ঢাকা, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৩১ ভাদ্র ১৪২৬

 
 
 
 

পবিত্র আশুরার তাৎপর্য ও ফজিলত

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৪১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯

ফাইল ছবি

সাইফুল ইসলাম : হিজরি বা আরবি বছরের প্রথম মাস মহররম। কোরআন ও হাদিসে যে চারটি মাসকে সম্মানীত বলে ঘোষণা করা হয়েছে মহররম এর মধ্যে অন্যতম। এ মাসে সে সময়ে যুদ্ধ নিষিদ্ধ ছিল। আর ১০ মহররমই আমাদের কাছে আশুরা হিসেবে পরিচিত। ইসলামে দিনটির অনেক গুরুত্ব রয়েছে।

আশুরার দিনেই মহান আল্লাহ তায়ালা পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। এ দিনটিতেই কিয়ামত সংগঠিত হবে। নিষিদ্ধ গন্ধম খাওয়ার দায়ে জান্নাত থেকে আদম ও হাওয়াকে (আ.) পৃথিবীতে পাঠানোর পর দীর্ঘ সময় একে অপরকে খুঁজে বেড়িয়েছেন প্রথম মানব জুটি। দীর্ঘ ৪০ বছর কান্নার পর শেষ পর্যন্ত এই আশুরার দিনেই আল্লাহ তাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন।

এছাড়া বড় বড় ও বিশেষ বিশেষ সৃষ্টি আল্লাহ তায়ালা আশুরার দিনেই করেছেন। কেবল শেষ যুগেই নয় সবযুগে আশুরার একটি বিশেষ মর্যাদা ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতের পরে মদিনায় এসে ইহুদিদের রোজা রাখতে দেখেন। তিনি তাদেরকে রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা জানান, আল্লাহ তায়ালা বনি ইসরাইলকে এ দিন তাদের দুশমনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন অর্থাৎ ফেরআউন ও তার দলবলকে আল্লাহ তায়ালা এই আশুরার দিনেই নীলনদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে মুসা (আ.) এ দিনটিতে রোজা রাখতেন। পাশাপাশি মুসলিমদেরকে রোজা রাখার আদেশ দেন।

পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেকে মুসার সবচেয়ে বেশি অনুসারী বলে এ দিন রোজা রাখা শুরু করেন। তবে ইহুদিদের মতো শুধু একদিন নয়, মুসলিমদের মহররমের রোজা দুটি রাখা সুন্নাত। তিনটিও রাখা যায়। এছাড়া রমজান মাসের পর যত বেশি নফল রোজা মহররমে রাখা যায় ততই উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজানের পর আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে মহররম মাসের রোজা।

এদিকে পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। জাতীয় দৈনিকগুলো আশুরা নিয়ে বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। শনিবার আশুরা উপলক্ষে দৈনিক পত্রিকা অফিস বন্ধ রয়েছে। সে কারনে রোববার কোন দৈনিক প্রকাশিত হবে না। অপরদিকে বিটিভি, বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, বাংলাদেশ বেতার ও এফএম ব্যান্ড রেডিও বিশেষ অনুষ্ঠানামালা প্রচার করছে।

আশুরার দিনের ঐতিহাসিক ১০টি ঘটনা:

এক. হযরত ইকরামার (রা.) বর্ণনামতে হযরত আদম (আ.) এর দোয়া আল্লাহ তায়ালা আশুরার দিনে কবুল করেছেন এবং ঐদিন তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেছেন। ঐ দিনই তিনি দুনিয়াতে জন্মগ্রহণ করেছেন।

দুই. এই দিন হযরত ইবরাহিম (আ.) জন্ম লাভ করেন।

তিন. হযরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে এদিন মুক্তি লাভ করেন।

চার. হযরত ইউসুফকে (আ.) কুপ থেকে বের করা হয় আশুরার দিনে।

পাঁচ. হযরত নূহ (আ.) এর কিস্তি (নৌকা) মহাপ্লাবন থেকে মুক্তি লাভ করে জুদী পর্বতে এসে অবতরণ করে আশুরার দিনে।

ছয়. হযরত আইয়ুব (আ.) তার জটিল রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেন পবিত্র আশুরার দিনে।

