ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৫ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

আপনার চোখের জল আমাদেরও বেদনাহত করে!

প্রতীক ইজাজ ৫:৫৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৭, ২০১৯

আমি সুচিত্রা সেনকে দেখিনি। গল্প শুনেছি। লোকমুখে, বন্ধু স্বজনদের কাছে। তারচেয়ে পড়ে জেনেছি বেশি। ঠিক জানা বলে না। জানতে চাইনিও কখনো। তাকে পড়েছি নিজের জন্য। আমার মনে হয়েছে, মধ্যবিত্ত মানুষের একটি সচল প্রতিকৃতি তিনি। তার অবয়ব, জীবদ্দশা, সময়ের বাঁক- সবকিছুই আমাদের। ঘর সংসার সন্তান; স্বামী প্রেম বিরহ- সবই তো আমার আমাদের, ব্যক্তিগত, একান্তই নিজের। সে জন্যই সুচিত্রা সেনকে আমি কেবল নারী হিসেবে দেখি না; কিংবা একজন মহানায়িকাও কেবল নন; তাকে দেখি আমার মুখস্থ জীবনে অসম্পূর্ণতা ও সংকট সমাধানের শক্ত অবলম্বন হিসেবে। ভাবি, কিভাবে এত বড় মাপের একজন মানুষ এমন নির্লিপ্ত নির্মোহ জীবন যাপন করতে পারেন!

সংসার জীবন, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নানাকথা ঘোরে নানামুখে। কেউ বলেন, সংসার জীবনে চরম অসুখী ছিলেন সুচিত্রা সেন। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েনের কোনো সমাধানই হলো না শেষ পর্যন্ত। কিংবা উত্তম কুমারকে নিয়ে এত যে গল্প, কোনো সফল পরিনতি পেলো না সেটিও। আমি বলি- না। তিনি চেয়েছেন, পর্দার ভেতর ও বাইরে এক থাকতে। মানুষ জানুক- সংঘাত ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মানুষকে এগুতে হয়। আপোষ ততক্ষণ পর্যন্ত কাম্য নয়, যতক্ষণ না তা সমগ্র মানুষের কাজে লাগে। তাই এমন সুকঠিন অন্তরাল তার। চারপাশে রহস্যের এমন শক্ত আবরণ। নির্দ্বিধায় নিজেকে সপে দেওয়া চলচ্চিত্রে। আমাদের কাছে সুচিত্রা সেন তাই এত জরুরি, অবিসংবাদিত।

তার ব্যক্তিজীবন আমাকে বিমোহিত করে। রহস্যে ঘেরা বৃত্ত শেষ পর্যন্ত অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেল। ভাবতে অবাক লাগে- আকাশসম খ্যাতি ও অর্জন সত্বেও কিভাবে জীবনের ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে অন্তঃপুরেই থেকে গেলেন এই কিংবদন্তি মানুষটি। স্বর্গসুষমাময় রাজ্যপাট ছেড়ে রইলেন তক্তপোষে, যাপন করলেন নির্মোহ জীবন। পাছে অতীতের সোনালী দিনগুলো, প্রাণের মানুষগুলো আবারো তাকে টানে বাহিরে, তাই রূপ লাবন্যমাখা নিজের আলোকচিত্রগুলোও সরিয়ে ফেলেছিলেন বেদান্ত আবাসন থেকে। এমনকি যে ভক্তকুলের কাছে তিনি ছিলেন পূজনীয়, সেই তাদেরও ভালবাসা ও শ্রদ্ধাসিক্ত ফুল কিংবা কোন উপহারই পৌঁছাতে দেননি নিজের কাছে। নির্বাসনে যাওয়ার নজির পৃথিবীতে কম নেই। কিন্তু তার মতো এতোটা কঠিন স্বেচ্ছানির্বাসন কে কবে কোন কালে দেখেছে, আমাদের জানা নেই। আর এইখানেই সুচিত্রা সেন আমাদের কাছে আরেক বিস্ময়!

আমি সুচিত্রা সেনকে দেখি নিজের ব্যক্তি অভিধার সহজ সরল আলোকছটা হিসেবে। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে, প্রেমে অপ্রেমে, ঘরে সংসারে; সহজ শক্ত অবলম্বনও। ভেতরে বা বাইরে; তার কথা বলার ভঙ্গি, সরল অবয়ব, ঘুম, হাঁটা, অভিমান; সবকিছুই তো আমাদের। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যখন সংলাপ বলেন, রাগে ক্ষোভে অভিমানে বদলে যায় মুখের ভঙ্গিমা, তর্ক জুড়েন, যখন কাঁদেন বিরহ বা বিচ্ছেদে; তখন আমাদেরও বুকের ভেতরটা কেমন করে! মনে হয়- ও জল, বেদনায় নীল মুখ, আমার, আমাকেও বেদনাহত করে!

