ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৬ ভাদ্র ১৪২৬

 
 
 
 

ইংরেজদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলায় দুর্গাপূজা

গ্লোবালটিভিবিডি ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৬, ২০১৮

কোম্পানি আমলে দুর্গোৎসবের স্কেচ

অরিন্দম ঘোষাল:  ‘এবার পূজার সময় লর্ড ক্লাইভ আমার বাড়িতে অনুগ্রহপূর্বক প্রতিমা দর্শন করিতে আসিবেন। তাঁহার সহিত কোম্পানির গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকবে। তোমার আসা চাই’- শোভাবাজার রাজবাড়ির রাজা নবকৃষ্ণ দেব মহাশয় বন্ধুকে চিঠিতে লিখছেন। হ্যা, ১৭৫৭ সালে রাজা নবকৃষ্ণ দেব বসন্তকালীন দুর্গাপূজাকে শরৎকালে তার শোভাবাজার রাজবাড়িতে প্রথম শুরু করেন। তবে এর পেছনে ছোট্ট ইতিহাসটা বলা দরকার।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশির যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভের হাতে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। সেই পরাজয়ে সবচেয়ে খুশি হওয়া ব্যক্তিরা হলেন, নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র ও কলকাতার রাজা নবকৃষ্ণ দেব। ক্লাইভের পরামর্শে তারা পলাশির যুদ্ধের বিজয় উৎসব করেন দুর্গোৎসবের মাধ্যমে। আর তাতে তারা প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। এরপর থেকে প্রতিবছর শরৎকালে দুর্গাপূজা করে, তারা পলাশির যুদ্ধের স্মারক উৎসব পালন করতেন। আরও মজার ব্যাপার হলো, তাদের মতো করে অন্য হিন্দু জমিদার বা ব্যবসায়ীরাও শরৎকালে দূর্গোৎসব পালন করতে থাকেন।

অবাক করা ব্যাপার হলো, ক্লাইভ নিজে খ্রিস্টান ও মূর্তিপূজার বিরোধী হয়েও ১৭৫৭ সালে নবকৃষ্ণের নবনির্মিত ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপূজায় একশো এক টাকা অনুদান আর ঝুড়ি-ঝুড়ি ফলমূল পাঠিয়েছিলেন। শুধু কি তাই? সেবার নবকৃষ্ণের বাড়িতে ক্লাইভের জন্য বাইজি নাচের ও মদ-মাংসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আর প্রথম শরৎকালে এই দুর্গার মূর্তিপূজার ক্লাইভের পূজাতেই পরিণত হয়েছিল। তবে প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা ভালো, শরৎকালে দুর্গাপূজার ব্যাপারে পুরাণ বা রামায়ণের পূজা ব্যতিরেকেই এই আলোচনা। এই দুর্গাপূজার পর পরবর্তীকালে কলকাতার বাবুদের দুর্গাপূজাতে সাহেবদের উত্তরোত্তর ভিড় বেড়েছিল। সেসময় পূজার নিমন্ত্রণের ত্রুটি ঘটতো না। কার্ডের ব্যবস্থা ছিল। জানা গেছে, বাবুদের সঙ্গে যাদের সাক্ষাৎ বা ব্যবসায়িক যোগাযোগ নেই তাদেরও পূজাতে আমন্ত্রণের জন্য আকর্ষনীয় বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। আসলে পূজাটা বাবুদের নামে হলেও দুর্গোৎসবটা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাহেবদের পূজা। ১৭৬৬ সালে হলওয়েলের লেখা ‘Interesting Historical Events’ ’ বইতে দেখা যায়- দুর্গাপূজা জেন্টুদের বা বাবুদের সবচেয়ে গ্র্যান্ড বা জমকালো উৎসব। সাধারণত সাহেবরাও এই উৎসবে যোগদান করার জন্য আমন্ত্রিত হন।

