ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৬ আশ্বিন ১৪২৬

 
 
 
 

ধুসর মানুষ

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৫২ পূর্বাহ্ণ, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯

অন্ধকার স্যাতস্যাতে ছোট্ট একটা ঘর, জানালার ঘুলঘুলি দিয়ে ছোট্ট একটা আলোর চিকন রেখা ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। মেঝেতে পড়া আলোটা বাঁধা পেয়ে বিচ্ছুরিত হয়েছে সারা ঘরে, খানিকটা আঁধার দূর করার প্রক্রিয়া বলা যায়। সেই বিচ্ছুরিত আলোর হালকা আভায় ঘরের ভেতরে কিয়দংশ দেখা যাচ্ছে খুব আবছা ভাবে, দেখা যাচ্ছে যুগ যুগ ধরে খয়ে যাওয়া, ধুলো পড়া আসবাবপত্রগুলো, একটা চৌকি, একটা পা নড়া টেবিল, একটা পুরনো কাপড় ঝুলানো আলনা । এরকম একটা ঘরেই জন্মে একজন শিল্পী, একজন সংগ্রামী সাধারণ মানুষ যার সারা জীবন কাটে শুধু বেঁচে থাকা আর মেনে নেয়ার সংগ্রামে।

একজন শিল্পী জন্ম নেয় শিল্পী হয়ে, ওর অনু পরমাণুতে বা ডিএনএর কোথাও লেখা থাকে শিল্পের প্যাটার্নগুলো। ঐ সময় ও নিজেও বুঝতে পারেনা ওর আসল পরিচয় কিন্তু ধর্মের কল যেমন বাতাসে নড়ে ঠিক তেমন ওর বুকের ভিতরের অস্থির মনটা একসময় কি যেন করতে চায়, কি যেন বানাতে চায়? এটা বানায়, ওটা বানায়, এটা করে, ওটা করে, কোথাও খুঁজতে থাকে ওর সৃষ্টির স্বস্থি। যে মুহূর্তে কোন একটা বিষয়ে ওর সৃষ্টি স্বস্থির সন্ধান পায় এবং সাথে কিছু মানুষের প্রশংসার চোখ দেখতে পায়, ও ডুবতে শুরু করে প্রক্রিয়াটায়। এই ডুবে যাওয়াটাই ওকে একদিন ভাসিয়ে তুলে একজন শিল্পী করে।

ওর গন্তব্যবিহীন যাত্রা শুরু হয়, অনেক দীর্ঘ এই যাত্রা, অনেক বন্ধুর পথের এই যাত্রা। স্বপ্ন দেখা শুরু হয়, রঙ্গিন স্বপ্ন, স্বপ্নিল স্বপ্ন, অলিক স্বপ্ন। আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে স্বপ্নগুলো, ইচ্ছেরা উড়ে যেতে চায় বিশাল আকাশে, মনকে বেঁধে রাখা হয়ে ওঠে ভীষণ কঠিন। শুধু মনে হয় ‘এইতো, আর একটু, তারপরেই দেখতে পাবো গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের উজ্জ্বল সূর্যোদয়, আলোকচ্ছটায় কানায় কানায় ভরে যাবে জীবন, চারিদিকে ছড়িয়ে যাবে আলোর বন্যাধারা, আলোতে আলোতে ডুবিয়ে দেবো চারিধার।

সব বাধাকে উপেক্ষা করে, সব ‘না’কে ‘হ্যাঁ’ বানিয়ে ছুটতে থাকে ওর স্বপ্নের নৌকা, ও হয়ে ওঠে স্বপ্ন বিলাসী। দর্শক শ্রোতাদের সামান্য জয়ধ্বনিতে কেঁপে ওঠে বুকের ভেতর, শুধু মনে হয় ‘না, এখনও আমি পৌছতে পারিনি গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের সূর্যোদয়ে, আর একটু’। চলার পথ এতোই আড়ম্বরপূর্ণ থাকে যে বুঝে ওঠা যায়না জীবনতরী কোনদিকে ধাবিত। রমরমা চারিধার ওর অস্তিত্বকে কেমন যেন একটা ধুম্রজালে আচ্ছন্ন করে রাখে, ভবিষ্যৎ নামের শব্দটা মন থেকে কোথায় যেন পালিয়ে যায়।

