ঢাকা, সোমবার, ২৪ জুন ২০১৯ | ১০ আষাঢ় ১৪২৬

 
 
 
 

সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিলেন সাহসী সেই অ্যাডভোকেট রানু

গ্লোবালটিভিবিডি ১২:৫০ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১৮, ২০১৯

একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য হতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন এক-এগারোর চরম দুঃসময়ে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে চট্টগ্রামের রাজপথে দাঁড়ানো অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু।

বৃহস্পতিবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি।

একাদশ সংসদের সরাসরি নির্বাচনের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হয়েছে। এখন সংরক্ষিত ৫০টি আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। রাজনৈতিক দলগুলোর আসন সংখ্যার অনুপাতে সংরক্ষিত আসন বণ্টিত হবে। আওয়ামী লীগের ভাগে পড়েছে ৪৩টি আসন। সেই ৪৩টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় নিজের জন্য ফরম জমা দিলেন রানু।

এক-এগারোর ক্ষমতার সেই পালাবদলের পর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড একপ্রকার নিষিদ্ধ ছিল। একে একে গ্রেফতার হন ১৬০ জন শীর্ষ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী। এক পর্যায়ে ১৬ জুলাই ভোররাতে গ্রেফতার হন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর গ্রেফতারের পরপরই দ্রুত দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যেতে শুরু করে।

রাজনীতির চেনা মানুষগুলো অচেনা হয়ে যায়। কেউ বিদেশ পালিয়ে, কেউ বা দেশের মধ্যেই আত্মগোপনে থেকে আত্মরক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ অবতীর্ণ হন সংস্কারপন্থীর ভূমিকায়। আবার কেউ গ্রেফতার হয়ে আপাত বেঁচে যাওয়ার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

এক কথায় শেখ হাসিনার পক্ষে কথা বললেই বিপদ হতে পারে এমন আশঙ্কায় রাজনীতি ও ক্ষমতার পদ-পদবী আঁকড়ে থাকা মানুষগুলো যখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে ছিলেন, তখনই আপসহীন কান্ডারি হিসেবে দাঁড়িয়েছেন একজন নারী নেত্রী- অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু।

চট্টগ্রামের রাজপথে শত শত নারীকর্মীকে একজায়গায় করে সমম্বরে শেখ হাসিনার মুক্তির আওয়াজ তুলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের তৎকালীন কমিশনার, চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক) অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু।

রাজনৈতিক কর্মসূচির উপর ফখরুদ্দিন-মইনউদ্দিনের কঠোর পাহারা, নজরদারি তখন। টু-শব্দটি করলেই টুঁটি চেপে ধরার খড়গ। সেই অবস্থাতেই চরম ঝুঁকি নেন রেহানা বেগম রানু। চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজন করেন বিশাল মানববন্ধনের। জরুরি অবস্থায় এধরনের কর্মসূচি পালন করা তখনকার প্রেক্ষাপটে ভয়ানক ব্যাপার।

এজন্য গ্রেফতার-নির্যাতনের পাশাপাশি রাজনীতির মাঠ শুধু নয়, জীবনের মাঠ থেকেও সরিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা স্বাভাবিক। আর এসব জেনে, মেনেই শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে সেদিন জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন অসীম সাহসী এই নেত্রী।

সেনাসমর্থিত সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নানা প্রান্ত থেকে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সামনে সেদিন জড়ো করেন ৫ শতাধিক নারী। মানববন্ধন যেন পরিণত হয় সমাবেশে। চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা লীগের ব্যানারে আয়োজিত এই মানববন্ধনের তিনিই আয়োজক, সংগঠক, সভাপতি, সঞ্চালক। সমবেত অন্যরা সবাই তৃণমূলের কর্মী-সমর্থক।

শেখ হাসিনার মুক্তির দাবি সম্বলিত বিশাল ব্যানারটি মানববন্ধনের জন্য সবে টাঙানো হয়েছে। মানববন্ধনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করছিলেন রেহানা বেগম রানু। আর তখনই সেনা সমর্থিত সরকারের লেলিয়ে দেওয়া পুলিশবাহিনী লাঠিচার্জ করে ব্যানার ছিনিয়ে নেয়, পণ্ড করে দেয় মানববন্ধন। এতে রেহানা বেগম রানুসহ কয়েকজন মহিলা লীগকর্মী আহত হন। পুলিশের এই ন্যক্কারজনক ঘটনার খবর পরদিন স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিকে গুরুত্ব সহকারে ছাপা হলে শেখ হাসিনার স্থায়ী মুক্তির দাবিতে পরবর্তীতে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

এরপরপরই চট্টগ্রাম পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের উদ্যোগে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব চত্বরে শেখ হাসিনার মুক্তির দাবিতে দ্বিতীয় মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়। পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতা হিসেবে সেখানেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু। জড়ো হওয়া পুলিশের ভয়ে পেশাজীবী নেতারা অনুষ্ঠান শুরু করতে যখন দ্বিধান্বিত তখন অ্যাডভোকেট রানু হাজির হয়েই ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে যান অন্য নেতারাও। দূর থেকে এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা পুলিশের লোকজন টার্গেট করেন রানুকে। এরপর মারমুখী পুলিশ ব্যানার নিয়ে টানাটানির একপর্যায়ে রানুর হাতে সজোরে বসিয়ে দেন লাঠির আঘাত। আবারো আহত হন রানু। পণ্ড হয়ে যায় সেই মানববন্ধনও।

১৯৮৯ সালে আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের মাধ্যমে সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে রেহানা বেগম রানুর উত্থান। এরপর ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি।

১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগে যোগদানের মধ্য দিয়ে সরাসরি রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ। ১৯৯৮ সালে সংগঠনটির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার দপ্তর সম্পাদদের দায়িত্ব পান রেহানা বেগম রানু। এরপর ২০০১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরইমধ্যে ডবলমুরিং থানা মহিলা লীগের সভাপতিও ছিলেন। বর্তমানে যুব মহিলা লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তিনি।

২০০০ সাল থেকে পরপর তিনবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন রেহানা বেগম রানু। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শিক্ষা স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিন বছর। এ সময় শিক্ষার আমূল পরিবর্তনে কাজ করেছেন।

পাশাপাশি বাল্যবিয়ে বন্ধ ও নারীর প্রতি সহিংসতারোধ ও নারী নির্যাতন বন্ধে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে কাজ করে প্রশংসিত হয়েছেন রেহানা বেগম রানু। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র তাকে আর্লি রাইজিং লিডার অ্যাওয়ার্ডে পুরস্কৃত করে ২০০৪ সালে।

সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম জমা দেওয়ার পর অ্যাডভোকেট রেহানা বেগম রানু বলেন, আমি দুঃসময়ে রাজপথ থেকে উঠে আসা আওয়ামী লীগ কর্মী। দলের জন্য আন্দোলনকে আমি মনে করেছি আমার পবিত্র দায়িত্ব।

আমৃত্যু দলের জন্য কাজ করে যাবেন জানিয়ে রেহানা বেগম রানু বলেন, কিছু পাই বা না পাই। আমি আওয়ামী লীগের একজন কর্মী এটা আমার বড় পরিচয়। আমাকে যদি জননেত্রী শেখ হাসিনা সুযোগ দেন, তাহলে আমি বৃহত্তর অবস্থানে থেকে সারাদেশের জন্য ও দলের জন্য বেশী করে কাজ করতে পারবো।

এমএস


oranjee