ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯ | ৪ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

বিজয়ের মাসে বিজয় আসুক মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের

অনুরূপ আইচ ১২:২২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮

ফাইল ছবি

একদিন বাঙ্গালীরা স্বাধীন দেশের বাসিন্দা হবে, এমন স্বপ্নের বীজ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বপন করেছিলেন তার গল্প-কবিতায়। যার ফলেই হয়তবা ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় দেশ বিভাগের নামে বঙ্গভঙ্গ করে দিয়ে যায়। তারা বাংলাকে ভঙ্গ করে এক অংশ দিয়ে যায় ভারতে, যার নাম হয়- পশ্চিমবঙ্গ। বাংলার আরেক অংশকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের আয়ত্বে দিয়ে যায় ব্রিটিশেরা। যা আজো দুনিয়ার ইতিহাসে নোংরা ষড়যন্ত্রের সাক্ষ্য দেয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগ মানুষের অসাম্প্রদায়িক মনোবাসনাকে আঘাত করে ব্রিটিশরা ধর্মের ভিত্তিতে দুটি দেশ গড়ে দিয়ে যায় ভারত ও পাকিস্তান নামে। কিন্তু স্বাধীনতার পরে ভারত অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করলেও পশ্চিম পাকিস্তানীদের অধীনস্থ গোটা পাকিস্তানে জাল বিস্তার করতে থাকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির। যদিওবা পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ তাদের অনেক জনপ্রিয় নেতারা ব্যক্তিজীবনে ইসলাম ধর্মের প্রতিটি নিয়ম কানুন সঠিকভাবে মেনে চলননি বলে জানা গেছে ইতিহাসের পাতায়। মজার ব্যাপার হলো, ব্রিটিশের দালাল টাইপ ইংরেজদের জীবন যাপনে অভ্যস্ত এই নেতাগুলো কিন্তু রাজনীতির ময়দানে ইসলাম ধর্মকে এমনভাবে ব্যাবহার করতেন তাতে দেশবাসীও ভাবতেন, তারা হয়ত অনেক ধার্মিক। যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের জাতীয় নেতাদের ভণ্ডামির চূড়ান্ত রূপ।

পশ্চিম পাকিস্তানের বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতাদের চারিত্রিক এই ভণ্ডামি উপলব্দি করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রথম বাঙালি জননেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান গোটা পাকিস্তানের মানুষকে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ প্রদর্শন করেন। তৎকালীন সময়ে তাদের রাজনৈতিক দল ‘আওয়ামী মুসলীম লীগ’ এর নাম পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ রাখার সৎ সাহস দেখান শেখ মুজিব। তারপর থেকে হাজারো চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে শেখ মুজিব এই অঞ্চলের সকল বাঙ্গালীসহ প্রায় গোটা পাকিস্তানের মানুষের মাঝে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হন। এই জন্যে শুধু শেখ মুজিব বা তার অনুসারী নয়, পূর্ব পাকিস্তানের উপর ব্রিটিশদের চেয়েও ভয়াবহ অত্যাচার, নির্যাতন ও শোষণ করতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তান।

১৯৭০ সালের ভোটে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে পাকিস্তান শাসন ভার দেওয়ার নাম করে নানা টালবাহানা করতে থাকে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক। সে অঞ্চলের সেনা শাসক থেকে শুরু করে প্রায় সকল রাজনৈতিক দলগুলো একত্রিত হয়ে ভন্ডামী শুরু করে শেখ মুজিবের সঙ্গে তথা আওয়ামী লীগের সাথে- যাতে করে পাকিস্তানের শাসনভার না পায় বাঙালি এই জননেতা।
এক পর্যায়ে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের বাঙ্গালীদের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানিদের নানান টালবাহানা ও প্রাণ নিতে শুরু করে দিলো। অগত্যা ১৯৭১ এর ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান তথা বর্তমানের সোহরাওয়ারদী উদ্যানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটি এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা ভাষণ হিসেবে স্বীকৃত জাতিসংঘের তরফ থেকে। সেই ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ডাক দেওয়ার কারণগুলো সুস্পষ্ট রূপে বর্ণনা করে স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে হলে বা একটি স্বাধীন দেশ চালাতে হলে কি কি করতে হবে- সেই দিক নির্দেশনা দিয়ে বলেছিলেন,‘ এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, দেশ স্বাধীনের এতো বছর পরেও বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ বারে বারে শুনলে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এতো সুন্দরভাবে দিয়েছেন- যে ভাষণে খুঁত বের করে তার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার মামলা দেওয়ার সুযোগই রাখেননি শেখ মুজিব। তাইতো এটাকে শুধু ভাষণ না বলে ‘অমর কাব্য’ হিসেবে ভূষিত করেছেন দেশ বিদেশের বুদ্ধিজীবীরা।

