ঢাকা, রবিবার, ২১ জুলাই ২০১৯ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

 
 
 
 

সফলতার পাশাপাশি সন্তানকে শেখাতে হবে ব্যর্থতার পাঠও

গ্লোবালটিভিবিডি ৬:৪৭ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০১৯

সংগৃহীত ছবি

সাফল্যের পেছনে অন্যতম হাতিয়ার ব্যর্থতাকে মূল্যবান বিবেচনা করা। সাফল্য জরুরি। কিন্তু কতটা? শতকরা একশো ভাগ নম্বর পাওয়াই কি শুধু জীবনের লক্ষ্য? সম্প্রতি এক দুর্ঘটনার খবরে নড়ে বসেছেন অনেক অভিভাবকই। স্কুলেই আত্মঘাতী এক ছাত্রীর মুখে যেন নিজের সন্তানের ছবি দেখে আঁতকে উঠছেন অনেক মা-বাবাই। কতটা অবসাদ গ্রাস করেছিল সেই টিনএজ মনকে? প্রশ্ন উঠছে সকলের মনে। উত্তর খুঁজতে হবেই। কারণ এর সঙ্গে জুড়ে আছে সন্তানের ভবিষ্যৎ।

সাফল্য কতটা জরুরি?

জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি বটে! কিন্তু প্রত্যেকটা পদক্ষেপে প্রথম হওয়া কি সমান জরুরি? স্পোর্টস, নাচ, গান, পড়াশোনা... প্রতিটি বিষয়ে ছেলেমেয়েদের এক নম্বরে রাখতে প্রতিনিয়ত কতটা কঠোর অনুশাসনে বেঁধে রাখা হয় সন্তানদের? সেটা কখনও ভেবে দেখেছেন? ঘুম থেকে উঠেই স্কুল, স্কুলফেরত কোচিং, ছুটির দিনের সকাল-বিকেলেও চলে আঁকা, নাচ। সবই বাধ্যতামূলকভাবে। এমনকি তার বন্ধুদের নম্বরের তুলনাও তাদের মগজে পুরে দেওয়া হয়। এক-এক সময়ে মা-বাবার গর্ব হয়ে উঠতে ব্যর্থ হয়ে, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে এই অপরিণত বয়স।

সব পরীক্ষায় আশি-নব্বই শতাংশ নম্বর পাওয়ার চাপ তৈরি করা উচিত নয়। প্রথাগত পড়াশোনার বাইরেও এখন অনেক রকমের কেরিয়ার তৈরি সম্ভব। তার মধ্যে রয়েছে পেন্টিং, ডান্স, মিউজ়িক, স্পোর্টস, ফোটোগ্রাফির মতো পেশা। সুতরাং আগে আপনাকে বুঝতে হবে আপনার সন্তান কোন বিষয়ে আগ্রহী। হতে পারে সে গান গাইলে ভবিষ্যতে অসাধারণ গায়ক হতে পারে। কিন্তু আপনি জোর করে তাকে ডাক্তার বানানোর চেষ্টা করছেন। এতে সে না হবে ভাল ডাক্তার, না গায়ক। বরং সে যা হতে চায়, তার জন্য সাহায্য করুন। এতে সন্তানও আপনার উপরেই নির্ভর করতে শিখবে।

প্রয়োজন ব্যর্থতার পাঠও

জীবনে সাফল্য জরুরি, কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। ব্যর্থতার সম্মুখীন হতেও শেখাতে হবে ছোট থেকেই। এবং সেই ব্যর্থতা ঝেড়ে ফেলে আবার কী ভাবে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, তা কিন্তু ও শিখবে আপনার কাছ থেকেই। মানুষ ব্যর্থ না হলে সাফল্যের কদরও করতে শেখে না।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জয়রঞ্জন রাম জানালেন, ‘সন্তানের সঙ্গে নিজেদের সমস্যা ও ব্যর্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করুন। মা-বাবারা সাধারণত তাদের সাফল্যের গল্পই সন্তানকে শুনিয়ে থাকেন। কিন্তু জীবনে ব্যর্থ হওয়ার গল্প বা অফিসে প্রোমোশন না পাওয়ার কষ্ট শেয়ার করেন না। এ বার থেকে সন্তানের সঙ্গে সেই ধরনের গল্প শুরু করুন। আপনার ব্যর্থতার গল্পে সে নিজেও তার ব্যর্থতা আপনার সামনে প্রকাশ করতে সাহস পাবে। ফলে আলোচনাটা দু’তরফেই হবে। মনে রাখতে হবে জীবনে সকলেই কিছু ক্ষেত্রে সফল, কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থ। সেটা আগে বুঝতে ও বোঝাতে হবে।’