আবার কোম্পানির আর এক সাহেব দুর্গাপূজা করতেন নিজের টাকায়। অবাক করা হলেও সত্য হান্টারের ‘Annals of Rural Bengal’- এর বিখ্যাত ম্যানুফ্যাকচারার জন চিপস সাহেব। বীরভূমের জনপ্রিয় শ্রীযুত চিক বাহাদুর। ১৭৮৭ সালে তিনি কোম্পানির অডিটর জেনারেল হয়ে বীরভূমে যান। তিনি থাকতেন শান্তি নিকেতনের কাছাকাছি সুরুলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অফিস ছিল সোনামুখীতে। রায়পুরের লর্ড সিংহদের বংশের শ্যামকিশোর সিংহ ছিলেন চিপসের দেওয়ান। চিপস কোম্পানির পাশাপাশি তিনি নিজেও ব্যবসায় শুরু করেন। কিন্তু ব্যবসায় ভালোমতো হচ্ছিলো না। ঝোপবুঝে শ্যামকিশোর তখন চিপসকে দুর্গাপূজার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সাহেবেরও দুর্গোৎসব সম্পর্কে ধারাণা ছিল। তিনি শ্যামকিশোরের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান। সুরুলে কোম্পানির দেওয়া সাহেবের কুঠিতে ধুমধামে পূজার শুরু হয়। চিপস সাহেবের পূজাবাবদ বছরে খরচ হতো পঞ্চাশ টাকা। পূজার খরচ সতেরো টাকা, বাকি টাকায় গাঁয়ের লোকেরা নতুন কাপড় পেত। মহাঅষ্টমীর দিন পেট ভরে খাওয়া-দাওয়া হতো। কোম্পানি আমলের শেষের দিকে দুর্গোৎসব নতুন কালচারের একটা প্রধান অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। ক্লাইভ, হেস্টিংস, হলওয়েল, চিপস প্রমূখ সাহেবের যুগে শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ, আন্দুলের রাজা রামচাঁদ রায়, রাজা গোকুলচন্দ্র ঘোষাল, দ্বারকানাথ ঠাকুর, গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ প্রমূখ রাজার দ্বারা বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ জাতীয় উৎসব ‘গ্র্যান্ড ফিস্ট অব দি জেন্টুস’-এ পরিণত হয়েছিল। ১৭৯২ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘ক্যালকাটা ক্রনিকল’ দূর্গোৎসবের বিবরণ প্রসঙ্গে কয়েকটি বিখ্যাত বাড়ির নাম উল্লেখ করা হয়। তাদের মধ্যে রাজা নবকৃষ্ণ, কেষ্টচাঁদ মিত্র, নারায়ণ মিত্র, রামহরি ঠাকুর, বারাণসি ঘোষ, দর্পনারায়ণ ঠাকুরের নাম করে বলা হয়- Call it diversion and the pill goes down, সেই সময় সাহেবদের দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ করা নিয়ে ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে দুর্গাপূজার প্রতিযোগিতা হয়ে থাকতো।

১৭৯২ সালের ২৫ শে সেপ্টেম্বর আবার ‘ক্যালকাটা ক্রনিকল’ পত্রিকায় মহারাজা সুখময় রায়ের বাড়ির নাচ সভার বিবরণ ছিল- এ বছরের নতুনত্ব ছির হিন্দুস্থানি গানের সঙ্গে ইংরেজি সুর মিলিয়ে পরিবেশন-- `The Only novelty that rendered the entertainment different from those, of last year was the introduction, or rather the attempt to introduce some English Tunes among the Hindustani music’, মহারাজা নবকৃষ্ণের বাড়ির দুর্গোৎসব সম্পর্কে কেরি সাহেব বলেছেন- The Majority of company crowed to Raja Nobokessen’s where several mimics attempt to imitate the minion of different nation. আবার বঙ্গদূত কাগজে পাই- ‘মহারাজ নবকষ্ণ বাহাদুরের দুই বাটিতে নবমীর রাত্রে শ্রীশ্রীযুক্ত গভর্নর আর সেই সময় সাহেবদের দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ করা নিয়ে ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে দুর্গাপূজার প্রতিযোগিতা হয়ে থাকতো। জেনারেল লর্ড বেন্টিঙ্ক বাহাদুর ও প্রধান সেনাপতি শ্রীশ্রীযুক্ত লর্ড কাম্বরমির ও প্রধান প্রধান সাহেব লোক আগমন করিয়াছিলেন।’ ১৮১৯ সালে ‘ক্যালকাটা জার্নাল’-এ খবর পুজো আসছে।

