ঢাকা, বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯ | ৬ ভাদ্র ১৪২৬

 
 
 
 

পরিবার থেকেই শুরু হোক শিশুর নৈতিকতা শিক্ষা

গ্লোবালটিভিবিডি ৩:১৮ অপরাহ্ণ, জুলাই ২৭, ২০১৯

ছবি সংগৃহীত

মোহাম্মদ জাভেদ হাকিম : যাপিত জীবনে প্রত্যেক মানুষের সবচাইতে বেশি যা প্রয়োজন তা হল পারিবারিক শিক্ষা। আর এগুলো রপ্ত করতে হবে সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই। কারণ সভ্যতা, ভদ্রতা, নৈতিকতা, কৃতজ্ঞতা বোধ, অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও পরোপকারি এবং উদার মানসিকতা-এগুলো কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে খুব একটা অর্জন করা যায় না। একাডেমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়ালেখা করে শিক্ষিত হওয়া যাবে, মেধাবি হলে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে দেশের সীমানা পেরিয়ে ভিন দেশেও তার নাম ছড়াবে, কিন্তু পরিবার হতে সু-শিক্ষা না পেলে এক সময় সব ম্লান হবে, এটা অবধারিত সত্য।

গ্রাম্য ভাষায় একটা প্রবাদ চালু আছে, থলি যদি ভাল হয় তাহলে সেখানে ভাল কিছু থাকবে। আম যদি মিষ্টি হয় তা হলে তার আটিও মিষ্টি হবে। অর্থাৎ একজন আদর্শ পরিবারের সন্তান সু-সন্তান হবে এটাই স্বাভাবিক। শিশু যখন নিজ থেকেই হাত-পা নাড়তে শেখে, তখন থেকেই মূলত সে পরিবারের বড়দের কাছ থেকে শিখতে শুরু করে। আর তখন থেকেই তার সামনে বাবা-মা ও বড়দের কথা-বার্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বাড়ন্ত শিশুকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ভাল-মন্দ বিষয়ে অবহিত করতে হবে। তার সঙ্গে নরম সুরে, মার্জিত আচরণে বিভিন্ন বিষয়ে শেয়ার করতে হবে। শিশুদের মন-মানসিকতা থাকে খুবই কোমল, তাই খুব সহজেই যে কোন বিষয়ে তারা শিখে নিতে পারে। অনেক শিশুরাই দুষ্টুমির ছলে মিথ্যা বলতে পছন্দ করে, বড়রা যখন বুঝতে পারবেন তখন তাদের কর্তব্য, আদর-স্নেহের মাধ্যমে বুঝিয়ে তার এই বদ-অভ্যাস থেকে বিরত রাখতে হবে। কোন অবস্থায়ই শিশুকে গাল-মন্দ করা যাবে না, এতে সে নিজেও গালি দিতে উৎসাহি হয়ে উঠবে। বড়দের দেখলে সালাম, ছোটদের প্রতি স্নেহ, সমবয়সীদের প্রতি সু-সম্পর্ক, অন্যকে তাচ্ছিল্য না করা এগুলো শিখাতে হবে। বিশেষ করে মায়েদের খেয়াল করতে হবে, তার সন্তান অন্যদের প্রতি কতটুকু উদার। ছোট্ট বয়স থেকেই মুক্ত মন-মানসিকতা গড়ে না উঠলে তা আর পরবর্তি জীবনে আয়ত্ত করা খুবই দুরূহ ব্যাপার। তাই একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সন্তানকে গড়ার জন্য পিতা-মাতা ও পরিবারের সদস্যদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। মাঝে মধ্যে কাছে কিংবা দূরে কোথাও উদার প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে যেতে হবে। ভ্রমণেও শিশু অনেক কিছু শিখতে পারে।
বর্তমান শহুরে সমাজে পরিবারের দুজনই থাকেন নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত । ফলে যতটুকু সময় সন্তানের প্রাপ্য তা থেকে সে হয় বঞ্চিত। যৌথ পরিবারের অভাবে, গৃহকর্মীর সান্নিধ্যে, ভার্চুয়াল জগতে মেতে থেকে শিশু হারায় তার সু-শিক্ষা পাওয়ার মত সোনালী সময়। বড়দের কিনে দেয়া খেলনা অস্ত্র দিয়ে সিনেমার ডন সাজা, মনিটরে কার্টুন দেখা আর এ্ডভ্যাঞ্চার গেম খেলে-শিশুর মস্তিষ্কে ধারণ করে যত সব উৎভট চিন্তা। ধারণ করা সেই কুচিন্তা-চেতনা থেকেই শিশু চায় তার বাস্তবায়ন।