মা-বাবার ভূমিকা

আদর ও শাসনের সহাবস্থান জরুরি। শুধুই আদর যেমন ঠিক নয়, সারাক্ষণ শাসন করলেও হিতে বিপরীত ফল হতে পারে। সন্তান ভুল করলে তাকে বকতে পারেন। কিন্তু শুধু বকাঝকা করলেই চলবে না। সে কি ভুলটা না বুঝে করেছে? বা কেন করেছে? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো খুঁজে বার করতে হবে। তার জন্য সন্তানের সঙ্গে কথা বলুন। তাকে বোঝার চেষ্টা করুন। তার সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশতে পারেন। সে ভুল পথে গেলে তাকে যুক্তি দিয়ে বোঝান, কেন সে ভুল করছে। তার পরে সিদ্ধান্তটা তাকেই নিতে দিন। এতে সরাসরি শাসন করাও হবে না, আবার তার বিষয়ে খবরও রাখতে পারবেন অনায়াসে। ছোট ছোট কারণই কিন্তু বড় অঘটন ঘটায়।

সন্তান ব্যর্থ হলে কী করবেন

প্রথমবার কোনও বিষয়ে ব্যর্থ হলে তা নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। কোনও প্রতিযোগিতায় সে হেরে গেলে তাকে বোঝান যে, অংশগ্রহণ করাটাই আসল। এক বিষয়ে একাধিক বার ব্যর্থ হলে তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। তবে সঙ্গে সঙ্গে নয়। ওকে সময় দিন ব্যর্থতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার। পরে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে
যে বিষয়ে আপনার সন্তান বরাবর ভাল, সেই বিষয়ে হঠাৎ ব্যর্থ হলে আপনাকে বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়াতে হবে। ধরুন, প্রত্যেক বছর স্কুলের স্পোর্টসে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছেলেটি এ বার পিছিয়ে পড়ল। দ্বিতীয় বা তৃতীয় হল। এ ক্ষেত্রে কিন্তু সন্তানের মধ্যে অপমান বোধ কাজ করে। সুতরাং সকলের সামনে এই বিষয়ে কথা না বলে নির্জনে ওর কাঁধে হাত রাখুন।

অবসাদের দাওয়াই

ব্যর্থতার পরেই যে সমস্যাটা শিকড় ছড়ায়, তা হল অবসাদ। বয়ঃসন্ধির সময়ে এই অবসাদই বড় আকার ধারণ করে। তা বোঝা যায়, তাদের লাইফস্টাইলের দিকে চোখ রাখলে। অনেকে খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দেয়, অনেকে রাত অবধি জেগে থাকে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মিশতে চায় না। বেশির ভাগ সময়ে একটা ঘরে নিজেকে বন্ধ করে রাখে। বিশেষত, মা-বাবাকে এড়িয়ে যেতে শুরু করে। এ সময়ে আপনারা জোর করে কিছু জানতে চাইলেও সে বলতে চায় না। এই পরিস্থিতিতে সন্তানের সঙ্গে নিজের সমস্যার কথা আলোচনা করতে শুরু করুন। সেটাই তার অবসাদে খোঁচা দেবে। সে নিজের সমস্যার কথা বলতে শুরু করবে।

খেলাধুলোও প্রয়োজন। মা-বাবার কাজের প্রকৃতির জন্যই হোক বা সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে, এখন বাচ্চাদের মধ্যে একসঙ্গে খেলার প্রবণতা কমছে। একে তো খেলায় শারীরিক শ্রম হয়। এতে নিউরোট্রান্সমিটার ঠিক কাজ করে। ফলে শরীরে বন্ধু হরমোনের নিঃসরণ ঘটে। তারা খুশি থাকে। দ্বিতীয়ত খেলায় হার-জিত থাকে। ফলে সেখান থেকেই তারা ব্যর্থতাও হাসিমুখে মেনে নিতে শেখে।

কাঁচা বয়সে অনেক ছোট ঘটনাতেই অবসাদের সৃষ্টি হয়। তাই সামান্য ব্যাপার বলে কোনও কিছুই এড়িয়ে যাবেন না। মা-বাবা হিসেবে সন্তানের মনের খবর সকলের আগে আপনাকেই রাখতে হবে।

এমএস


oranjee