ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

বাঙালির শৃঙ্খল মুক্তির দিন

মাহতাব শফি ১:৫৪ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০১৯

আজ ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। একাত্তরের এদিনই উঠেছিল এক নতুন সূর্য। অঙ্গুলি ছুঁয়ে কাঠপোড়া স্বজনের লাশ আর জননীর কান্নায় কেঁদেছিল আকাশ।

শ্বাপদসঙ্কুল মানুষের চোখে তখন এক লাশ পোড়া ভোর। ঘর পুড়ছে। বাজার পুড়ছে। পিষে লাশ চলছে পাকিস্তানি সেনাদের ভারি ট্যাঙ্ক, দানব যান। পথে পথে ব্যারিকেড গড়েছে মানুষ। জ্বলছে বাড়ি, আবাসিক হল, দোকানপাট। মানুষের চোখে জল। বুকে আগুন। মায়ের রক্তে খেলছে অবুঝ শিশু। বেলা যায়। প্রখর হয় সূর্য। আবারো বাজে শত্রুর স্টেনগান। পথে নামে মুক্তিকামী মানুষ। গড়ে নতুন ব্যারিকেড। তুচ্ছ করে মৃত্যুভয়, ট্যাঙ্কের সামনে এগিয়ে দেয় সাহসী প্রাণ। অশ্রু, হাহাকার, ব্যথার ঢেউ ও ঘৃণিত আর্তনাদের সঙ্গে তা জাগিয়ে তোলে বাঙালির প্রতিশোধস্পৃহা। জন্ম নেয় অবিস্মরণীয় মুক্তির গান স্বাধীনতা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ঢাকায় নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। চেয়েছিল বাঙালি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে। কিন্তু পারেনি। সেই রাতেই প্রতিরোধ গড়ে তোলে বাঙালি।

অনুভূতিতে সেই স্মৃতির ঝড় বয়ে আনা বাঙালির শৃঙ্খল মুক্তির দিন আজ। হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে এদিনে বিশ্বের বুকে স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বীর বাঙালি। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল এ বদ্বীপের মানুষ।

ইতিহাসের পৃষ্ঠা রক্তে রাঙিয়ে, আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে একাত্তরের এদিনে যে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের মানুষ। দীর্ঘ ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন তার চূড়ান্ত পরিণতি। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা, এদিনে জাতি স্মরণ করছে বীর শহীদদের। স্বাধীনতা দিবস তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে মুক্তির প্রতিজ্ঞায় উদ্দীপ্ত গৌরব ও অহঙ্কারের ইতিহাস। আজও বারবার অনুরণিত করে সেই স্মৃতি।

আজ থেকে ৪৮ বছর আগের ঠিক এমনি এক ভোররাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালি। ঘোরতর ওই অমানিশা ভেদ করেই দেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার চিরভাস্বর সূর্য। বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই শুরু হয়েছিল একাত্তরের আজকের এদিনে।

১৯৭১ সালের এদিনেই ধ্বংস স্তূপের মধ্য থেকে বেরিয়ে এসেছিল যে শিশু, আজ তা পরিণত, প্রাণের বন্ধনে বেড়ে ওঠা প্রাণপ্রিয় স্বাধীনতা। এদিনেই বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার লড়াইয়ে। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তি পেতে শুরু করেছিল স্বাধীনতার যুদ্ধ। রক্তে ভাসে সবুজ মাটি। লাশের স্তূপ জমে পথেঘাটে, ডোবায়, বনবাদাড়ে। বাঙালির প্রাণপণ লড়াইয়ের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী। মৃত্যুকূপ ও ধ্বংস স্তূপের মধ্য থেকে মাথা তুলে দাঁড়ায় একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ বাংলাদেশ।

মুক্তিযুদ্ধের টানা ৯ মাস চালায় পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ-ধ্বংসলীলা। ১ কোটিরও বেশি বাঙালিকে ঘরছাড়া করে। মাত্র ৬ মাসে হত্যা ও ধর্ষণের পর ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে প্রায় পৌনে ১ কোটি হিন্দুকে। প্রায় ৩ হাজার হিন্দুকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে। তারপর একদিন লাশের শহরে আসে স্বাধীনতা। আবিষ্কৃত হয় সাড়ে নয়শতরও বেশি বধ্যভূমি। প্রমাণ মেলে ৮৮টি নদী ও ৬৫টি ব্রিজের ওপর হত্যা নির্যাতনের। শহীদের তালিকায় যুক্ত হন স্বাধীনতাকামী ৩০ লাখ মানুষের মুখ।

মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার শপথ গ্রহণের মধ্যদিয়ে সদ্য স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের যোগ্যতা অর্জনকারী গর্বিত জাতি আজ ৪৯তম মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদ্যাপন করবে।

বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করেছে। একই সঙ্গে একাত্তরের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেয়া সেই কালজয়ী ভাষণও ইউনেসকোর ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যর স্বীকৃতি লাভ করে।

 


oranjee