ঢাকা, সোমবার, ২৪ জুন ২০১৯ | ১০ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

খুলনায় ভাসমান ইফতার বাজারে ভেজাল আতঙ্ক

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৪০ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০১৯

ছবি সংগৃহীত

 

এম এ কবির, খুলনা : মুসলমানদের সিয়াম সাধনার মাস রমজান। দিনভর রোজা শেষে ইফতারিতে ভাল কিছু খেতে চান রোজাদাররা। বিশেষ করে ইফতারির অপরিহার্য উপকরণ ছোলা, মুড়ি, পিয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, খেজুর-খোরমা, হালিমের মতো খাবারের বেশি চাহিদা । তবে ভেজাল প্রতিরোধে কেসিসি, বিএসটিআই প্রতিনিয়ত মামলা এবং জরিমানা করলেও ইফতারির এ উপকরণগুলো কতটা নিশ্চিন্তে খেতে পারবেন-তা নিয়ে আতঙ্কে নগরবাসী। কারণ ভেজাল, নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যে সয়লাব হয়ে রয়েছে বাজার।

নগরীতে প্রতিদিন ভেজাল বিরোধী অভিযান চললেও এখনও ভেজাল ইফতার আতঙ্কে নগরবাসী। ফলে ভেজালমুক্ত ইফতার আশা করাটাই এখন রীতিমতো অতি আশায় পরিণত হয়েছে। যে মুড়ি ছাড়া ইফতার অকল্পনীয় সেই মুড়িকে সাদা করতে ব্যবহৃত হচ্ছে ট্যানারিতে ব্যবহার্য বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড। বড় বড় দানার মুড়ি তৈরি করা হয় রাসায়নিক সার দিয়ে। জিলাপি দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে পোড়া মবিল। বেগুনি, পিয়াজু, চপ ইত্যাদি তেলেভাজা ইফতারিসামগ্রী আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হয় কেমিক্যাল রং।

ভাজাপোড়ায় ব্যবহৃত তেল কতদিন ধরে কড়াইয়ে ফুটতে থাকে তার কোনো ইয়ত্যা নেই। ইফতারির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অপরিহার্য অনুষঙ্গ খেজুরেও এখন বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে রোজাদারদের। কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ, পচা দুর্গন্ধযুক্ত খেজুরে বাজার সয়লাব হয়ে আছে। কার্বাইড বা ফর্মালিন মেশানো ফলমূলও এখন বড় আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে।

বিএসটিআই-এর সহকারি পরিচালক মৃনাল কান্তি ঘোষ জানান, ইফতারে ব্যবহৃত খাদ্যসামগ্রী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং আমদানির ওপর মাসজুড়ে নজরদারি চলছে । এসব পণ্যর গুণগত মান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে, ইতিমধ্যেই আমরা প্রায় ১৫ টির মত মামলা দিয়েছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে ভেজাল পণ্যের বাজারজাতকণ, পচা, নোংরা, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার বিক্রির অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয় রোজার মাসেই। অধিকাংশ ইফতারি বিক্রি হয় ফুটপাতে। আর সে ফুটপাতের ৯০ ভাগ ইফতারিই ভেজাল বলে মনে করছেন বিভিন্ন অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া কর্মকর্তারা।
ইতোমধ্যে খুলনায় বিভিন্ন অভিযানে জব্দও হয়েছে ভেজাল ও নষ্ট খাদ্যসামগ্রীর বিশাল বিশাল মজুদ। অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রোজাকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের নিম্ন ও বিপজ্জনকমানের প্রচুর খাদ্য গুদামজাত করেছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের কনজারভেটিভ অফিসার রেজাউল করিম বলেন, আমরা প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করছি, তার পরেও এ অভিযান আমাদের চলমান থাকবে।
কেসিসির সূত্রমতে,গত ১৪ মে ৪০ হাজার, ১৫ মে ৫৫ হাজার, ১৬ মে ৬৫ হাজার, ১৯ মে ৫৫ হাজার ২০ মে ৫০ হাজার টাকা ৫ দিনে মোট ২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমান করে কেসিসি।

এত অভিযানের পর ও "চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী।" একশ্রেণীর লোভী ব্যবসায়ীরা পণ্যে ভেজাল দিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে।
ফুটপাতে ইফতার বিক্রেতা এনামুল কবির বলেন, শুধু রমজান মাস এলেই এই ব্যবসাটা করি। তবে এক প্রশ্নের জবাবে এই ইফতার ব্যবসায়ী বলেন, কিছু কেমিক্যাল এবং রং না দিলে দেখতে সুন্দর হয় না। এবং ভাজাটা মচমচে হয় না। আর এগুলো না হলে গ্রাহকরা কিনতেও চায় না। এ জন্য বাধ্য হয়ে এগুলো দিতে হয়। আর ঢেকে রাখলে মানুষ দেখবে কিভাবে আমার দোকানে কি আছে না নাই?

ময়লাপোতা মোড়ে ইফতার কিনতে আসা ক্রেতা রহমান বলেন, আমরা অসহায়। ব্যাচেলর থাকি, কি করব, এগুলো বাসায় বানাতে পারি না। বাধ্য হয়েই এসব কিনে নিতে হয়।
অপর ক্রেতা বলেন, কি কিনবো বলেন, ভেজাল ছাড়া কি আছে আমাদের বাজারে। এ আতঙ্কে শুধু রমজান মাস নয় সারা বছরই ভুগতে হয় আমাদের।
ভুক্তভোগী ভোক্তাদের অভিযোগ, রমজান মাসকে সামনে রেখে শহর-গ্রাম সর্বত্র বিএসটিআইয়ের অনুমোদনহীন নকল খাদ্যপণ্যে সয়লাব। ঘি, মসলা, সেমাই, হোটেল রেস্তোরাঁয় নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভেজাল, পচা-বাসি খাবার পরিবেশন, ফরমালিন ও সার মিশ্রিত মাছ, ফলমূল-শাকসবজিতে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানো, ওজনে কম দেওয়া, গরুর মাংস বলে মহিষের মাংস বিক্রি, রাস্তার ওপর খোলা ইফতারি বিক্রি চলছে। বিএসটিআইয়ের সিল ছাড়া বাটখারা ব্যবহার করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সাধারণ মানুষের জনজীবন মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
ফলমূল ও মাছে ফরমালিন, সার মিশ্রণ, ফল-শাকসবজিতে ফরমালিনসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল মেশানোর কারণে বাজারের কোনো কিছুই এখন মানুষ নিরাপদে-নির্ভয়ে খেতে পারছে না। রোজার মাসে মানুষ সারা দিন পানাহার থেকে বিরত থেকে সন্ধ্যার ইফতারি ও রাতের সাহরিতে ভালো-মন্দ কিছু খেতে চায়। কিন্তু ভেজাল ও নকল পণ্যে বাজার সয়লাব হওয়ায় নির্বিঘ্নে রোজা রাখাও দায় হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের।
রোজার মাসে ইফতারিতে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে খেজুরের। একশ্রেণির পচা মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর বাজারজাত করে রীতিমতো জিম্মি করে তুলেছে সাধারণ রোজাদারদের। আর এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে ইফতারিতে ভেজাল আতঙ্কে ভুগছে নগরবাসী

এএইচ

 


oranjee