ইতিমধ্যে যদি ও পৌঁছে যায় ওর অভীষ্ট লক্ষে, জীবনের সার্থকতা রচিত হয়। কিন্তু যদি পৌছতে না পারে, তখন যা হয়.........সময় পেরোতে থাকে, আস্তে আস্তে পুরনো হতে থাকে ওর সুতীব্র ইচ্ছাটা। ইচ্ছাটার কোথাও কোথাও জং ধরে, নড়বড়ে হয়ে যায় নাটবল্টুগুলো । শুধুমাত্র প্রানশক্তির শক্তির বিশ্বাসে খোঁড়াতে শুরু করে দেয় পথচলা। দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালি ক্রমেই কমে আসতে থাকে, জীবনটা রুপান্তরিত হয় অনুষ্ঠান শেষে পড়ে থাকা চেয়ারের মতো, দর্শক শিল্পীবিহীন পরিত্যক্ত স্টেজের অযত্নে ঝুলে থাকা সামিয়ানার মতো, ধুলোঝড়ে উড়ে যাওয়া ছেড়া কাগজের মতো । বয়স বাড়তে থাকে, তবু ডি এন এর এই প্যাটার্নগুলো হেরে যাওয়ার নয়, ভীষণ একগুয়ে, হতচ্ছাড়া। একে বোঝানো যায় না। ঠিক ঐ গানটার মতো ‘তারে ভোলানো গেলোনা কিছুতেই, ভুল দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে, বিষের পরশ দিয়ে, ভোলানো গেলোনা কিছুতেই’। ও বুঝতে চায়না যে অভীষ্ট লক্ষে সারা পৃথিবীর মাত্র .০০০১ শিল্পী পৌছতে পারে এবং বাকিদের যাত্রা হয়ে যায় ‘আমিযে আঁধারে বন্দিনী, আমাকে আলোতে ডেকে নাও।’

একসময় ও আবার ফিরে আসে জানালার চিকন আলোর ঘুলঘুলিওয়ালা স্যাতস্যাতে অন্ধকার ঘরে, শতচ্ছিন্ন জামাটা রেখে দেয় পুরনো তালি দেয়া আলনায়, গা এলিয়ে দেয় নড়বড়ে চৌকির এক কোনায়, ইচ্ছা করে মিশে যেতে নিরবে, হারিয়ে যেতে নিরবে।

জীবন হয়ে যায় ধুসর, ঠিক লবলজে দেখা মার্কের মতো, মার্কের পিয়ানোর ওপর রাখা ঝোলাটার মতো, টুপি বা গলায় ঝুলানো মাফলারটার মতো কিংবা ওর ক্লান্ত জ্যাকেটটার মতো, উসকো খুসকো চুল আর অযত্নে লালিত দাড়ির মতো অথবা মার্কের হেরে যাওয়া দুর্বল শরীরে কোটোরাগত ভীষণ চকচকে স্বপ্নে ভরা দ্যুতিময় চোখের মতো। কি অদ্ভুত ছিলো বাজানো, কি অদ্ভুত ঐ কম্পোজিসনটা, ব্যাথায় ভরা কম্পোজিশন ।

জীবন থেকে শরীর হারিয়ে যায়, সামর্থ্য হারিয়ে যায়, সামান্য বেঁচে থাকার আশ্রয়টুকু হারিয়ে যায় কিন্তু হারায় না ধুসর মানুষের কোটোরাগত জ্বলজ্বলে উজ্জ্বল চোখের স্বপ্ন, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চোখ দুটো নিরবে নিভৃতে স্বপ্ন দেখতে থাকে, আবার ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন, আবার নতুন জীবনের স্বপ্ন। তাই কেন যেন মনে হয় প্রতিটা শিল্পীই যেন একজন ধুসর মানুষ, একজন হতচ্ছাড়া স্বপ্নবাজ।


লেখক: আশিকুজ্জামান টুলু, খ্যাতিমান ব্যান্ডশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। গ্লোবাল টিভি লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে গ্লোবাল টিভি-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।
oranjee