ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

রঙ রসিয়া নাচে মধুরও ফাগুনে

প্রতীক ইজাজ ৭:২২ অপরাহ্ণ, মার্চ ২১, ২০১৯

প্রকৃতির ফুলবনে এখন আগুনরঙা লাল পলাশ শিমুল। বনে ফুটে আছে অশোক, বকুল, পিয়াল। শাখায় শাখায় ওড়ে ভ্রমর। নতুন কচি বোলে ছেয়ে আছে আম্রকানন। বকুল নিমের ডালে মঞ্জরি। বাতাসে মিষ্টি সুবাস।
চৈত্রের বাতাসে উড়ছে রং। রঙের মেঘে উড়ছে বিবাগী মন। মন এখন ফাগুনবিলাসী। এই যে রঙ, রঙের পার্বণ, এই তো বাঙালির হোলি। মুঠোমুঠো আবির উড়ছে বাতাসে। আজ হোলি। শুভ হোলি উৎসব।

দোল পূর্ণিমা বা হোলি খেলা- বাঙালির বসন্ত উৎসব; বসন্তের আহ্বান। রঙ রূপ রসই জানিয়ে দেই শীত বিদায় নিয়েছে, এসেছে বসন্তের ছোঁয়া। হোলি তাই প্রকৃতি থেকে নেওয়া আবীর রঙের স্পর্শ; ধর্ম থেকে মানুষ; মানুষে মানুষে সম্মিলিত সংহতির প্রকাশ।

শাস্ত্রে হোলি, পুরাণগাঁথা: বসন্তের পূর্ণিমার এই দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেশি নামক অসুরকে বধ করেন। কোথাও কোথাও অরিষ্টাসুর নামক অসুর বধের কথাও আছে। অন্যায়কারী, অত্যাচারী এই অসুরকে বধ করার পর সকলে আনন্দ করে। এই অন্যায় শক্তিকে ধ্বংসের আনন্দ মহাআনন্দে পরিণত হয়।
অর্থাৎ শাস্ত্রটি এমন যে, ভক্ত প্রহ্লাদ অসুর বংশে জন্ম নিয়েও পরম ধার্মিক ছিলেন। তাঁকে যখন নানাভাবে চেষ্টা করেও হত্যা করা যাচ্ছিল না, তখন দৈত্যদের রাজা হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ হোলিকা এই বর পেয়েছিল যে আগুনে তার কোন ক্ষতি হবে না। কিন্ত অন্যায় কাজে শক্তি প্রয়োগ করায় বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ অগ্নিকুণ্ডে অক্ষত থেকে যায়। বর নষ্ট হয়ে পুড়ে নিঃশেষ হয় হোলিকা। এ থেকেই হোলি কথাটির উৎপত্তি।

লোককথা, লোকাচার: কলকাতায় ‘দোলযাত্রা’ আর পশ্চিম ও মধ্যভারতে ‘হোলি’- উৎসব একই। উৎসবের আগের দিন খুব ধুমধাম করে করা হয় ‘হোলিকা দহন’ বা ‘বহ্নি উৎসব’। অগ্নি সংযোগ করা হয় শুকনো গাছের ডাল ও কাঠের স্তুপে। পরের দিন অর্থাৎ আজ রঙ খেলা। বাংলায় এই ‘হোলিকা দহন’কে বলে ‘চাঁচর’।

অঞ্চলভেদে দোল উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান আলাদা। যেমন- কোথাও কোথাও ফাল্গুন শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে দোল উদযাপন উপলক্ষে 'বুড়িরঘর' বা 'মেড় ‘ পোড়ানো হয়।

সব বয়সী মানুষ একে অপরকে আবিরের রঙে রাঙিয়ে দেয়। কম বয়সীরা বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়। মন্দিরে-মন্দিরে রাধা-গোবিন্দের পূজা হয়। উলুধ্বনি, কাঁসার ঘণ্টা ও পুরোহিতের ঘণ্টা ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক।

অঞ্চলভেদে নামও ভিন্ন। পুরাকালে বিবাহিত নারী তার পরিবারের মঙ্গল কামনায় রাকা পূর্ণিমায় রঙের উৎসব করতেন। ভারতের উড়িষ্যায় দোলোৎসব, উত্তর ও মধ্যভারতে হোলি বা হোরি, গোয়া ও কঙ্কণ অঞ্চলে শিমাগা, দক্ষিণ ভারতে কামায়ন। উত্তর ভারতে হোলি উৎসব বাংলায় দোলযাত্রার পরদিন পালিত হয়। বলা হয়, মধ্যযুগের কবি জয়দেবের গীতগোবিন্দের প্রভাবেই হোলি ও দোল যাত্রা একাত্ম হয়ে গেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিছু গানে দোল ও রাধা-কৃষ্ণের দোল লীলার কথা উল্লেখ রয়েছে। তার 'সোনারতরী'র ঝুলন, 'কথা ও কাহিনী'র হোলি খেলাসহ অনেক কবিতায় এ প্রসঙ্গ এসেছে। দোলযাত্রা উৎসব শান্তি নিকেতনে বসন্তোৎসব নামে পরিচিত। কবির জীবদ্দশা থেকে এ উৎসব নানা আয়োজনে পালিত হয়ে আসছে।
কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানেও হোলি এসেছে বারবার।