ছোট থেকেই যেন শিশু পেতে পারে পারিবারিক শিক্ষা, সেই লক্ষ্যে কর্মব্যস্ত ও প্রত্যেক পরিবারের সন্তানের বাবা-মা এবং বড়দের কর্তব্য, প্রতিদিন সকাল সন্ধায় সন্তানকে জিজ্ঞেস করা - তার সন্তান ধর্মিয় কর্ম পালন করেছে কি-না। শুধু জিজ্ঞাসার মধ্যেই দায় সারলেই হবে না, তাদেরকে বাধ্য করাতে হবে, যেমনি ভাবে আমরা অফিসে থেকেও বাড়িতে ফোন দিয়ে খোঁজ নেই, সন্তান স্কুলের হোমওয়ার্ক ঠিক মত করেছে কি না। প্রত্যেক ধর্মের অনুশাসনেই আদর্শ-সভ্যতা-নৈতিকতার শিক্ষা রয়েছে। আর ইসলামের আসমানি কিতাব কোরাআন তো পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। সুতরাং একমাত্র ধর্মিয় শিক্ষা ও অনুশাসন মেনে চলার মাঝেই সন্তানকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। ধর্মিয় শিক্ষার পাশাপাশি অভিবাবকদের কর্তব্য, তার আদরের সন্তানকে সেগুলোর চর্চা করানো। সংসারের দু-জনকেই আজকাল চাকরি-ব্যবসা করতে হয়। বাবা-মায়ের এই পরিশ্রম আদরের সন্তানদের নিষ্কন্টক ভবিষ্যতের জন্য, তাদের বায়না মিটানোর জন্য। তাই তাদের ব্যক্তি জীবনও আলোকিত করার জন্য শত ব্যস্ততার মাঝে, কঠোর পরিশ্রমের ফাকেও সন্তানকে সকালে স্কুলে পাঠানোর আগে বলে দিন শিক্ষক / শিক্ষিকা ও বড়দের দেখলে সালাম এবং তাদের সঙ্গে শ্রদ্বা-ভক্তি নিয়ে কথা বলার জন্য। সহপাঠিদের সঙ্গে বিনয়ী আচরণ ও সবার সাথে সদ্ভাব বজায় রাখার জন্য। যদি কোন ভুল করেও ফেলে তার পরেও যেন সে মিথ্যার আশ্রয় না নেয়, সেই বিষয়ে তাকে অভয় দেয়া উচিত। সে যদি কোন বিষয়ে তার বন্ধুদের সহযুগিতা পায়, তাহলে যেন সে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। বর্তমান সমাজে কৃতজ্ঞতা জানানোর মধ্যে রয়েছে যত কৃপণতা। আর এই কৃপণতা থেকেই সৃষ্টি হয়- যত সব অনৈতিকতার সূত্র। একজন অকৃতজ্ঞ সমাজে ধিকৃত। সুতরাং নিশ্চয়ই আপনি চাইবেন না, আপনার আদরের সন্তানের পরিণতি তেমন হোক। তাই আমাদের উচিত সন্তান যখন স্কুল / কোচিং / বাইরে থেকে ফিরবে কিংবা আমরা যখন বাসায় ফিরব তখন আদর স্নেহের সাথে জিজ্ঞেস করা, যা সকালে শিখিয়ে দিয়েছিলেন তার কতটুকু বাস্তবায়ন হল? রক্তচক্ষুর বদলে পরম সোহগের সঙ্গে সন্তানের ভুল ত্রুটি শুধরিয়ে দিলে অনেক বেশি কাজে আসে। তাই পিতা - মাতাকে সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করতে হবে, তাহলে দেখবেন সন্তান সব কিছুই আপনার সঙ্গে শেয়ার করবে। যে সন্তান বাবা-মাকে সব শেয়ার করতে শিখবে সেই সন্তান কখনো আদর্শহীন হবে না। পিতা-মাতাকে মনে রাখতে হবে, ঘরের পরিবেশ ভাল হলেই যে সন্তান সভ্য-ভদ্র ও আদর্শবান হবে। তবে সন্তান কাদের সঙ্গে মিশলো/ বন্ধুত্ব করলো, সেদিকেও খোজঁ রাখতে হবে। তবে খোজঁ রাখতে গিয়ে তা যেন আবার সন্তানের সম্মানে আঘাত না হানে। এতে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। মনে রাখবেন মোটামুটি পাচ / ছয় বছর বয়স হতেই আপনার ছোট্ট সোনামনির নিজস্ব সম্মানবোধ সৃষ্টি হয়। অবশ্যই ছোট থেকেই সন্তানকে / সন্তানের সামনে সু-শিক্ষার বিষয়ে আলোচনা ও তার মাঝে চর্চার প্রচলন ঘটাতে হবে। শিক্ষিত হবার জন্য যেমন একাডেমিক শিক্ষার প্রয়োজন, তেমনি সন্তানকে, সুস্থ মানসিকতার ধারক ও বাহক হবার জন্য সভ্যতা - ভদ্রতা- নৈতিকতা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার মত মননের অধিকারি যেন হয় সেই বিষয়ে পিতা-মাতাকে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। যিনি তার সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সক্ষম- তিনি যেন জগতের সকল কর্মে সফল। মোদ্দা কথা, বিচক্ষণ পিতা - মাতা বা অভিবাবকদের সন্তানরাই সমাজে আদার্শ মানুষ হিসেবে বিবেচিত। তাই শত কর্ম ব্যস্ততার ফাঁকেও বেশ কিছুটা সময় সন্তানের জন্য তথা অন্তত অবসর সময় টুকুন কাটান সন্তানের সঙ্গে।

 মোহাম্মদ জাভেদ হাকিম : প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ।

এএইচ

 


oranjee