ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯ | ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

এই শোক শক্তি হোক, এই জল সংহতি বাড়াক

গ্লোবালটিভিবিডি ১:৪১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১২, ২০১৯

প্রতীক ইজাজ : নুসরাতের মৃত্যুতে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। ভেবেছিলাম শেষঅবধি মেয়েটা বাঁচবে। বাঁচলো না। ওর ব্যান্ডেজে মোড়ানো চেহারাটা কেবলই চোখে ভাসছে। সোনাগাজীতে ওর জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছে। গোটা দেশে প্রতিবাদ হচ্ছে। বিচারের দাবিতে মিছিল করছে মানুষ। ব্যক্তি থেকে সামষ্টিকভাবে বিষন্ন দেশ।

নুসরাতের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। তদন্তে গাফিলতি হলে হস্তক্ষেপ করার ঘোষণা দিয়েছেন হাইকোর্ট। দ্রুত আইনে বিচার ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রী।

তবুও মানতে চাইছে না মন। রাজনীতি যেভাবে সবাইকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে ক্ষমতায়; কাউকে কিছু বলা যায় না এখানে। সবারই শক্তি রাজনীতি; রাজনৈতিক প্রভাব। এই যে মেয়েটাকে দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানী করছে ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ; সবাই জানতো। কিন্তু কেউ কিছু বলার সাহস পায়নি। কারণ ওই মাওলানা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। শেষবার মেয়েটা যখন প্রকাশ্য প্রতিবাদ করে, ঠিক তখনই আগুনে পুড়িয়ে মারার মতো বর্বর সিদ্ধান্ত নেয় মাওলানা সিরাজ উদদৌলা। আগুনে পুড়িয়ে মারে মেয়েটাকে। নুসরাত বাঁচতে পারলো না।

নুসরাতের জন্য সত্যিই মনটা খুব খারাপ লাগছে। কিছুতেই মন বসছে না। ভাবছি, কী হবে এত সব করে। এই যে জাগরণের গান, প্রগতিশীল কবিতা, মু্ক্ত গদ্য, কোনকিছুই তো কাজে লাগছে না। এত ভালো ভালো কথা, আড্ডা, বক্তৃতা, সুন্দর চেহারা, পরিপাটি বেশভূষা- কী লাভ এসবে এ দেশে! আমরা তো ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছি। ঘরে বাইরে, অফিসে কর্মে, বন্ধূ স্বজনে- অসভ্য হচ্ছি।

একজন মাওলানা, সারাদিন যে নামাজ পড়ে, মুখে দাঁড়ি, আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় একটি মাদ্রাসার প্রধান, যারা দায়িত্বই হচ্ছে দ্বীনের পথে মানুষকে নেওয়া; সেই লোক কি না তার মেয়ের বয়সী একজন ছাত্রীকে যৌন নিযাতন করে, তার পাশবিক প্রবৃত্তিতে রাজি না হওয়ায়, প্রতিবাদ করায়, শেষ পযন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারে। ভাবা যায়, দেশ মানুষ কতটা নীচে নেমে গেছে; কতটা!

কিংবা এই অসভ্য মাওলানাকে যারা সমর্থন করলো, ওকে বাঁচাতে নানা চেষ্টা তদ্বির করলো, তারাইবা কিভাবে এ অন্যায় মেনে নিল, নেয়। একবারও কি ভাবলো না, ওদের প্রত্যেকের ঘরে নুসরাতের বয়সী অন্তত একটা করে মেয়ে আছে। আজ যদি নিজের মেয়েটাকে এমন করে মেরে ফেলত কেউ, কেউ যদি যৌন নিপীড়ন করতো, অসভ্য আচরণ করতো, আমরা কী মেনে নিতে পারতাম বাবা হিসেবে!

আমি জানি না। কিছুই ভাবতে পারছি না। আমার শুধু একটাই চাওয়া বিচার। আমি চাই অন্তত এই ঘটনার এমন দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক সবার, যাতে আর কোন পক্ষই ভবিষ্যতে আর এমন ঘটনা ঘটানোর সাহস না পায়। নতুবা নুসরাতরা এদেশে কখনো নিরাপদ হবে না। নুসরাতদের স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা হবে না।

আমি নুসরাত হত্যার বিচার চাই। আশা করছি, এ বিচারের মধ্য দিয়ে ভীতি বিহ্বল শত শত নুসরাতরা নিরাপদে বেঁচে থাকার, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার শক্তি ও সাহস পাবে। আমরা সত্যিকার অর্থেই সাম্য সমতার রাষ্ট্র পাবো।

নুসরাতের জন্য মানুষের শোক ও চোখের জল প্রগতির শক্তি হোক। মানুষ আরো সাহসী হোক। আমাদের সংহতি ও সম্প্রীতি ডানা মেলুক আকাশে।

যে আগুন পুড়িয়ে মারলো নুসরাতকে, সেই আগুনে দগ্ধ হোক এখনো আড়ালে প্রকাশ্যে টিকে থাকা পাশবিকতা; পশুপ্রবৃত্তি।

নুসরাত, তুমি গভীর শোকক্ষত হয়ে রইলে বোন আমাদের।

 


লেখক: সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী


oranjee