ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

 
 
 
 

আপনার গানে জেগে থাকি প্রেমে বিপ্লবে

প্রতীক ইজাজ ৪:০১ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০১৯

শৈশবে বাসায় বোনদের কণ্ঠে গানগুলো শুনতাম। সুর কথা টানতো। বড় হয়ে বুঝলাম। দেখলাম শিল্পীকে। তাঁর চোখে কী অদ্ভুত মায়া! কী তার দীপ্ত কণ্ঠ! টেলিভিশনে বা মঞ্চে যখন তাকাতেন তিনি সটান দর্শকদের চোখে, শূন্যে; চোখের উজ্জ্বল দ্যুতি, গাইবার ভঙ্গি, মিশে যাওয়া গানের কথায় সুরে- সাধ্য কার উপেক্ষা করে তাকে; তার সেই উদাত্ত কণ্ঠকে! তাকে ঘিরে এক ধরণের ভাবালুতা পেয়ে বসে। কান তো শোনেই; তার গান, সুললিত কন্ঠ, দীপ্ত উচ্চারণ- জাগিয়ে তোলে মনকে।

হ্যাঁ, আপনার গান আমাদের জাগিয়ে তুলতো, তোলে শ্রদ্ধেয় শাহনাজ রহমতুল্লাহ। আপনি কিংবদন্তি শিল্পী। আমরা আপনাকে দেখতাম যত না সুরে গানে, তার চেয়ে বেশি জাগরণে। আপনি যে গানগুলো গেয়েছেন, সেগুলো নিছক সেলুলয়েডের ফিতায় নির্বাক বা সবাক চিত্রায়ন নয়; সেগুলো আমাদের কাছে স্লোগান। আমরা আপনার গাওয়া গানগুলো গাই ভেতরে নিবে যাওয়া আগুন নতুন করে জ্বালাতে, তেজিয়ে তুলতে। আপনি আমাদের ঘুম তাড়ানিয়া দেশপ্রেমের আগুনমুখ, ফুলপাখি।

আপনার গান আমাদের মনে সেই কৈশোরেই প্রেম জাগাতো; শোভন লজ্জামুখ প্রেম। বলতে পারছি না; মনে কষ্ট পাচ্ছি; সামনে দিয়ে গেলেও পুরো চোখ মেলে তাকাতে পারছি না; কিশোর-কিশোরীর এমন প্রেম। তখন সেই মিষ্টি গানগুলো আপনি গাইতেন আমাদের ঠোঁটে, মনে, শরীরজুড়ে জেগে ওঠা শিহরণে।

আপনার এই চলে যাওয়ায় আমরা কষ্ট পেয়েছি ঠিকই; তবে এটাও তো ঠিক ‘আর কতো গাইবো’। ১৯৬৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রেডিও ও চলচ্চিত্রে গান গাইতে শুরু করেন। ২০১৪ সালে পূর্ণ হয় গানের পঞ্চাশ বছর। তারপর আপনি অন্তরালে চলে গেলেন। আর গান করলেন না। আপনি যদি তাতে শান্তি পেয়ে থাকেন, তাতে আমাদেরও শান্তি। একটা জীবনে এত বিপুল সমৃদ্ধ অর্জন, নিশ্চয় আপনাকে আনন্দিত করেছিল; আমাদের তো বটেই।

২০০৬ সালের মার্চে বিবিসি বাংলার শ্রোতাদের বিচারে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কুড়িটি গান নির্বাচিত হলো। কী অবাক, সেখানে আপনারই গাওয়া চারটি গান! ওই তালিকার ৯ নম্বরে ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’ ১৩ নম্বরে ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, তালিকার ১৫ নম্বর গানটি ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ ও ১৯ নম্বরে‘একতারা তুই দেশের কথা বল’। এর মধ্যে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ তো এদেশের মুক্তি সংগ্রামের এক কালজয়ী গান। এই গানটি স্বাধীন বাংলা বেতারের সূচনা সংগীত হিসেবে তৈরি করা হয় ১৯৭০ সালে। এটি বাঙালির জাতীয় স্লোগানও। ভাবা যায়, এ আপনার জন্য তো বটেই, আমাদের জন্যও কত বড় অর্জন, সম্মান!