মহারাজ রামচন্ত্র রায় এবং রোস্টম ডস মল্লিকের বন্ধুরা- may indulge in an anticipation of the highest gratification from the amongments which these gentlemen have respectively made to rener their mansions the scene jocund festively and vasised amusements,’ এই প্রেসিডেন্সিতে ইতিপূর্বে কেউ কখনো দেখেনি এমন সব সুগায়িকাদের বিপুল অর্থব্যায়ে আনা হচ্ছে। নিকি নাচবে, পূর্বদেশীয় আর একটি ‘লিয়াস’ আসছে। সে মনোহারিণী নুরবকসৃইত্যাদি। পুজার পরে রিপোর্ট বের হলো। এবার রিভিউর পালা। ‘ক্যালকাটা গেজেট’ এ খবর-আমরা শুধু এতোটুকুই বলবো যে- Their endemour to Please kept pace to with their intentions, যে ঘরগুলোতে ইউরোপীয়ানদের অর্ভ্যার্থনা করা হয়েছিল সেগুলো সত্যিই ‘সুপার্বলি ডেকরেটেড’ প্রাচ্যের জাঁকজমকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইউরোপীয়ান রুচি ইত্যাদি। আর নাচ? রামচন্দ্রের বাড়িতে যেমন নিকি নেচেছে, তেমনি রুপচাঁদ রায়ের বাড়িতে নেচেছে বুবুন (জনৈকা কাশ্মীরি সুন্দরী)। 

শ্রীমতি ফ্যানি পার্কস তার ‘ভ্রমণ বৃত্তান্ত’ অংশে ১৮২৩ সালের দুর্গোৎসব প্রসঙ্গে লিখেছেন- ‘সেদিন দুর্গাপূজার দেখতে গিয়েছিলেন একজন বণিক বাঙালিবাবুর বাড়ি। ‘দূর্গা’ নামের হিন্দুদের যে দেবী আছেন তারই ‘অনারে’ এই উৎসব হয়, বাবুর চারমহলা বাড়ি, মধ্যিখানে বিরাট উঠোন। সেই উঠোনের একপাশে উঁচু মঞ্চের ওপর দেবী দুর্গার সিংহাসন পাতা।...পূজা ম-পের পাশের একটি বড় ঘরে নানা রকমের উপাদেয় সব খাদ্যদ্রব্য প্রচুর পরিমাণে সাজানো ছিল। সবই বাবুর ইউরোপীয় অতিথিদের জন্য বিদেশি পরিবেশক ‘মেসার্স গ্যান্টার অ্যান্ড হুপার’ সংগ্রহ করেছিল। খাদ্যের সঙ্গে বরফ ও ফরাসী মদও ছিল প্রচুর। ম-পের অন্যদিকে বড় একটা হলঘরে সুন্দরী সব পশ্চিমা বাইজিদের নাচগান হচ্ছিল এবং ইউরোপীয় ও এদেশিয় ভদ্রলোকেরা সোফায় হেলান দিয়ে চেয়ারে বসে সুরা সহযোগে সেই দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। বাইরেও বহু সাধারণ লোকের ভিড় হয়েছিল বাইজিদের গান শোনার জন্য। দুর্গাপূজার কয়েকদিন আগে বাড়ির সরকার মহাশয়রা ছুটি নিয়ে দেশঘরে চলে যান। আর ধনী বাঙালিবাবুরা পূজার সময় যে পরিমাণ অর্থব্যায় করেন তার হিসেব নেই’।