আমার কাছে রূপে লাবণ্যে অনন্যা তিনি। তার কমনীয় উপস্থিতি, বিশাল দুটি চোখ, সুঠাম ঠোঁট দুটির মধ্যে সজ্জিত সুগঠিত দাঁতের সারি, ডানদিকের থুতনিতে তিল; কিংবা শরীর থেকে আলাদা হয়ে কথা বলে চোখ। ঠোঁটে কম্পন তুলে তার কান্না; উন্মাদ করে দেয় সবাইকে। ঋজু সুরম্য দেহপ্রতিমা। সম্রাজ্ঞীর দৃপ্ত ভঙ্গিমা তাঁর। তাই তো তাঁর কাছেই সৌন্দর্য্যরে সংজ্ঞা শেখা আমাদের। কিংবা কিশোরমনে যে ভালবাসার অঙ্কুর; সেখানেই নিবিড় স্পর্শ তার।

বলতে গেলে সব বয়সী মানুষেরই হৃদয়েশ্বরী তিনি। মধুর চোখের দীপ্তি, আলোময় করে চারপাশ। ঘর সংসারে, বিরহপ্র্রেমে, শক্তি হয়ে আবির্ভুত হন চেতন অবচেতনে। কোথায় কিসে তার এত শক্তি? এত সম্মোহনী ক্ষমতা? এত আলো এত বিভা খ্যাতি জৌলুস ছেড়ে শেষঅবধি এতটি বছর এমন একা অন্তরালে থাকা যায়? নাকি থেকেছো কেউ কখনো? তাঁর এতসব অবিশ্বাস্য সত্য গল্পই তার প্রতি মুগ্ধ করে রাখে আমাদের।

যে ঘরে থাকতেন তিনি, যে বাড়িতে, তার কোথাও ছিল না তার একটি আলোকচিত্র, কিংবা পোর্ট্রেটে। আর কোনো মায়ায় আবিষ্ট হতে চাননি তিনি। কিন্তু কেন? ব্যক্তিত্বে, বিভাসে, আলোয়- পর্দায় যেমন; তেমনটিই কি থাকতে চেয়েছেন জীবনভর? নাকি ধুলোয় সংসারে মলিন হতে দিতে চাননি বুকের গভীরে পুষে রাখা কারো জন্য এক অনন্য অনন্ত ভালবাসা!

শ্যুটিং শেষে মাঝরাতে বাড়ি ফিরতেন। ক্লান্ত শরীর, অবসন্ন, অবসাদ। মেঘভার মুখ। সুনশান বাড়ি। সবাই ঘুমিয়ে। জেগে কেবল স্বামীর লালচোখ। সুচিত্রা সিঁড়ি ভাঙছেন। পেছনে তাচ্ছিল্য। পা যেন চলে না। চোখ ভরে যায় জলে, বেদনায়। হু হু কাঁদে বুকের ভেতরটা। রেলিঙে বসে যায় হাত। চোখ ছল ছল। তবু ঘরে যেতে হয়। তার জন্যই তো রাত জেগে শিশু কন্যা মুনমুন। তার ফেরার অপেক্ষাতেই তো নিঃশব্দ অন্ধকারে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকার শিশু মেয়েটির। এই নরকবাসে ওই তো ওর স্বর্গপুরি। নিচে নামতে ভয় পাছে বাবা কিছু বলেন। তাই দাঁড়িয়ে সিঁড়ির মাথায়। মার হাত ধরে। টানে। ঘরে নেয়। চোখ থেকে ঝরে পড়ে জোস্না। মার গলা ধরে। চুমুতে চুমুতে ভরে যায় মুখ গাল কপাল। মা যখন আয়নার সামনে বসেন মুখের প্রলেপ তুলতে, শিশুটি অবাক চোখে দেখে মাকে। কি সুন্দর! চাঁদ মুখ! কি মায়া! শিশুটি হাসে। মা-ও। তারপর ঝুপুস করে তুলতুলে বিছানায় দু’জন। কত গল্প রাজ্যির; মা মেয়ের। কত আহ্লাদ। কেবল একটি গল্পই বলা হয় না কখনো। যে গল্প তার একান্তই নিজের, ভেতরের।

আমি তার কিছুই জানি না। যে উচ্চতায় তার বাস, সেই স্বর্গপুর তো দূরেই থাক, সিড়ি বারান্দাতেও কখনোই পৌঁছুনো হবে না আমাদের। তাকে ঘিরে যে রহস্য, তা হয়তো গভীর থেকে আরো গভীরতর হবে দিন দিন। বেদান্ত আবাসন, টালিগঞ্জ, শ্রীরামকৃষ্ণ ভবন, কিংবা সার্কুলার রোডের অলিগলি; কত মুখ প্রতিদিন খুঁজবে তাকে; অলক্ষ্যে, প্রকাশে, চেতন অবচেতনে।

প্রণম্য সুচিত্রা সেন
শুদ্ধতম জীবনের শক্ত অবলম্বন।

• প্রকাশিতব্য ‘সূর্যতপা সুচিত্রা’ থেকে অংশবিশেষ। সম্পাদনা প্রতীক ইজাজ। প্রকাশক শুদ্ধপ্রকাশ। একুশে বইমেলা ২০১৯।


লেখক: সাংবাদিক কবি ও সংস্কৃতিকর্মী

 

 এমএস


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। গ্লোবাল টিভি লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে গ্লোবাল টিভি-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।
oranjee