১৯৭১-এর ২৫ মার্চ কাল রাতে পাকিস্তানি বাহিনী বিনা কারণে হুট করে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের ঘুমন্ত মানুষের উপরে আক্রমণ করে গণহত্যা শুরু করে দেয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। গ্রেফাতারের পূর্বে বঙ্গবন্ধু লিখিতভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে যান। ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ এর ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। টানা নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে ৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দুনিয়ার বুকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিজয়ের পতাকা উঁচিয়ে ধরে। সেই থেকে বিশ্ব পেল বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্র ও শেখ মুজিবর রহমান নামের একজন বিশ্বনেতা। আর আমরা পেলাম জাতির পিতা শেখ মুজিবকে।

কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর থেকে জাতির পিতা শেখ মুজিবকে বাংলাদেশ গড়তে অনেক বেগ পেতে হয়েছিল। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে সদ্য স্বাধীন দেশ গড়ার কাজে জাতির পিতাকে নানাভাবে হতবিহবল করতে মরিয়া ছিল অনেকেই। তারাই ছিলো পাকিস্তানের দালাল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা না চাওয়া অন্য দেশগুলোর চর ছিল এরা। এরা বঙ্গবন্ধুর কাছের অনেককেই তখন হয়ত বিপথে চালিত করেছিল দেশবাসীর অদেখা লোভনীয় ধান্দায়। যে কারণে দেশ স্বাধীনের অল্প কয়েক বছর পরেই তথা ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের কালো অধ্যায় রচিত করতে পেরেছিল এসব সুবিধাভোগী পাকিস্তানের দালালেরা।

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট আমরা হারালাম আমাদের জাতির পিতাকে। আর বিশ্ব হারালো মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে। এর পর থেকে অবৈধ পন্থায় দেশের ক্ষমতা দখলকারীদের দলের নাম বা চেহেরায় পরিবর্তন এলেও তারা আসলে শান্তির ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে বাংলাদেশ নামের আড়লে পাকিস্তানের মর্জি মাফিক একটি দরিদ্র রাষ্ট্র বানাতে মরিয়া ছিল, যা কখনোই শেখ মুজিবের স্বপ্ন ছিল না। কিংবা এমন রাষ্ট্র নির্মাণের স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে যাননি ১৯৭১ সালে। অথবা দেশবাসীরও এই দুঃস্বপ্ন ছিল না।

তবুও বাংলাদেশের জাতির পিতাকে হত্যার পরে পাকিস্তানের দোসরেরা ২১ বছর দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশকে দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছিল বিশ্বের দরবারে। এ থেকে বের হয়ে আসাটাই এক সময় দুঃস্বপ্ন মনে হতো বাংলাদেশিদের কাছে।

২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় রাষ্ট্র শাসনের ভার পেলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এগুতে থাকে উন্নয়নশীল দেশের পথে। তারই কারণে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ আবারো ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের উপরে বর্তান। এরপর থেকে গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে দ্রুতগামী উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করেন শেখ হাসিনা। যার স্বীকৃতিও মিলেছে জাতিসংঘের তরফ থেকে।

চলতি বছর ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচনে দুটি জোট বেঁধে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলগুলো। একটি জোট হলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। আরেকটি জোট হচ্ছে ড. কামালের নেতৃত্বাধীন ‘ঐক্যফ্রন্ট’। এই দুই জোট থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধাই নির্বাচনের লড়াইয়ে নেমেছেন। সেই সাথে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের দলগুলোও রয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে তথা বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ মার্কা নিয়ে নির্বাচনের মাঠে। বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের অভিযোগ রয়েছে, মহাজোটের প্রার্থীদের মাঝেও অনেক যুদ্ধাপরাধী রয়েছে। তবে তা যদি সত্য হয়ে থাকে সে বিচারের ভার রইলো দেশের ভোটারদের রায়ে। তবে মহাজোটের শরিক কোনো দল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার বিপক্ষে কাজ করেনি জামায়াত ইসলামীর মতো, এটা নিশ্চিত সবাই। তবে নির্বাচনে যারাই জিতুক না কেন, আমি ব্যাক্তিগতভাবে চাই- এই বিজয়ের মাসে দেশের মানুষ ভোট দিয়ে বিজয়ী করুক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। দলপ্রেমিক নয়, দেশপ্রেমিকদের জয় আসুক জনতার ভোটে- এটাই কাম্য।

লেখকঃ নির্বাহী সম্পাদক, গ্লোবাল টিভি অনলাইন।


oranjee