১৮২৫ সালের ‘গভর্মেন্ট গেজেটে’ আছে- ‘গোপীমোহন দেবের বাড়িতে নাচবার জন্য সুদূর ব্রহ্মদেশ থেকে একদল সুন্দরী ও সুগায়িকা নর্তকী আনা হয়েছে। তবে আস্তে আস্তে সাহেবদের দুর্গোৎসবে অংশগ্রহণ নিয়ে নানান সমস্যা দেখা দেয়। ফলে দুর্গোৎসবের সেই সমারোহে ভাটা পড়ে। ১৮২৯ সালের খবরে প্রকাশ- পূর্বে এই দুর্গোৎসবে যে রূপ সমারোহ, নৃত্যগীতাদি এক্ষণে বৎসরে ২ ক্রমে এই সমারোহ ইত্যাদিও হৃাস হইয় আসিতেছে। এই বৎসর নৃত্যগীতাদির যে প্রচার সমারোহ হইয়াছে ইহার পাঁচগুণ ঘটা হইত এমত আমাদের স্মরণে আইসে।’ ১৮২৯ সালের ১৭ অক্টোবর ‘সমাচার দর্পন’- এ পাই রাজা কৃষ্ণচন্দ্র প্রথমত এই উৎসবে বড় জাঁকজমক করেন এবং তাঁহার এই ব্যাপার দেখিয়া ক্রমে ক্রমে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের আমলে যাহারা ধর্মশালী হইলেন তাঁহারা আপনাদের দেশাধিপতিদের সক্ষমে ধনসম্পত্তি দর্শাইতে পূর্বমত ভীত না হওয়াতে তদ্দুষ্টে এই সকল ব্যাপারে অধিক টাকা ব্যয় করিতেছেন’-আসলে সাহেবদের নেটিভদের পূজোয় বা আনন্দভোজে যোগ দেওয়া একটা শিষ্টাচারের মধ্যে ছিল। কোম্পানি তখন হিন্দুদের মন্দির তদারকি করত, ভক্তদের প্রণামী সংগ্রহ করত। প্রতিদিন ঠিকমত পূজা বা ধুনো দেওয়া হচ্ছে কিনা সাহেব কর্মচারীদের কর্তব্য ছিল সে সব খবরদারি করা।

১৮৩২ সালে দুর্গোৎসবে জাঁকজমক আরও কমে আসে। ‘সমাচার চন্দ্রিকা’-তে প্রকাশ- শ্রীশ্রীপূজায় যে ঘটা কলিকাতায় হইত এক্ষণে তাহার ন্যুন হইয়াছে, কেননা গোপীমোহন ঠাকুর ও মহারাজা সুখময় রায়বাহাদুর এবং বাবু নিমাইচন্দ্র মল্লিক প্রভৃতি বাটীর সম্মুখে রাস্তার প্রায় পূজার তিন রাত্রিতে পদব্রজে লোকের গমনাগমন ভার ছিল যেহেতুক ইঙ্গরেজ প্রভৃতির লোকের শটকাদিরও যানবাহনের বহুল বাহুল্য পথ রোধ হইতো।’ ১৮৩৩ সালের ২রা নভেম্বর ‘সমাচার চন্দ্রিকা-তে পাই-‘যবনাটিকার কালে পশ্চিম অঞ্চলে অল্প হইল এ প্রদেশে বহুতর হিন্দু জমিদার আর রাজাই বা কহ ইহারা থাকতে উক্ত কর্মলোপ হয় নাই। বিশেষ নদীয়া, নাটোর, বর্ধমান এই তিন-চারিজনের রাজ্যের অধিকারে প্রায় বঙ্গদেশের বিভক্ত ইহারদিগের অধিকারের ম্েয যে ব্যক্তিত্ব কিঞ্চিৎ সংস্থান হইত তিনি পূজার না করিলে রাজারা তাঁহার দিগকে ডাকাই আজ্ঞা দিতেন পূজা অবশ্যই করিবা।’

আস্তে আস্তে দুর্গোৎসবে সাহেবদেও আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। হিন্দুদের উৎসবে খ্রিষ্টানদের যোগ দেওয়া সঙ্গত কি না, কলকাতার ইংরেজদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক প্রথম থেকেই চলছিল। এই সময় আরও বেড়ে যায়। ১৯৩৩ সালে কোম্পানি ঘোষণা করল-হিন্দুদের মন্দিরাদি থেকে সরকারিভাবে হাত উঠিয়ে নিচ্ছে তারা। ১৮৩৭ সালে বন্ধ হয়ে গেল হিন্দুদের উৎসবে তোপ দাগা। ১৮৪০ সালে বিখ্যাত দশ নম্বরি আইন এল। সেই আইন হল-নেটিভরা প্রজা, আমরা রাজা, তাঁেদর ধর্ম তাদের, আমাদের ধর্ম আমাদের।

তথ্য সহায়তা
কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত; বিনয় ঘোষ (১ম খ-)
কলকাতা; শ্রীপান্থ
কলকাতার কথা; রায়বাহাদুর প্রমথনাথ মল্লিক
কলকাতা বিচিত্র; রাধারমণ রায়

লেখক: পশ্চিমবঙ্গের নন্দিত লেখক

এসএনএ

 


oranjee