বাংলা গান যতদিন থাকবে, বাঙলা ভাষাভাষী মানুষ, এই রাষ্ট্র স্বাধীনতা যতদিন, আপনি বেঁচে থাকবেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। এখনো বিজয় স্বাধীনতা দিবস আসবে, চিরায়তপ্রথা মেনে আগের রাত থেকেই বাজবে আপনার দ্বীপ্ত কন্ঠের সেই কালজয়ী দেশপ্রেম স্বাধীনতার গানগুলো। ট্রাকে বাসে স্টিমারে আপনার গান বাজে, বাজবে। বাতাসে স্রোতে হুইসেলে উড়বে আপনার সুললিত সেই মায়ামাখা কণ্ঠ।

চলচ্চিত্রের গাওয়া আপনার গানগুলো তো সেই কৈশোর থেকেই আমাদের মুগ্ধ করে রেখেছে। এখনও সমান মুগ্ধতায় মানুষ গুনগুন করে গায়। কেজি মুস্তফার লেখা ও রবিন ঘোষের সুরে গেয়েছিলেন ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’। এই গানটা কী মুছবে কোনদিন! জেব-উন-নেসা জামালের কথায়, করীম শাহাবুদ্দিনের সুরে আপনার গাওয়া ‘সাগরের তীর থেকে’ তো বাংলা সেরা আধুনিক গানের একটি। কিংবা মুকুল চৌধুরীর কথায় আর রাজা হোসেন খানের সুরে ‘খোলা জানালায় চেয়ে দেখি তুমি আসছ’- কী বিখ্যাত!

‘ওই আকাশ ঘিরে সন্ধ্যা নামে’, ‘হাসির আড়ালে অশ্রু লুকিয়ে রাখি’, ‘মনে হলো তুমি বলবে আমায় ডেকে’, ‘দুটি আঁখি দুটি তারা’, ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘পারি না ভুলে যেতে স্মৃতিরা মালা গেঁথে’, ‘ মানিক সে তো মানিক নয়’, ‘তুমি সাত সাগরের ওপার হতে আমায় ডেকেছো’ ‘নেশার পাত্রে ঢেলে ফুলের গন্ধ’, ‘দেখা নেই দেখা হলো’, ‘পুরনো আমাকে খুঁজে দুঃখ পাবে’ ‘আমি এই পার্কে আর এই নির্জনতায়’ ‘সাগরের সৈকতে কে যেন দূর হতে’ ‘তোমার আগুনে পড়ানো’ ‘নারে যাব না, যাব না’, ‘আমায় কেন মুক্ত হতে বলো’,‘আজ বাতাসের প্রলাপ শুনে’, ‘মেঘের মলুক চলো না চাঁদেরও দেশে’, ‘আর নেমো না অথৈ জলে’, ‘বাঁশিতে রেখেছি মন’, ‘কে যেন সোনার কাঠি’, ‘আমার কত গান ছিল’।

আপনার গাওয়া সবগুলোই তো বাংলা সেরা গান, এক অসামান্য গান। এখনও আগের মতোই সবুজ সতেজ। এসব গান এ দেশে চিরকালের টান নিয়ে সময় পরম্পরায় জ্বলজ্বলে থাকবে নিশ্চিত।

আপনারা তিন ভাই-বোন ছিলেন তিন নক্ষত্র। আনোয়ার পারভেজ, জাফর ইকবাল ও আপনি শাহনাজ রহমতুল্লাহ। জাফর ইকবাল ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দী রোমান্টিক নায়ক। ভালো গাইতেন তিনি।

আধুনিক গান, সিনেমার গান ও দেশাত্নবোধক গানের অপূর্ব সব সুরসৃষ্টি করে সামগ্রিকভাবে সঙ্গীত জগতে সুবিশাল অবদান রেখে গেছেন আপনার বড় ভাই প্রয়াত আনোয়ার পারভেজ।

আর দুই ভাইয়ের আদরের ছোট বোন আপনি তো দেশাত্মবোধক গানের সম্রাজ্ঞী। রোমান্টিক গানে তো তুলনাহীন।

বাংলা গানে আপনার ঋণ অপরিশোধ্য। আপনি কালজয়ী মানুষ; কিংবদন্তী। আপনি সব্যসাচী গায়ক। একজন শিল্পীর এতগুলো গান এতটা জনপ্রিয় হতে পারে, সে ঘোর আমাদের কাটে না। আপনি বাংলা গানের বিষ্ময় সর্বজনপ্রিয় শাহনাজ রহমতুল্লাহ!

আপনার জন্য আমাদের অন্তহীন শ্রদ্ধা।

 

লেখক: সাংবাদিক, কবি ও সংস্কৃতিকর্মী।


oranjee