সাত. হযরত মুসাকে (আ.) আল্লাহ তায়ালা এই দিনে ফেরআউনের বিরুদ্ধে সাহায্য করেছেন। নীলনদের বুকে তার জন্য রাস্তা করে দিয়েছেন এবং ফেরআউনের সেনাবাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছেন।

আট. হযরত দাউদ (আ.) এর তাওবা কবুল হয় এবং ইয়াকুব (আ.) কে দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেয়া হয় পবিত্র আশুরার দিনে।

নয়. হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহর অসীম কুদরতে পিতার ঔরশ ব্যতীত মাতৃগর্ভ হতে জন্মলাভ করেন এবং এই দিনই তাকে বনি ইসরাইল এর হাত থেকে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।

দশ. রাসুলুল্লাহ (সা.) এর আগের-পরের সব ভুলত্রুটি মাফ করে দেওয়া হয় পবিত্র আশুরার দিনে। ঐ দিন হযরত সুলাইমান (আ.) সাম্রাজ্যের রাজত্ব লাভ করেন। হযরত ইদ্রিস (আ.) জান্নাতে প্রবেশাধিকার লাভ করেন।

আশুরার রোজার ফজিলত:

পবিত্র আশুরার দিনে আল্লাহ তায়ালা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য এ দিন রোজা রাখার অনেক ফজিলত রয়েছে। সৃষ্টির শুকরিয়া ও মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোই এ রোজার মূল উদ্দেশ্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আশুরার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর দরবারে আশাবাদী। এতে তিনি পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) রোজা রাখার জন্য এতো বেশি আগ্রহী হতে দেখিনি, যতটা দেখেছি আশুরার দিনের রোজা ও এই মাসের (রমজান) রোজা রাখার প্রতি।

এছাড়া রাসুলুল্লাহকে (সা.) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল আশুরার রোজা সম্পর্কে, জবাবে তিনি বলেন আশুরার রোজা হচ্ছে নফল রোজার মধ্যে সর্বোত্তম রোজা। হযরত আলীকে (রা.) একব্যক্তি জিজ্ঞাসা করলেন, রমজান মাস ছাড়া কোন মাসের রোজা সম্পর্কে আমাকে আদেশ করবেন। জবাবে তিনি বললেন, আমার উপস্থিতিতে নবীকে (সা.) কেউ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল। তিনি (সা.) বলেছেন, রমজান মাস ছাড়া যদি অন্য মাসে রোজা রাখতে চাও তবে মহররমে রোজা রাখ। কারণ এটি আল্লাহ তায়ালার মাস।

আশুরায় করণীয় ও বর্জনীয়:

পবিত্র আশুরা উপমহাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের প্রথা বেশি। ইরানে দিনটিকে পূজা করা হয়। অন্যান্য মুসলিম দেশে আনুষ্ঠানিক কিছু করা হয় না। তবে আশুরায় রোজা রাখেন প্রায় সব দেশের মুসলিমরাই। সরকারিভাবে আমাদের দেশে আশুরা উপলক্ষে ছুটি ঘোষণা করা হয়। অন্যান্য দিনের মতো আশুরার দিনে সব ধরনের নফল ইবাদত করা যেতে পারে। পাশপাশি আশুরার রোজার ফজিলত তো উল্লেখ করা হয়েছে। ইহুদি-নাসারাদের সাথে যাতে মিল না হয় এজন্য আশুরার আগের দিন অর্থাৎ ৯ ও ১০ মহররম রোজা রাখতে বলেছেন রাসুলুল্লাহ (সা.)।

আশুরার দিনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা হচ্ছে ইয়াযিদ কর্তৃক রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রিয় নাতী ইমাম হোসাইনকে (রা.) কারবালার ময়দানে নির্মমভাবে হত্যা। আমাদেরকে দোয়া করতে হবে ইমাম হাসান ও হোসাইন (রা.) এর জন্য। তবে এ জন্য কোন ধরনের বিদআদ, হালুয়া উৎসব, তাজিয়া মিছিল ও হায় হাসান, হায় হোসাইন বলে রক্তপাত করা যাবে না। এগুলো ইসলামে নিষিদ্ধ। ইসলাম নির্দেশিত পথ ব্যতিত অন্যভাবে শোকপ্রকাশ বিদআত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সকল বিদআত গোমরাহি, আর সকল গোমরাহির স্থান জাহান্নাম।

এসআই/এমএস


oranjee