ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

 
 
 
 

প্রিয় স্কুল, প্রিয় শিক্ষক

গ্লোবালটিভিবিডি ৪:২৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৫, ২০১৯


মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম : হাম্মাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়। নামের মাঝেই কেমন যেন এক অন্যরকম শুদ্ধতা, রয়েছে পবিত্রতার আবেশ। আমি ৫ম শ্রেণিতে এই স্কুলে পড়াশুনা শুরু করেছিলাম। তখনকার সময় মাথায় টুপি পরে স্কুলে যেতে হত এবং তা ছিল আবশ্যক। স্কুল ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল নামাজ ঘর। স্কুল সময়ে নামাজের ওয়াক্তে, বিশেষ করে প্রত্যেক ছাত্রকে বাধ্যতামূলক জোহরের নামাজ স্কুলেই আদায় করতে হত। মাঝে মধ্যে আমরা শিক্ষকদের চোখ ফাকি দিয়ে নিচতলার কোন ক্লাস রুমে গিয়ে আড্ডা জমাতাম। কিন্তু তা আর বেশি দিন টেকেনি, ঠিকই প্রধান শিক্ষকের নজড়ে চলে এসেছিল। বড় বড় করে চোখ রাঙানো আর ধমকে নামাজ ঘর মুখি না হয়ে আর পারিনি।

তখন ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে ছিল সেতু বন্ধন। শিক্ষক শুধু ক্লাস নিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করতেন না,পাশা পাশি ছাত্রদের আচার আচরণ,সভ্যতা, ভদ্রতা ও নৈতকতা বিষয়েও খেয়াল রাখতেন। মাঝেমধ্যে অভিভাবকদের ডেকে এনে আমাদের পড়ালেখা ও আচারণ সম্পর্কে অবহিত করতেন এবং তাদের কাছ থেকেও জেনে নিতেন। মাঝে মধ্যে আমাদের প্রধান শিক্ষক ফজলুল রহমান স্যার এসে ক্লাস নিতেন, তখন যদি ঠিক মত পড়া না পারতাম , তিনি অত্যন্ত রাগাম্বিত কিন্তু ধিরস্থিরভাবে আমাদের বলতেন, এই ছেলে তোমার আব্বা কি করেন? - স্যার কাপড় কাপড় বেচে।

- তোমার আব্বা? - স্যার লোহা বেচে।

স্যার বলতেন, দেখ বাবারা, তোমাদের পড়ালেখার যে হাল তাতে করে টেনেটুনে পাস করবে ঠিকই, কিন্তু ভাল মানের কোন জায়গায় সুযোগ পাবে না। এর চাইতে ভাল, তোমরা বাপের সাথে সহযোগিতা কর।

শুনতে খারাপ লাগলেও স্যারের উক্তি ছিল বাস্তব। স্যারের কথা ছিল, নকলবাজি করে ডিগ্রী নিবি ঠিকই, কিন্তু তখন না পাবি কোন অফিসে চান্স, না পারবি হাতে টিফিন বাটি নিতে, গলায় টাই আর হাতে ফাইল নিয়ে অফিসে অফিসে ঘুইরা বেড়াবি। তার চাইতে কাজ শিখ, লাভ হইব দেশ ও জাতির।

স্যারের অপ্রিয় সত্য কথাগুলো এখনো কানে বাজে। ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি, তখন আমার চোখের সমস্যার কারণে ফটোসান চশমা নিতে হয়েছিল ডাক্তারের পরামর্শে, সেই চশমা পরে যখন স্কুলে যাই, তখন ক্লাস টিচারের চোখে পড়ে যাই। তিনি ত বেশ রেগে গেলেন, তুই এত বেয়াদব হয়ে গিয়েছিস! সান গ্লাস চোখে দিয়ে স্কুলে এসেছিস!

তার ভুল ভাঙাতে পরের দিন আব্বাকে সাথে করে নিতে হয়েছিল প্রমাণের জন্য। হাম্মাদিয়া স্কুলে সে সময় যে সব ছাত্র পড়ালেখা করেছিল, তারা একাডেমিক শিক্ষা লাভ করার পাশাপাশি উন্নত নৈতিক শিক্ষাও অর্জন করতে পেরেছিল। যা আজকালকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিলুপ্তির পথে। এই স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি, কারণ দুনিয়াবি শিক্ষার সাথে সাথে আখেরাতের ময়দানে কিভাবে কামিয়াব হব- সে শিক্ষাও পেয়েছিলাম।

আমার প্রিয় কয়েকজন শিক্ষকের মাঝে অন্যতম ছিলেন ফজলুল রহমান স্যার।
আরো অনেক মধুর স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে হাম্মাদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে। কিন্তু একবারেইত সব উপাস্থাপন করা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে আবারও লেখার সুযোগ এলে তখন জানাবো ইনশাআল্লাহ।

আমাদের সময়ের যে সকল শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করার পাশাপাশি এখনো যারা বেঁচে আছেন তাদের সু-সাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা. দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ।

এ এইচ


oranjee