৌদ্দশ মাইল ব্যবধানের দুটি পৃথক ভূখন্ডকে মিলিয়ে একসঙ্গে পাকিস্তান নামক উদ্ভট রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল শুধু ধর্মভিত্তিক সাদৃশ্যতার দোহাই দিয়ে। আর সেই রাষ্ট্র গঠনের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই দুরভিসন্ধিমূলকভাবে বাঙালির ওপর মনস্তাত্তিক ও সাংস্কৃতিক আঘাত হানার উদ্দেশ্যে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের হাজার বছরের ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে করাচির শিক্ষা সম্মেলনে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষদের ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রতারিত করে উর্দুকে পাকিস্তানের এক মাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। অথচ সেই সময়টায় বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ৫৬%, যেখানে উর্দু ভাষাভাষীর সংখ্যা ৭.২%। অবশ্য পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই ভাষা বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মুসলিম লীগের দাপ্তরিক ভাষা উর্দু করার প্রস্তাব করলে শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক এর বিরোধিতা করেছিলেন। দেশবিভাগের আগে চৌধুরী খলীকুজ্জামান উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করলে সেটার বিরোধিতা করেন ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ বেশ ক'জন বুদ্ধিজীবী। দেশবিভাগের পর উর্দুকে ইসলামি ভাষা হিসেবে আখ্যা দিয়ে পাকিস্তানি রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র করা হয়। বস্তুত উর্দু এবং বাংলা দুটোই আর্য ভাষা। এর প্রতিবাদে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘উর্দুকে শ্রেষ্ঠ ভাষা, ধর্মীয় ভাষা বা বুনিয়াদী ভাষা বলে চালাবার চেষ্টার মধ্যে যে অহমিকা প্রচ্ছন্ন আছে তা আর চলবে না। নবজাগ্রত জনগণ আর মুষ্টিমেয় চালিয়াত বা তথাকথিত বনিয়াদী গোষ্ঠীর চালাকিতে ভুলবে না’।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে ৪৭ এর ২ সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিশ নামক একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এই সংগঠন  ১৫ সেপ্টেম্বর এ সংগঠন 'পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু' নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। তমদ্দুন মজলিশ ‘ভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। মাতৃভাষা, মাতৃভূমি এবং তার সংস্কৃতিই একটি জাতির অস্তিত্বের স্মারক, এ বিষয়ে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ সচেতন। তিনি বলতেন ‘আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া, তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।’ ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে করাচীতে অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।  এর প্রতিবাদ করে ভাষা সংগ্রাম পরিষদ। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্র্রনাথ দত্ত গণপরিষদের ভাষা হিসেবে ইংরেজি এবং উর্দুর পাশাপাশি বাংলা ব্যবহারের দাবি জানান। তার দাবি অগ্রাহ্য হলে ২৬ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ধর্মঘট পালিত হয়। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ' পুনর্গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অবিস্মরণীয় দিন। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে সর্বাতœক হরতাল পালিত হয়েছিল। এদিনের হরতালে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন। এবং পাকিস্তানে প্রথম গ্রেফতার হন, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে প্রভাবিত করেছিল।

১৯৪৮ সালের ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে ঐতিহাসিক আট দফা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল যার মাধ্যেমে সর্বপ্রথম বাংলাভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। সেই চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে জেলখানায় আটক ভাষা আন্দোলনের কর্মীদের থেকে অনুমোদন নেয়া হয়। কারাবন্দি অন্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুও চুক্তি অনুমোদন করেছিলেন। চুক্তির শর্ত মোতাবেক বঙ্গবন্ধুসহ অন্য ভাষাসৈনিকরা কারামুক্ত হয়েছিলেন। ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দর্পভরে যখন বললেন, ‘একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা’ তখন বঙ্গবন্ধু সকলের আগে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, ‘না’ বাংলাকেই রাষ্ট্র ভাষা করতে হবে।’  ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে জিন্নাহ আবারও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বললে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের কন্ঠে ‘না, না’ ধ্বনিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ক্রমবর্ধমানভাবে ভাষা আন্দোলন ও সা¤প্রদায়িকতা বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পাকিস্তান সরকার তাঁকে ঐ বছরের ১১ই সেপ্টেম্বর কারারুদ্ধ করে। এরপরের বছর তাঁকে আরও দুবার গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি মোটেও দমে যাননি। তাই তাঁর সাহস, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় শঙ্কিত হয়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি গ্রেফতার করে দুই বছর এক মাস সাতাশ দিন কারাবন্দি করে রেখেছিল।