বলা হয়, শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে ফাল্গুনী পূর্ণিমায়, অর্থাৎ দোলে। আবার ১৪৮৬ সালের এই পূর্ণিমা তিথিতেই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জন্মগ্রহণ করেন বলে একে গৌর-পূর্ণিমা নামেও অভিহিত করেন বৈষ্ণব বিশ্বাসীরা। তবে এর মূল তাৎপর্য হলো রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের উপাখ্যানে। ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথির এ দিনে বৃন্দাবনের নন্দন কাননে শ্রীকৃষ্ণ আবির ও গুলাল নিয়ে তার সখী রাধা ও তেত্রিশ হাজার গোপীর সঙ্গে রঙ ছোড়াছুড়ির খেলায় মেতে ছিলেন। এর স্মরণে এ দিন সকালে ভগবানকৃষ্ণ ও রাধার বিগ্রহ আবির ও গুলালে স্নান করিয়ে দোলায় চড়িয়ে কীর্তন গানসহকারে শোভাযাত্রা বের করা হয়। এরপর কৃষ্ণভক্তরা আবির ও গুলাল নিয়ে পরস্পর রঙ খেলেন।

রাধা-কৃষ্ণকে ঘিরে যে কাহিনী বেশি প্রচলিত- শ্রীকৃষ্ণ এক দিন বৃন্দাবনে রাধা এবং তার সখীদের সঙ্গে খেলা করছিলেন। সে সময় হঠাৎ রাধা এক বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হয়ে লজ্জিত হন। শ্রীকৃষ্ণ রাধার লজ্জা ঢাকতে এবং বিষয়টি তার সখীদের কাছ থেকে গোপন রাখতে; রাধা তার সখীদের সঙ্গে আবির খেলা শুরু করেন। তাদের সবাইকে আবির দিয়ে রাঙিয়ে দেন। সেই ঘটনা থেকেই দোল খেলার উৎপত্তি।

রঙের হোলি; বসন্ত-বাহার: ঋতুচক্রের শেষ উৎসব ‘দোল’। পাতাঝরার সময়, বৈশাখের প্রতীক্ষা। এই সময় পড়ে থাকা গাছের শুকনো পাতা, তার ডালপালা একত্রিত করে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে এক সামাজিক তাৎপর্য রয়েছে। পুরনো জঞ্জাল, রুক্ষতা, শুষ্কতা সরিয়ে নতুনের আবাহন হচ্ছে এই হোলি।

প্রাচীনকালে দোলপূর্ণিমার রাতে বিবাহিতা নারীরা পূর্ণচন্দ্রের পুজো করতেন পরিবারের সুখ ও সমৃদ্ধির কামনায়। এই উৎসবকে ‘কাম মহোৎসব’ বলা হত। দক্ষিণ ভারতেও হোলির দিন কামদেবের পুজো হয়। জয়দেব, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস- সকলেই হোলির কৃষ্ণপ্রেমে শরীরকে চিহ্নিত করেছেন।

প্রকৃতি-জীবন থেকে সবটুকু রঙের নির্যাস জড়ো হয় প্রাণে-মনে। হোলি উৎসব তাই মহামিলনের। এ হল রাধাকৃষ্ণের নিরন্তর কামক্রীড়া অথবা প্রেমের খেলা।

ফাগুনে ‘দোল’ মানে প্রকৃতির চাষবাস শরীরে। দোলের রং খেলা মধ্য দিয়ে শরীরে মেশে কচি নিমপল্লব, বিল্ব, অশোক, শিরীষ, আম ও বকুলের মুকুল, পলাশ, কুমকুম, কাঁচা হলুদ, পিয়াল ফুলের রেণু, চন্দন চূর্ণ। এসব ভেষজ গাছগাছালি, কুসুম, গুল্ম থেকে সনাতনী প্রথায় রং নিংড়ে গায়ে লেপন করলে ভাল ফল পাওয়া যায়- সে তো আদিস্বীকৃত। সবই বসন্তরোগ প্রতিরোধক। উত্তুরে হাওয়ার পর ‘দখিনা বাতাস’- এই যে ঋতুবৈচিত্র, সেখানেই শক্ত দাওয়া হয়ে আসে হোলির খেলা।

২১ মার্চ বৃহস্পতিবার ২০১৯

 


লেখক: সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী

 


oranjee