১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ঐ সময়টায় জেলখানায় বন্দি থাকায় বঙ্গবন্ধু সশরীরে উপস্থিত ছিলেন না, কিন্তু তাঁর নির্দেশনা ও পরামর্শ ভাষা সংগ্রামীদের উদীপ্ত করেছিল একশ চুয়ালি­শ ধারা ভেঙ্গে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে  রাজপথে নেমে আসতে। মায়ের ভাষার অমর্যাদা যাতে না হয়, সেজন্য রাজপথে নেমে এসেছিল ভাষাসংগ্রামী সর্বস্তরের মানুষ। পাড়ায় পাড়ায় নাটক ব্রতচারী নাচ/মুকুলের মাহফিল-কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ ফুল/আর সবুজের স্বরগ্রাম/কলাপাতা-সবুজ, ফিরোজা, গাঢ় সবুজ, নীল/তারই মধ্যে বছরের একটি দিনে/রাস্তায় রাস্তায় উঠে আসে মুষ্ঠিবদ্ধ হাত/রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই! রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই! এই কয়েকটি ছত্রের মাধ্যমে দিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ বায়ান্নোর রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত রাজপথের দৃশ্যপট এঁকেছেন। ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারাকে উপেক্ষা করে বাঙালি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে রাজপথে নেমে আসলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর লেলিয়ে দেয়া বাহিনীর বুলেটের আঘাতে সালাম, রফিক, জব্বর, শফিক, বরকতসহ আরও অনেকের রক্তে রঞ্জিত  হয়ে গিয়েছিল রাজপথ।  সেই দৃশ্যপট  খুঁজে পাওয়া যায় আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর মাগো ওরা বলে কবিতার ‘চিঠিটা তার পকেটে ছিল/ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা/মাগো, ওরা বলে/ সবার কথা কেড়ে নেবে/তাই কি হয়?/তাইতো আমার দেরি হচ্ছে।/ তোমার জন্য কথার ঝুড়ি নিয়ে/তবেই না বাড়ি ফিরব...' এই কয়েকটি লাইনে।

কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাইতো, আলাউদ্দিন আল আজাদ তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ কবিতায় লিখেছেন, 'ইটের মিনার ভেঙেছে ভাঙুক/একটি মিনার গড়েছি আমরা চার কোটি কারিগর/ বেহালার সুরে রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায়। পলাশের আর/ রামধনুকের গভীর চোখের তারায় তারায়/ দ্বীপ হয়ে ভাসে যাদের জীবন/ যুগে যুগে সেই শহীদের নাম/ এঁকেছি প্রেমের ফেনিল শিখায়, তোমাদের নামে তাই আমাদের/হাজার মুঠির বজ্র শিখরে সূর্যের মতো জ্বলে শুধু এক শপথের ভাস্কর। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য বাঙালির তীব্র আন্দোলন-সংগ্রাম, আত্মত্যাগের কারণে পাকিস্তান সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। সাংবিধানিকভাবে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মযার্দা দেয়া হয়। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির মাঝে অধিকার আদায়ে আন্দোলন-সংগ্রামের চেতনা সৃষ্টি হয়েছিল; রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বাধিকার আন্দোলনের প্রেরণা তৈরি হয়েছিল। এই মহান ভাষা আন্দোলনেই বাঙালির মাঝে জাতীয়তাবাদের চেতনার উম্মেষ ঘটিয়েছিল যার কারণেই আজকের বাংলাদেশ।

বাহালুল মজনুন চুন্নূ

লেখক: সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

এসএনএ


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। গ্লোবাল টিভি লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে গ্লোবাল টিভি-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।
oranjee